মোহাম্মদ আলী
বৈশাখী মেলায় বাঙালির ঐতিহ্যের খাবার

বছর ঘুরে আবারও এলো পহেলা বৈশাখ। বৈশাখকে বরণ করতে উৎসুক হয়ে আছেন বাঙালিরা। চলছে নানা প্রস্তুতি। সাজসজ্জা, পোশাক, খাওয়া-দাওয়া সবকিছু সাজানো হচ্ছে বৈশাখের আমেজে। একদমই বাঙালি ঘরানায়। বৈশাখীর খাবারেরও বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। বাঙালির প্রিয় ভাত, ভর্তা আর ইলিশ মাছ তো থাকেই। গ্রামবাংলার মেলায় আয়োজনে মিঠা কদমা, বাতাসা, মুরলি, খাগড়াই, নিমকিসহ থাকে আরো কত কী! গ্রাম ছাড়িয়ে এসব মিষ্টি পদের দেখা এখন শহুরে জীবনেও মেলে। বিশেষ করে বৈশাখী মেলায় পাওয়া যায় এসব খাবার।
বৈশাখের আগমনে দেশজুড়ে শুকনো এসব মিঠাইয়ের চাহিদা বেড়ে যায়। গ্রামবাংলার লোকজ এসব খাবার প্রস্তুতিতেও ব্যস্ত সময় পার করেন কারিগররা। বৈশাখ উপলক্ষে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ কেজি মিষ্টান্ন তৈরি করেন কারিগররা। সকাল, দুপুর আর রাতের খাবারের মাঝেই অথবা মেলায় ঘুরতে ঘুরতে এসব খাবার খেতে বেশ পছন্দ করেন বাঙালিরা।
বাতাসা-খাগড়াই
বাতাসা ও খাগড়াই দুটিই খেতে মিষ্টি। তবে আকৃতির দিক থেকে এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বাঙালির প্রিয় বাতাসা তৈরি হয় চিনি দিয়ে। খুব ঘন করে চিনি জ্বাল দিয়ে এরপর শুকিয়ে নেওয়া হয়। সাদা রঙের চ্যাপ্টা আকৃতির হয় এটি। আর খাগড়াইয়ের আকৃতি কিছুটা কদম ফুলের মতো। আকারে অনেক ছোট হয়। এটিও চিনি দিয়ে তৈরি। তবে এর ভেতরে থাকে মুড়ি বা খই।
কদমা
কদমাও বাংলার একটি শুকনো মিষ্টি। কদমাও তৈরি হয় চিনি দিয়ে। চিনি জ্বাল দিয়ে লই তৈরি করা হয়। এরপর সেই লই থেকে বানিয়ে নেওয়া হয় কদমা। বাংলায় অনেক পুরোনো মিষ্টির মধ্যে কদমা অন্যতম। বাংলায় অতিথি আপ্যায়নে কদমা দেওয়া পুরোনো রীতি। তবে বর্তমান সময়ে শুধু বৈশাখ উৎসবেই কদমা খাওয়া হয়। পরিবারের আয়োজনে বা অতিথির আপ্যায়নে বৈশাখীর আয়োজন মানেই কদমা থাকবেই। সিলেট অঞ্চলে এই সাদা কদমাকে তিলুয়া বলা হয়।
কদমা দেখতে অনেকটা কদমফুল আকারের হয়। বাইরে দেখতে শক্ত মনে হলেও ভেতরটা থাকে ফাঁপা। ওপর ও নিচের আকৃতি অনেকটাই কমলালেবুর মতো চাপা। মূলত চিনি দিয়ে তৈরি হয় এটি। বাড়িতে কদমা তৈরি করতে প্রথমে পানিতে চিনি দিয়ে ফোটাতে হবে। এরপর ঠাণ্ডা করে চিনি জমাট বাঁধলে ছড়ানো পাত্রে অল্আপ আইসিং সুগার ছিটিয়ে শিরা ঢেলে অল্প গরম থাকা অবস্থায় রোল করে খুঁটিতে ঝুলিয়ে টানতে হবে। এরপর আবারও ভাঁজ করে পুনরায় টানতে হবে। কয়েকবার করলেই ভেতরটা ফাঁপানো হয়ে যায় তখন চপিংবোর্ডে আইসিং সুগার ছিটিয়ে রোল করে কদমা বানানোর ছাঁচে চাপ দিয়ে কেটে নিতে হয়। এরপর বাতাসে রেখে শুকিয়ে নিলেই হয়ে যাবে কদমা।
চিনির তৈরি হাতি-ঘোড়া
বৈশাখী মেলার অন্যতম অনুষঙ্গ চিনির তৈরি হাতি-ঘোড়া, মটক, পাখি ও নৌকা। মানিকগঞ্জের শত বছরের ঐতিহ্য এই খাবার। বৈশাখ উপলক্ষে দেশজুড়ে আয়োজিত মেলায় চিনির তৈরি হাতি-ঘোড়ার দেখা মিলবে। মেলায় অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে চিনির তৈরির হাতি-ঘোড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর রূপের তৈরি সাজ। বৈশাখী আগমনী বার্তায় কারিগররা প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চিনির তৈরি এসব খাবার প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় পার করেন। খাবারটি তৈরি হয় শুধু চিনি দিয়েই। প্রথমে বিশেষভাবে তৈরি করা পাতিলে চিনি জ্বাল দেওয়া হয়। চিনির সিরা তৈরি হলে গরম অবস্থায় সেটি কাঠের ফ্রেমে ঢালা হয়। এরপর ১০ মিনিটের অপেক্ষা। ১০ মিনিট পরই বের করে আনা হয় চিনির সাজ।
নিমকি
বৈশাখীর মেলাজুড়ে মিষ্টি পদে পাশে থাকে নোনতা নিমকিও। যারা মিষ্টি কম পছন্দ করেন নিমকি তাদেরই বেশি পছন্দের খাবার। নিমকি মিষ্টি ও নোনতা দুই স্বাদেই পাওয়া যায়। তবে নোনতা নিমকির চাহিদা একটু বেশিই থাকে। নিমকি বানাতে প্রথমে একটি পাত্রে ময়দা, কালিজিরা, জোয়ান, লবণ ও পরিমাণমতো ঘি দিয়ে ভালোভাবে মেখে নিতে হবে। সামান্য পানি দিয়ে মাখিয়ে রাখতে হবে ৩০ মিনিটের জন্য। এরপর ময়দার মণ্ড থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে বেলে নিতে হবে। ছুরি দিয়ে ছোট ছোট নিমকি আকারে কেটে কড়াইয়ে গরম তেলে ভেজে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে নিমকি।
"




































