আব্দুস সালাম বাবু, বগুড়া

  ৮ ঘণ্টা আগে

উদ্যোক্তা

বিশ্বের ১৯ দেশে যাচ্ছে মাংসের আচার

শূন্য থেকে সাফল্য

সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সফল হয়েছেন বগুড়ার নারী উদ্যোক্তা আফসানা নীরা। যেন শূন্য থেকে সাফল্যের চূড়ায়। শুধু আচার তৈরি করেই সংসারের অভাব ঘুচিয়েছেন তিনি। তার তৈরি মাংসের আচারসহ বিভিন্ন ফলের আচারের কদর এখন দেশে-বিদেশে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে আফসানার আচার। মাসে ১ হাজার কেজির বেশি আচার বিক্রি করেন তিনি। উদ্যোক্তা হিসেবে পেয়েছেন জয়ীতা সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কার। নিজে স্বনির্ভর হয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন আরো ১৫ জন বিভিন্ন বয়সি মানুষ। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখছেন, রপ্তানিমুখী শিল্পে অবদান রাখছেন। সম্প্রতি বগুড়ায় সেমিনারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু প্রশংসা করেছেন এই নারী উদ্যোক্তার।

বগুড়া শহরের সেউজগাড়ী এলাকার বাসিন্দা আফসানা নীরা। সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত মিললেও শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না। অনেকটা গল্পের মতো তার ঘুরে দাঁড়ানো। প্রথমে বিউটিফিকেশন, এরপর কাপড়ের ব্যবসায় সাড়া না পেয়ে ব্যতিক্রম কিছু করবেন সেই ভাবনা থেকেই নানী গরুর মাংস ভেজে ভেজে আচারের মতো রাখার সেই স্মৃতি থেকেই শুরু। মূলত স্বামীর পরামর্শে রান্নাবান্না থেকেই ব্যবসার পরিকল্পনা আর সেই থেকেই উদ্যোক্তা হয়ে উঠা।

শুরুটা মোটেও ভালো ছিল না, হাতে পূঁজি ছিল না, উপায় না পেয়ে মুঠোফোন বিক্রি করে দেন। হাতের শখের স্মার্ট ফোন বিক্রির সাড়ে চার হাজার টাকা আর হাতে থাকা ৫০০, পূজিঁ মোটে ৫ হাজার, এই নিয়েই যাত্রা শুরু। শুরুতে আচার বিক্রি কম হলেও এখন আফসানা ব্যস্ত থাকেন আচার তৈরি, বিক্রি নিয়ে। আচারি ফুড নামে অনলাইন পেজে প্রচার করে ব্যাপক সাড়া পান তিনি।

পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আচারের অর্ডার আসতে থাকে।

আফসানা নীরা জানান, ২০১৮ সালে আচার তৈরি শুরু হলেও করোনাকালে তার আচারের খবর ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে। প্রথমে এক কেজি থেকে ধীরে ধীরে, ৫ কেজি, ১০ কেজি এভাবে এখন ১ হাজার কেজি আচার তৈরি করেন প্রতি মাসেই। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তার কাছে থেকে পাইকারি আচার কিনে থাকেন।

তিনি জানান, প্রাণিসম্পদ অধিপ্তরের পরামর্শে প্রথমে সুস্থ নিরাপদ গরুর মাংস সংগ্রহ করেন, এরপর কেটে পরিষ্কার করে বিভিন্ন মসলা দিয়ে মাংস মেরিনেট করে রান্না শুরু হয়। পানি শুকিয়ে এলে কড়াইয়ে ভেজে ভেজে, তৈরি হয় সুস্বাদু মাংসের আচার। মূলত ভালোমানের মাংস থেকে হাড় ও চর্বি বাদ দিয়ে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে চুলায় মাংস সেদ্ধ হয়। এরপর হরেক রকমের মসলা ব্যবহার। পানির ব্যবহার নেই বললেই চলে, খাঁটি সরিষার তেল ব্যবহার করে আচারের স্বাদ আরো বেড়ে যায়।

উদ্যোক্তা আফসানা নীরা জানান, গরুর মাংসের পাশাপাশি আম, রসুন, তেঁতুল, বরই, জলপাই, ইলিশ, চ্যাপাসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল আর সবজির আচার তৈরি করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করছেন তিনি। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বিসিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়েছেন প্রশিক্ষণ। পেয়েছেন জয়ীতা সম্মাননা, যুব দিবসের পুরস্কার। গোটা মাসজুড়ে গরুর মাংসের আচারসহ অন্যান্য আচার বিক্রি করেন ১ হাজার কেজিরও বেশি। তার কাজে সহযোগিতা করে স্বনির্ভর হয়েছেন আরো বেশ কয়েকজন নারী। মাসে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার আচার বিক্রি করেন। এ থেকে যা আয় হয় তা থেকে ১৫ জন কর্মীকে বেতন দিয়ে বেশ ভালোই আছেন তিনি।

তিনি জানান, শুরুতে একাই সব কাজ করতেন, ব্যবসা বড় হয়ে গেছে, তখন লোকসংখ্যা বাড়তে থাকে, এখন ১৫ জন তার আচারি ফুডে কর্মরত। দেশের সব জেলায় যাচ্ছে মাংসের আচার, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের ১৯ দেশে তার মাংসের আচার যাচ্ছে। এসব দেশে বসবাসকারীরা তাদের পরিচিতজনের মাধ্যমে বগুড়া থেকে নিয়মিত নিয়ে যাচ্ছেন মাংসের আচার। ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে আচারের কারখানা গড়ে দেশের বাইরে পাঠাতে চান আচারি ফুডের আচার।

আচারি ফুডে কর্মরতরা জানান, তারা এখানে কাজ করে বেশ ভালো আছেন। পাশাপাশি একজন উদ্যোক্তা হতেও তারা আগ্রহ প্রকাশ করেন। বগুড়া সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রায়হান জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আচার রপ্তানি করছে আফসানা নীরা, তার প্রতিষ্ঠানে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করতে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করছে। আফসানা নীরা সেই কাজটি করছে, আমাদের খামারিদের উৎপাদিত নিরাপদ মাংস প্রক্রিয়াজাত করে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলাসহ দেশের বাইরে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে রপ্তানি করছে। এতে অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে আবার প্রাণিসম্পদ শিল্পকে রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করতে তার বিশেষ অবদান রয়েছে। আমরা আফসানার মতো উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দেওয়া, কারিগরি সহায়তা দেওয়াসহ তাদের পাশে রয়েছি।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়