প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক
শ্রমিক থেকে কারখানার মালিক

একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসার। অভাবের সঙ্গে নিত্য লড়াই- এমন এক অতীত থেকে উঠে এসে আজ তিনি নিজেই এক অনুপ্রেরণার নাম। তিনি হলেন, গাজীপুরের তরুণ উদ্যোক্তা অহিদুল ইসলাম। তিনি মহানগরীর টঙ্গীর আউচপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত রেডিমেড জিন্স প্যান্ট (ডেনিম) কারখানা ‘অহিদ ফ্যাশন’ এর স্বত্বাধিকারী। ২০০১ সালে টঙ্গীর সেনাকল্যাণ ভবনের একটি পোশাক কারখানায় মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করা সেই ১৭ বছর বয়সি অহিদুল তার সততা, অদম্য ইচ্ছা আর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের জোরে আজ শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, বরং দেশের তৈরি পোশাক খাতে সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একজন সাধারণ পোশাক শ্রমিক থেকে আজ তিনি হয়ে উঠেছেন শত শত তরুণ উদ্যোক্তার পথপ্রদর্শক।
অহিদুলের শুরুর দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না। একসময় তিনি সোয়েটার কারখানায় চাকরি করতেন এবং পাশাপাশি ফুটপাতের ভ্যান গাড়িতে তৈরি পোশাক বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন। তবে পাইকারি বাজারে ভালো মানের পোশাকের চাহিদা থাকলেও মহাজনদের অসততা ও চালাকির কারণে তাকে বার বার লোকসান ও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হতো। কিন্তু সততা ও আত্মমর্যাদায় বলীয়ান অহিদুল দমে যাননি। ভ্যানে ব্যবসা করে নিজের জমানো মাত্র ৩ লাখ টাকা সম্বল নিয়ে ২০১২ সালে মাত্র ১০টি সেলাই ও ১টি কাটিং মেশিন কিনে টঙ্গীর আউচপাড়ায় দুটি রুম ভাড়া নিয়ে শুরু করেন তার নতুন লড়াই।
সোয়েটার কারখানায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলেও জিন্স প্যান্ট তৈরির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অহিদুলের ছিল না। কিন্তু মেধা ও একাগ্রতা থাকলে কোনো বাধাই টেকে না। তার প্রমাণ তিনি নিজেই। বাজার থেকে একটি প্যান্ট কিনে এনে সেটির প্রতিটি অংশ খুলে, আয়রন করে নিজেই কাঁচি দিয়ে কাপড় কাটার কৌশল শিখে নেন। মাত্র ৪ জন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করা সেই ছোট্ট কারখানা ৩-৪ বছরের মধ্যে রূপ নেয় এক বিশাল কর্মযজ্ঞে। যেখানে এখন দিন-রাত ৪০-৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন।
অহিদুলের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় বৈশ্বিক মহামারি করোনা। যখন চারদিকের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির,তখন তিনি দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে অনলাইনের মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিজের পণ্যের প্রচার শুরু করেন। ফেসবুক ও ইউটিউবে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পর সারা দেশ থেকে অভাবনীয় সাড়া পান। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে গাজীপুর চৌরাস্তা, বোর্ড বাজার ও টঙ্গী বাজার আশারাফ সেতু কমপ্লেক্সে গড়ে তোলেন ৬টি পাইকারি শোরুম। তবে অহিদুলের সফলতার সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো, তিনি একা বড় হতে চাননি। তার কারখানায় কাজ করতে আসা সাধারণ হেল্পার, অপারেটর বা কাটিং মাস্টারদের তিনি শুধু কাজই শেখাননি, বরং তাদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়েছেন। অহিদুলের হাত ধরে তার দেওয়া দিক-নির্দেশনা ও কারিগরি সহযোগিতায় আজ প্রায় ১০০ জন সাবেক কর্মী নিজেদের কারখানা তৈরি করে সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন। এছাড়া প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি দক্ষ অপারেটর তৈরি করেছে তার এই প্রতিষ্ঠান।
অহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কর্মচারীদের সঠিক সময়ে ন্যায্য পাওনা দেওয়াই তার ব্যবসার মূলনীতি। কর্মচারীদের সঠিকভাবে পরিচালনা করার এবং ব্যবসায় উন্নতি করার প্রধান কৌশল হলো তাদের সঠিক সময়ে ন্যায্য পাওনা ও বেতন পরিশোধ করা। কর্মীদের সন্তুষ্টিই ব্যবসাকে সমৃদ্ধ করে।’ বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ব্যবসা কিছুটা কম হলেও তিনি আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘যেকোনো ব্যবসায় ভালো ও মন্দ সময় আসে। তবে যারা সততার সঙ্গে ব্যবসা করেন তাদের মন্দ সময় বেশি দিন থাকে না।’
"







































