reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

বাবাদের নিয়ে তরুণদের ভাবনা

বাবা ছোট্ট একটা শব্দ। বাবা মানে আদর, আবদার, শাসন, হাজার বিকাল ও বাবা মানে নীরব ভালোবাসা। আমরা বাবাদের কখনো কাঁদতে দেখি না। বাবারা নিজের প্রতি বড্ড কৃপণ হন, খুবই হিসেবি হন। পরিবার আর সন্তানদের জন্য তাদের ভা-ারের সব দিতেও কোনো কার্পণ্য করেন না। কম পয়সায় কোন জিনিসটা পাওয়া যায় আর তা নিজেদের জন্য নিয়ে আসাটা মনে হয় আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত। যেখানে সামান্য জ্বর সর্দিতে আপনি আমি কাবু। সেখানে শরীরের অস্বাভাবিক জ্বর ও অসুস্থতা নিয়েও তারা নিজের মতো করেই সুস্থতার ভান করে চলেন প্রতিটি ক্ষণে। বিছানায় শুয়েও সন্তানদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে চিন্তায় বিভোর। হাজার দুঃখণ্ডব্যাথায়ও বাবাদের চোখে পানি আসে না সহজে। বাবারা যেন কঠিন কোনো এক পদার্থের তৈরি। তাইতো সন্তানের সুখে-দুঃখে বাবাদের স্থানই সবার উপরে। আর তাই এই বাবাদের নিয়ে তরুণদের ভাবনা তুলে ধরেছেন তরুণ লেখক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ

বাবাদের শেষ ঠিকানা যেন বৃদ্ধাশ্রম না হয়

বাবা দুটি অক্ষরের ছোট্ট একটি নাম। নামটি ছোট হলেও তার মহত্ত্বটা মোটেও ছোট নয়। এই নামের ভেতর লুকিয়ে আছে শত আদর, ভালোবাসা, মায়া-মমতা। বাবা মানে, সন্তানের মুখের হাসি, সব আবদার পূরণের জন্য জীবনের ছোট-বড় সুখ, আরামণ্ডআয়েশ নির্দ্বিধায় ত্যাগ করা, আদর-শাসন আর বিশ্বস্ততার একটি বড় আসন। সন্তানের বিশ্বাস, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, ভরসা সবগুলোর মাঝে যিনি বিদ্যমান থাকেন, তিনি বাবা। বাবাদের কঠোর আত্মত্যাগ ও অধ্যবসায় স্মরণ রাখতে বিশ্ব বাবা দিবসের প্রচলন। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন জুন মাসের তৃতীয় রবিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করেন। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রতি বছর জাতীয়ভাবে বাবা দিবস পালনের রীতি চালু করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্যাটেলাইটের সুবাদে বাবা দিবস এখন ঘটা করেই পালিত হচ্ছে আমাদের দেশেও। জুন মাসের তৃতীয় রবিবার হিসেবে ২০ জুন বিশ্বের প্রায় ৭৪টি দেশে বাবা দিবস পালিত হয়। অথচ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, জীবনযুদ্ধে যখন জয়ী হয়ে ছেলেমেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করে বিজয়ী বাবারা একটু বিশ্রামে যায় ঠিক তখনি কিছু বিপদগামী সন্তান দ্বারা মহান পিতাণ্ডমাতাকে জীবনের চরম অপমানকর মুহূর্তের শিকার হতে হয়। এই সন্তানরা পিতাণ্ডমাতাকে নিক্ষেপ করে অন্ধকারময় এক নগরীতে। যার নাম বৃদ্ধাশ্রম। অথচ এই সন্তানের জন্যই সারা জীবন যারা যুদ্ধ করে গেছেন। জীবনের ঘানি টানতে টানতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, বার্ধক্য যাদের গ্রাস করে ফেলেছে। তখন তারা হয়ে পড়েন অনেকটা অসহায়, দুর্বল। রোগব্যাধি তাদের আরো বিপর্যস্ত করে তোলে। এ সময় বাবারা চান তাদের সন্তান যেন তাদের পাশে থাকে সব সময়। কিন্তু বিপদগামী এই সন্তানদের অত বড় বাসায় অসহায় বাবা ও মায়েরা সামান্য জায়গাটুকু পান না। তারপরও প্রতিটি বাবা-মা তাদের সন্তানকে কখনো অভিশাপ দেন না বরং প্রতিনিয়ত তাদের জন্য দুই হাত তুলে দোয়া করেন। প্রতিটি বাবা চান তার সন্তান যেন দুধে-ভাতে থাকে। আর তার জন্য সে অনেক সময় খারাপ কাজ করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। কিন্তু শিক্ষিতরূপী সেই মনুষ্যত্বহীন সন্তানের জন্য শেষ বয়সে তারা অপমানিত হয়। কথায় আছে ‘পৃথিবীতে খারাপ পুরুষ হয়তো অনেক আছে, তবে একজনও খারাপ বাবা নেই।’ তাই জীবনের শেষ সময়ে বৃদ্ধ বাবা ও মায়েদের সেবায় নিজেদের নিমজ্জিত করা প্রত্যেক সন্তানের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর তা না হলে তথাকথিত এই শিক্ষা কোনোই কাজে আসবে না।

নাদের হোসেন ভূঁইয়া

শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ফেনী সরকারি কলেজ।

বাবাদের দিন কাটুক সন্তানদের ভালোবাসায়

বাবা হলেন নীরব বয়ে চলা নদী। কখনো জোয়ার, কখনো ভাটার মাঝে দিন কাটে তার। নীরবে বহমান ছুটে চলেন জীবনের প্রতিটি ধাপ। যিনি জীবনের সব উপার্জন দিয়ে বাড়িঘর গড়ে তোলেন ঠিকই। কিন্তু বাড়িঘরে থাকার সবচেয়ে কম সময় যিনি পান তিনি হলেন বাবা। বাবার বানানো বাড়িঘরে দীর্ঘসময় রাজত্ব করি আমরা। অথচ যিনি বানালেন তিনি হয়তো বাড়িঘরের সেই সুখের সময়গুলোতে পাশে থাকেন না। থাকেন আলোকবর্ষ দূরে। নিজের সবটুকু দিয়ে যারা সন্তানদের আগলে রাখেন তারা হলেন বাবা। এ কথা চির সত্য যে, পৃথিবীতে যদি সবচেয়ে বেশি ধৈর্যশীল কেউ থাকেন তারা হলেন বাবা। যারা নির্ভীক নাবিকের মতো শত ঝড়-তুফানের মাঝেও পরিবারকে রক্ষা করতে জীবনের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করে যান। যারা সন্তানের আনন্দের খবরে না হেসে, গম্ভীর গলায় বলেন আরো ভালো কিছু হতে হবে। পরোক্ষণেই আড়ালে গিয়ে সন্তানের সাফল্যে নিরবে চোখের অশ্রু ঝরান। বাবাদের নিয়ে লেখার যোগ্যতা আমি রাখি না। তবে কিছুটা অনুভব করি বাবারা বড্ড একঘেয়ে মানুষ। জীবনের সুখের সময়টা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিলেও দুঃখের ভাগটা কাউকে দিতে অনিচ্ছুক মানুষটি। যারা জীবনের শেষ মুহূর্তটায়ও সন্তানের কল্যাণের কথা ভাবেন, চিন্তা করেন। আর একটা সময় যখন বয়সের ভারে তাদের দেহটা আর চলে না, চলতে চায় না। তখন তারাও সেই ছোট্টবেলার শিশুর মতো হয়ে যান। তখন তারাও খুঁজে বেড়ান সন্তানের সেই হাত, যে হাতটা ধরে সন্তানকে হাটতে শিখিয়েছেন। খুঁজে বেড়ান সন্তানের সেই বুক, যে বুকে মাথা রেখে সন্তানের হাতের কোমল পরশে ক্লান্ত দেহে আসবে একটু ঘুম। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বর্তমান ও অতীত সময়ে বাবাদের প্রতি, তাদের স্বপ্নের প্রতি যে অবহেলা আমরা করি। তা সত্যিই কলঙ্ক ও দুর্ভাগ্যজনক। আর এই বাবাদের স্থান তো হবে ঘরে, মনের মসজিদে। কিন্তু আজ বড় নির্মমতার সঙ্গে বলতে হয়, বাবার বয়স হলেই তিনি যেন হয়ে পড়েন ঘরের সবার তাচ্ছিল্যের পাত্র। তাদের স্থান হয় তখন ঘরের চিলেকোটা বা বৃদ্ধাশ্রমে। যেখানে শেষ বয়সে সন্তানের পরম ভালোবাসায় থাকার কথা, সেখানে নিসঃঙ্গ জীবনের আঁধারে কেটে যায় বাবার প্রতিটি দিন। যা সত্যিই দুঃখজনক। অতএব, আমাদের উচিত বাবার স্বপ্নকে পূরণ করা ও তার সব সময় পরম ভালোবাসায় বুকের মধ্যে আগলে রাখা। কখনো উফ শব্দও উচ্চারণ না করা। আর তাই বাবাদের জন্য সব সময় দোয়া করব ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা।’ আল্লাহতায়ালা সব বাবা-মাকে সুস্থ রাখুন, ভালো রাখুন ও নিরাপদ রাখুন।

হুসাইন আহমদ

শিক্ষার্থী, ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগ

দারুস-সুন্নাহ, টাঙ্গাইল।

বাবারা হলেন জীবনযুদ্ধে সত্যিকারের নায়ক

পৃথিবীর একমাত্র আপন মানুষ হচ্ছে মা এবং বাবা। যাদের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনেও অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। মায়ের যেমন অধিকার রয়েছে তদ্রƒপ বাবার মর্যাদাও কম নয় কোনো অংশে। আমাদের জানা মতে, পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু কেউ বলবে না খারাপ একটাও বাবা আছে। বাবা মানে বটবৃক্ষ, শুধু তাই নয় তিনি একাই একটি প্রতিষ্ঠান। বাবা এমন একজন ব্যক্তি যিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে সন্তানকে পরম যতেœ আগলে রাখেন। ছায়ার মতো সব সময় পাশে থাকেন। নির্ভর ভালোবাসা দেন। নিজে শত সমস্যার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও সন্তানদের সুরক্ষিত রাখেন। সন্তানের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতেও পিছপা হন না কখনো। আপাতগম্ভীর খোলসের আড়ালে থাকে তার অন্যরূপ। বাইরেরটা শক্ত খোলসে আটকে রাখেন আর ভেতরটা নরম নারকেলের মতো। সন্তানের সংকটে তিনি নিভৃতে চোখের অশ্রু ফেলেন। আর সামনে দাঁড়ান বর্মের মতো। সবকিছুতে সন্তানদের জন্য বাবার উৎকণ্ঠা অবিকল। সন্তানদের জন্য বাবা নিজ ভয়কে জয় করেছেন। অথচ বাবার কখনো বলা হয়ে ওঠে না, ‘বাবা আমি তোমায় ভালোবাসি’। বাবা যেমনই হোন, তিনি তার সন্তানের কাছে আদর্শ, জীবনযুদ্ধের একজন সত্যিকারের নায়ক। তবে সন্তানরা কিন্তু গুরুগম্ভীর বাবাকেও ঠিকই ভালোবাসে। হয়তো মুখ ফুটে বলতে পারে না। মায়ের সঙ্গে অনেক সময় কিছু ব্যাপার নিয়ে আলাপ করলে সঠিক সমাধান পাওয়া মুশকিল। কিন্তু বাবা যেমন বটবৃক্ষ তেমনি তার উপদেশ। বাবার গম্ভীর ভাবনার পেছনেও যে মায়াভরা একটা রূপ লুকায়িত থাকে তার আবিষ্কার করাতে আমরা কিছু সময় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে থাকি। বিপদাপদে মায়েদের মমতা অবশ্যই থাকে কিন্তু বাবাদের ভালোবাসার সঙ্গে থাকে সহযোগিতার হাতটাও। যদিও বা আজও বলা হয়নি বাবা তোমায় বড্ড বেশি ভালোবাসি। কিন্তু হৃদয়মাঝে বহু সন্তানদের বাবাদের প্রতি অজস্র ভালোবাসার বসবাস সর্বদা বিদ্যমান। তাই ভালো থাকুক পৃথিবীর ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ুক সব বাবার জন্য। তোমায় অনেক বেশি ভালোবাসি বাবা।

রাশেদ নাইব

শিক্ষার্থী

ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

বাবারা সুখী হোক সন্তানের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়

বাবা মানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। বাবা মানে সন্তানের সুখের জন্য নিজের কষ্টকে হাসিমুখে সয়ে যাওয়া। বাবা মানে কঠোর শাসনের আড়ালে চাপা পড়া সন্তানের জন্য তার কোমল ভালোবাসা। বাবার মাধ্যমে আমাদের জীবনের শুরু। বাবার হাত ধরেই আমরা পথ চলতে শুরু করি। বাবাকে দেখেই আমাদের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। বাবা আমাদের যোগ্য ও সফল মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখান। সেই স্বপ্ন পূরণে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যান। বাবারা এমনই। ত্যাগের প্রতিক। ধৈর্যের পাহাড়। আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে একজন আলেম বানাবেন। তিনি শৈশব থেকেই আমাকে ওয়াজ মাহফিল, তাবলিগি ইজতেমা ও আলেমদের মজলিসে নিয়ে যেতেন। দিনশেষে রাতে ঘুমের বিছানায় সুরা ও মাসনুন দোয়াগুলো শিখাতেন। ঘরে তালিম করতেন। দ্বীনি গল্প শুনাতেন। এভাবেই প্রতিনিয়ত চেষ্টার মাধ্যমে আমার শিশুমনে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার বীজ বপন করেছিলেন। এরপর একসময় মাদরাসায় ভর্তি হই। তখনো স্বল্প সময়ের জন্য বাসায় এলে কোরআন তিলাওয়াত করছি কি না, খুশু-খুজুর সঙ্গে নামাজ পড়ছি কি না এবং সময়মতো সুন্নাহগুলো পালন করছি কি না ইত্যাদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। একজন আদর্শ আলেম হিসেবে গড়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। আমার বাবা একজন সরকারি চাকরিজীবী। কয়েক বছর ধরে অসুস্থ। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। অবসরে যাওয়াটা তার জন্য জরুরি ছিল। আমাদের শত অনুরোধের পরও তিনি চাকরি ছাড়তে নারাজ। নিজেকে নিঃশেষ করে হলেও খেটে যাচ্ছেন সন্তানদের জন্য একটু হলেও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে। প্রতিটি বাবার গল্প এমনই। সাধ্যের সবটুকু দিয়ে তারা চেষ্টা করেন সন্তানদের সুখে রাখতে। পড়াশোনা করিয়ে সফল ও আদর্শ মানুষ বানাতে। তাই বাবা-মায়ের সঙ্গে কিছুতেই দুর্ব্যবহার করা উচিত নয়। তাদের বার্ধক্যের দুঃসময়ে যেন তাদের ইচ্ছাগুলো পূরণ করি। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাদের আগলে রাখি। তাদের খেদমত করতে পারাটাকে নিজেদের সৌভাগ্য মনে করি। আল্লাহতায়ালা তওফিক দান করেন, আমিন।

আবু যোবায়ের

শিক্ষার্থী

আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়