ইয়াসমীন রীমা

  ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

কৃষি

মরিচ ব্যাংক বাংলাদেশ

প্রায় ৭৫০০ বছর আগে থেকে মরিচের ব্যবহার হয়ে আসছে। আমেরিকার আধিবাসীদের প্রথম মরিচের ব্যবহার করতে দেখা যায়। পরে ব্যাপকভাবে ইকুয়েডরের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে চাষাবাদ শুরু হয়। প্রাচীনকাল থেকে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় মরিচের চাষ করা হতো। ইউরোপীয়দের মধ্যে ত্রিস্টোফার কলম্বাস সর্বপ্রথম ক্যারোবীয় দ্বীপপুঞ্জে মরিচের দেখা পান। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর থেকে সারা বিশ্বে মরিচের চাষ ছড়িয়ে পড়ে। দিয়োগো আরভারেজ চানকা নামের এক চিকিৎসক কলম্বাসের দ্বিতীয় অভিযানের সময় পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে মরিচ সেখানে নিয়ে আসেন। তিনি ১৪৯৪ সালে মরিচের গুণাগুণ নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন। স্পেনীয় ব্যবসায়ীরা মেক্সিকো থেকে এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান। প্রথমে ফিলিপাইন তারপর ভারতবর্ষ, জাপান, চীন, কোরিয়ায় মরিচের বিস্তার লাভ করে। ঝাল ও স্বাদের জন্য খুব দ্রুত মরিচ এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় খাবারের অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়। ক্যাপসিকাম (Capsicum) গোত্রের সোলানেসি (Solaneecae) পরিবারের উদ্ভিদের ফলই মরিচ। মরিচের বহুল প্রচলিত প্রজাতির মধ্যে Capsicum annuum, which includes many common varieties such as bell peppers, paprika, and the chiltepin Capsicum frutescens, যার মধ্যে টাবস্কো জাতীয় মরিচ রয়েছে। Capsicum chinense, যার মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে বেশি ঝাল মরিচ যেমনÑ Gnaga jolokia (বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতে চাষ হয়) Capsicum pubescens, দক্ষিণ আমেরিকার rocoto মরিচ। বিভিন্ন প্রকারের রান্নার জন্য মরিচ একটি অপরিহার্য উপাদান।

ব্যবহারিক দিক থেকে মরিচকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, ঝাল মরিচ ও ঝালমুক্ত মরিচ। এশিয়া, চীন এবং মধ্য আফ্রিকার দেশসমূহে ঝাল মরিচ ও ঝালমুক্ত মরিচের চাষ হয়। মূলত কাঁচামরিচ, যা কমবেশি ঝালযুক্ত রান্নায় ব্যবহার করা হয়। শুকনো মরিচ, যা দেখতে লাল বর্ণের; যা গুঁড়া অথবা শিল-পাটায় পিষে রান্না করার কাজে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া মরিচের সসও বাজারে পাওয়া যায়। শীত মৌসুমে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এবং গ্রীষ্ম মৌসুমে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে চারা তৈরির জন্য উপযুক্ত সময়। মরিচের চারার চার থেকে পাঁচটি পাতা গজালে রোপণ করা যায়। সারিবদ্ধভাবে ৬০-৭০ সেন্টিমিটার দূরত্বে বজায় রেখে রোপণ করতে হয়। সাধারণত রোপণের দুই মাস পর মরিচ সংগ্রহের উপযুক্ত সময়। প্রতি বিঘায় প্রায় ১২ মণ মরিচ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের সব জেলায় মরিচ উৎপাদন হলেও উল্লেখযোগ্য জেলার মধ্যে মরিচ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত বগুড়ায় মরিচের আবাদ তুলনামূলক কম হলেও ফলন হয় অত্যন্ত বেশি। জেলার কৃষি সম্প্রাসরণ অফিস থেকে জানা গেছে, জেলায় যে পরিমাণ মরিচ চাষ হয়; তার বড় একটা অংশ চাষ হয় পূর্ব বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা, ধুনট ও গাবতলী উপজেলায়। পূর্ব বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলায় যে পরিমাণ মরিচ চাষ হয় তার আর জেলা কোথাও হয় না। এই বছর বগুড়ায় সাত হাজার ৬৪০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সেখানে পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে। ১ হাজার হেক্টর জমিতে বেশি মরিচ চাষ হওয়ায় শুকনো অবস্থায় উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ১৯০ টন। যার মধ্যে সারিয়াকান্দিতেই হয় ৫ হাজার ১১৫ হেক্টর। সোনাতলায় ১৮০০ হেক্টর, গাবতলীতে ৪৫ হেক্টর, ধুনটে ৫৮০ হেক্টর। অন্যান্য উপজেলায় ২০০ হেক্টরেরও কম জমিতে মরিচ চাষ হয়েছিল। মরিচের ফলন বাম্পার হওয়ায় শুকনো আকারে পাওয়া যাবে সাড়ে ১২ হাজার টন। মরিচচাষিরা জানান, ১০-১২ দিনের মধ্যে পুরোদমে বাজারে নতুন শুকনো মরিচ পাওয়া যাবে। খোলা বাজারে এই শুকনো মরিচ বিক্রি হচ্ছে কম শুকানোটি ২০০ টাকা কেজি এবং বেশি শুকানোটি ২৫০ টাকা কেজি। বগুড়ার মরিচের ঝাল বেশি হওয়ায় মরিচের গুঁড়া প্যাকেটজাত করে বিক্রি করার জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন এসে হাটবাজার থেকে মরিচ সংগ্রহ শুরু করেছেন।

মরিচের ব্যাংক বলে খ্যাত অপর জেলা রংপুরের তিস্তা নদীর চরের অভাবী মানুষের দিন বদলে গেছে মরিচের চাষ করে। রংপুরের কাউনিয়ারচরে এ বছর ১ হাজার ২০০ একর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগ জানায়, ১৭টি চরগ্রাম এখন ‘মরিচের ব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। চরগ্রামে যাতায়াতের পথে চরের মরিচ খেতের সবুজের সমারোহ নজরকাড়ে সবার। যেদিকে চোখ যায় মনে হয় যেন সুবজ গালিচা বিছানো হয়েছে তিস্তার বালুচরে। নারী-পুরুষ সবাই মিলে মনের আনন্দে খেতের পরিচর্যাসহ মরিচ তুলতে ব্যস্ত। চাষিরা জানান, চরে মরিচ চাষের প্রথম স্বপ্ন দেখেন কাউনিয়ার আরাজি হরিশ্বর গ্রামের আমির আলী। মরিচ চাষ করে তিনি শুধু নিজের দারিদ্র্যই একসময় দিনমজুরি করতেন আমির আলী। ১৯৯৮ সালে কাজের সন্ধানে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে আসেন। সেখানে আবদুল গাফ্ফার নামে এক মরিচ খেতের মজুরের সঙ্গে পরিচয় হয়। তার কাছে চাষ পদ্ধতি শিখে ফেলেন। ওই বছরই গ্রামে ফিরে চরের ১৫ শতাংশ জমিতে মরিচ চাষ করেন। ভালো ফলন হওয়ায় পরের বছর ৫০ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে মরিচ চাষে শ্রম দেন পরিবারের সবাই মিলে। এই ধীরে ধীরে মরিচচাষিতে পরিণত হন তিনি। বর্তমানে ১৬ একর জমিতে মরিচ চাষ করেন। মরিচ চাষ ঘিরে কাউনিয়ার তকিপল হাটে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বাজার। সপ্তাহে তিন দিন বাজার বসে। টেপলাধুপর, ভায়ারহাট, খানসামা ও মীরবাগ হাটেও মরিচ বিক্রি হয়। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ মরিচ ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মরিচ উৎপাদনে পথিকৃৎ গাইবান্ধার ফুলছড়ি, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে মরিচের এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুর্বর বালুময় ভূমিতে মরিচ চাষ করে অসংখ্য পরিবার ইতোমধ্যে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠেছেন। অথচ এসব জমিতে ফসলের চাষ হবে, কেউ তা আগে ভাবেননি। প্রথমে বালুময় এসব ভূমিতে ভুট্টা চাষ করে কৃষক ব্যাপকভাবে সাফল্য লাভ করায় ক্রমে ক্রমে তারা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি মরিচ চাষ শুরু করেন। চলতি বছর গাইবান্ধা জেলার ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবেষ্টিত ২২টি চর; ইউনিয়নের শতাধিক চরে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে একমাত্র ফুলছড়িতেই ১ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে এবার মরিচের চাষ করা হয়। কোনো কোনো কৃষক ৪০-৫০ বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছেন। প্রচুর ফলন হওয়ায় কৃষকরা খুবই খুশি। মৌসুমের শুরুতে কাঁচামরিচ বিক্রি করে তারা প্রচুর লাভবান হয়েছেন। বর্তমানে শুকনো মরিচ বাজারে উঠতে শুরু করেছে। দামও ভালো পাচ্ছেন তারা। আর এই বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে ব্রহ্মপুত্র নদের কোলঘেঁষে চরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাট ফুলছড়ি এখন মরিচের হাট নামে খ্যাতি অর্জন করেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি রবি মৌসুমে জেলায় ২ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এবারে গোটা জেলায় চাষ হয়েছে ২ হাজার ৩৬৫ হেক্টর জমিতে; যা থেকে মরিচ উৎপাদিত হবে ৩ হাজার ১৯৩ টন। ফুলছড়ি হাটের ইজারাদারদের মধ্যে নুরুন্নবী সরকার জানান, বর্তমানে ফুলছড়ি হাট জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় মরিচের হাট। চরাঞ্চল থেকে কৃষক নৌকায় মরিচ নিয়ে আসে এখানকার আড়তদারের কাছে। ব্যবসায়ীরা ট্রাক নিয়ে এসে হাট থেকে সস্তায় মরিচ কিনে নিয়ে যান। চরাঞ্চলের জমিগুলোতে কৃষক মরিচ চাষে উৎসাহী হয়ে ওঠায় নদী-তীরবর্তী গ্রামীণ হাটগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। তাই হাটগুলোতে এখন সারা বছর কাঁচা, পাকা এবং শুকনা মরিচের ব্যবসা জমে উঠেছে। কম খরচ ও শ্রমে অধিক লাভবান হওয়ায় জেলার ১২২টি চরের মানুষের কাছে মরিচ একটি লাভজনক ফসল হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

অধিক ফলনের আরেক জেলা কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমর্দ্দি গ্রামের মরিচের চাষ হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, জেলার এক-তৃতীয়াংশ মরিচ চাষ হয় হোমনায়। এ মৌসুমে কুমিল্লা জেলার ১৬টি উপজেলার ৫ হাজার ৯০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয় ৭ হাজার ৮০০ টন মরিচ। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ কুমিল্লার উদ্যানতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ মো. নুরুল হক বলেন, জেলার হোমনা, মেঘনা ও তিতাস উপজেলায় বেশি মরিচ উৎপন্ন হয়ে থাকে। বেশির ভাগ স্থানে দেশীয় বাইলজুরি জাতের মরিচ চাষ করলেও এখন কৃষক হাইব্রিড জাতের মরিচ চাষ করতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তাছাড়া দেশের অন্যান্য জেলায়ও মরিচের চাষ হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে মরিচ চাষের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাষের পদ্ধতিও আধুনিকতার দিকে যাচ্ছে, সেই দিন অতি নিকটে যে, বাংলাদেশ বিদেশে মরিচ রফতানি করবে।

লেখক : গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়