সেলিম মণ্ডল

  ০৩ মে, ২০১৮

নিবন্ধ

মে দিবস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

মেদিবস পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিকভাবে সংহতি ও ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার প্রকাশের দিন। মে দিবস পৃথিবীর সব শ্রমজীবী মানুষের এক অমর প্রেরণার উৎস। একসময় শ্রমিকদের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ছিল না, ন্যায্য মজুরি ছিল না। যদিও এখনো তা নেই। দাসদের মতো শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য ছিল। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমেরিকায় পুঁজিবাদের বিকাশ ও শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের এক বিশেষ পটভূমিতে মে দিবসের সূচনা। ১৮৮৬ সালের ১ মে ছিল শনিবার। আমেরিকান লেবার কংগ্রেসের ডাকা ওই দিনের ধর্মঘটে তিন লক্ষাধিক শ্রমিক অংশ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৪ মে হে মার্কেটে এক শ্রমিক-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সমাবেশে শ্রমিক নেতা স্পাইজ আলবার্ট পারসনস ও সাম ফিলদেন বক্তব্য দেন। সমাবেশ চলাকালে দূরে দাঁড়ানো পুলিশ সদস্যদের কাছে বোমার বিস্ফোরণ ঘটে এবং এতে একজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সমাবেশে শ্রমিকদের ওপর হামলা করে এবং নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলে ১১ শ্রমিক নিহত হন। পুলিশ হত্যা মামলায় স্পাইজসহ আটজনকে অভিযুক্ত করে। পরে এক প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। একজন ফাঁসি কার্যকরের আগের দিন রাতে কারাগারের ভেতরে আত্মহত্যা করেন। অন্য একজনের ১৫ বছরের কারাদ- হয়। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে স্পাইজ বলেছিলেন, ‘আজ আমাদের এই নিস্তব্ধতা তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিকতর শক্তিশালী হবে।’ ১৮৯৩ সালের ২৬ জুন ইলিনয়ের গভর্নর অভিযুক্ত আটজনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজের দাবি অফিসিয়ালি স্বীকৃতি পায়। এর সঙ্গে ১ মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠিত হয়। দৈনিক আট ঘণ্টা কার্যসময় এবং সপ্তাহে একদিন ছুটি প্রদানের ব্যবস্থা করে আইন প্রণীত হয়। এ ঘটনা সারা বিশ্বের শ্রমিকদের অধিকারের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা ও গতি এনে দেয়। পৃথিবীর সব শ্রমজীবী মানুষ এ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। ১৮৯০ সালের ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কংগ্রেসে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে দিনটি শ্রমিক শ্রেণি কর্তৃক উদ্যাপিত হয়ে আসছে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, মে দিবস প্রতিষ্ঠার ১৩৩ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, তবু শ্রমমজুরি, কর্মঘণ্টা ও শোভন কর্মের জন্য আজও আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হচ্ছে। আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষের রাষ্ট্রিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কোনো ক্ষেত্রেই তাদের মর্যাদা বা অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হয়নি। আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষ এ দিবসে এখনো তাদের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন করে আসছে। আমাদের দেশের শ্রমিক-কর্মচারীরা এখনো তাদের শ্রমের ন্যায্য মজুরি ও ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বড় বড় ঐতিহ্যবাহী কলকারখানা আজ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আজ বিলীনপ্রায়। এ খাতের হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী আজ বেকার হয়ে পরিবার-পরিজনসহ অসহায়ভাবে দিনযাপন করছে। দেশের শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা নেই। নিরাপদ কর্মস্থানের অভাবে গার্মেন্ট, নির্মাণ, চামড়া, শিল্পসহ অনেক কারখানায় দুর্ঘটনা ও শ্রমিকমৃত্যু এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। শ্রমিকরা সকালে ঘর থেকে বের হয়ে বিকেলে নিরাপদে ঘরে ফিরে আসবে তার কোনো নিশ্চয়তা এখনো নেই। অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার থেকে অনেক শ্রমিক-কর্মচারী বঞ্চিত। ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প-কারখানা, অফিস ও প্রতিষ্ঠানে আইনগত বাধা না থাকলেও বাস্তবত সেখানে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেওয়া হয় না। সেখানে নিয়মিত বেতন, প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট না দেওয়া ও চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেই চলছে। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির ৮০ শতাংশের বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরে কাজ করছে। এসব অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরের শ্রমিকরা একেবারেই অসংগঠিত। গ্রামগঞ্জের নিরীহ অসহায় নারী-পুরুষ নিজের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য এখানে এসে কাজ করে। কিন্তু এসব শ্রমিককে নামমাত্র মজুরি দিয়ে কাজ করানো হয়। তাদের কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না, ছুটির বিধান নেই। নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সমকাজে সমমজুরি থেকে তারা অনেকটা বঞ্চিত। ট্রেড ইউনিয়নে সংগঠিত হতে না পারায় এই শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কোনো ধরনের দর-কষাকষির সুযোগও পায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব শ্রমিকের মজুরি নির্ভর করে মালিকদের মর্জির ওপর। শ্রমদাসের ন্যায় আচরণ করা হয় শ্রমিকদের সঙ্গে। কোনো রকম ওভারটাইম ভাতা না দিয়েই এসব শ্রমিককে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

মুক্তবাজার অর্থনীতির দাপটে নিয়ন্ত্রণহীন দ্রব্যমূল্যের কারণে পরিবার-পরিজনসহ স্বল্প আয়ের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেঁচে থাকা নেহাত কঠিন। ভাত, কাপড়, মাথা গোঁজার ঠাঁই, শিক্ষা, চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার। অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকরা এ অধিকার থেকে বঞ্চিত। বাড়িভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির মূল্য দফায় দফায় বৃদ্ধির ফলে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি-বিধান রয়েছে। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হলো শ্রমিকদের যে মজুরিবৈষম্য বিরাজ করছে তা দূরীকরণের লক্ষ্যে সব শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির মানদ- নির্ধারণের লক্ষ্যে জাতীয়ভিত্তিক সব শ্রমিকের জন্য একটি ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা। আমাদের দেশের শ্রমিকরা দীর্ঘদিন থেকে ন্যূনতম মজুরি দাবি করে এলেও নির্মম সত্য এই এখনো এ বিষয়ে ইতিবাচক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সমতাভিত্তিক ন্যায্য মজুরি ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এটি সর্বস্তরের শ্রমিক-কর্মচারীর অন্যতম মৌলিক দাবি।

কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা আজ নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকমৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলছে। জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় সংবাদপত্রের তথ্যের ভিত্তিতে একটি বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত জরিপ মতে, প্রতি বছর প্রায় ১১৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। এমন অনেক দুর্ঘটনা ঘটে যার তথ্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না এবং অনেক সময় মারাত্মক জখমপ্রাপ্ত শ্রমিকের পরিণতিও জানা যায় না। শিল্প-কারখানা ও চাতালে অহরহ দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে অনেককে প্রাণ দিতে হচ্ছে।

নারীশ্রমিকদের অবস্থা আরো করুণ। একজন শ্রমিক হিসেবে নারী শ্রমিক সব অধিকারের সমান অংশীদার হলেও বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। নারীশ্রমিক অধ্যুষিত গার্মেন্টহ অন্যান্য ক্ষুদ্রশিল্প ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরে অনিয়মিত ও স্বল্প মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিম্ন পদমর্যাদা, খ-কালীন নিয়োগ, যখন-তখন ছাঁটাই, অধিক শ্রমঘণ্টা, সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার অভাব, অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ, সুপেয় পানির অভাব, যৌন হয়রানিসহ অনেক সমস্যা তাদের প্রতিনিয়ত ভোগ করতে হয়। কৃষি ও গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত নারীশ্রমিকের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও তাদের কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই। গৃহকর্মে নিয়োজিত নারীরা সব ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের কোনো সার্ভিস রুল নেই এবং নেই অন্য কোনো বিধিবিধান।

এ দেশের শ্রমিক আন্দোলনের একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আর আন্দোলনের ফলে শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষের আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তিতে একদিকে শ্রম-আইনের কিছু সংশোধন করা হয়েছিল, এতে নতুন মজুরি কমিশনও গঠন করা হয়েছিল। শ্রমিকদের বোনাসের দাবিরও স্বীকৃতি মিলেছিল। কিন্তু তার বাস্তবায়নের অভাবে শ্রমজীবী মানুষ আজও বঞ্চিত। বিরাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে শ্রমিক শ্রেণিও অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মের শ্রমিকরা এখনো শ্রেণিগত অবস্থান থেকে শ্রমিক হয়ে উঠতে পারেনি। এই শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার ও দাবির বিষয়েও পুরোপুরি সচেতন নয়। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে এটি একটি নেতিবাচক দিক। আরেকটি বিষয় হচ্ছে শ্রমিক, শিল্প ও দেশের স্বার্থে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করা উচিত। সত্যিকার অর্থে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং শিল্পে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য দলীয় প্রভাবমুক্ত আদর্শভিত্তিক সৎ নেতৃত্ব এবং সুস্থধারার নিয়মতান্ত্রিক শ্রমিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। আর শ্রমিকদেরও হতে হবে কর্মমুখী, তাদের মধ্যে জাগাতে হবে দেশের প্রতি প্রেম, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। একই সঙ্গে মালিকদেরও মনে রাখতে হবে শ্রমিকদের আস্থায় রেখেই শিল্পের যথোচিত উন্নয়ন ও বিকাশ সম্ভব।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist