এম খোরশেদ আলম, পীরগাছা (রংপুর)

  ২৬ নভেম্বর, ২০২১

দুর্গম চরে শিক্ষার আলো

পাখা মেলেছে চার তরুণের স্বপ্ন

তিস্তার দুর্গম চরাঞ্চল কান্দিনার চর। আঁকাবাঁকা কাঁচা সড়কের পর জমির আইল দিয়ে চলাচল। অ্যাম্বুলেন্স কিংবা বড় গাড়ি যাওয়ার সুযোগ নেই। অগত্যা ভ্যানে করে কাঁচা সড়কের ঝাঁকুনি খেতে খেতে বহন করা হচ্ছে অসুস্থ রোগী রহিমা বেগমকে। অনেক দিন ধরেই অসুখে ভুগছেন। বাতাস লেগেছে, এই বলে কবিরাজের মাধ্যমে বেহুলার নাচ-গান করে সেরে তোলার আধ্যাত্মিক চিকিৎসার পর শেষ সময়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন। কিন্তু বিধি বাম। অল্পবয়সেই ছোট ছোট দুই ছেলেমেয়ে রেখে রহিমাকে চলে যেতে হলো পরপারে। পীরগাছা উপজেলার তিস্তার চরাঞ্চলের এমন ঘটে যাওয়া ঘটনা যেন নিত্যদিনের চিত্র। তাই দেখে মনে দাগ কেটেছিল দেশের প্রান্তিক জনপদে বেড়ে ওঠা চার তরুণের। আর তারা হচ্ছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান রাব্বি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাজেদুল ইসলাম মাজেদ ও সদ্য উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরুনো শিক্ষার্থী মাইদুল ইসলাম। এই চার তরুণের হাতেই গড়ে তোলা হয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্বপ্ন ছুঁই ইয়ুথ ফাউন্ডেশন’। তাদরে এই স্বপ্নভ্রুণ এখন পাখা মেলেছে।

২০১৯ সাল পীরগাছা উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলের এই সংগঠনটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আলোর প্রদীপ হয়ে কাজ করছে। ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের পাঠদান, টাকার অভাবে বন্ধ লেখাপড়া এমন শিক্ষার্থীদের সহায়তা, শীতার্তদের শীতবস্ত্র, স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা, রক্তদান কর্মসূচি, অনাহারীদের বাসায় খাদ্যদ্রব্য দেওয়াসহ চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে সংগঠনটি। করোনাকালেও তাদের ভূমিকা অপরিসীম।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দুর্গম চরের মধ্যে ঝকঝকে টিনের চালা। ভিতরে শিশুদের কোলাহল। ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল ছোট ছোট শিশুদের। মাটিতে চট বিছিয়ে কেউ পড়ছে, কেউ খেলছে। কেউবা পড়া বুঝে দিতে ব্যস্ত। ছোট্ট একটি ঘরে গাদাগাদি করে চলছে পড়া। নেই কোনো বেঞ্চ কিংবা ব্ল্যাক বোর্ড। শিক্ষিকা হিসেবে পড়াচ্ছেন সানজিদা ইসলাম রিপা। তিনিও অনার্সের শিক্ষার্থী। কান্দিনার চরে তার বাড়ি। বাড়িতে এলেই পালা করে এসব শিক্ষার্থীকে পড়ান তিনি। রিপা জানান, বাড়িতে এসে অবসর সময়ে চরের শিশুদের লেখাপড়া শিখাচ্ছি। এতে আমার সময়ও কাটছে, তারাও কিছু শিখছে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বপ্ন ছুঁই ইয়ুথ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মেহেদী হাসান রাব্বি বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের কুসংস্কার ও অসহায়ত্ব দেখে বড় হয়েছি। চরের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত না করে, সাংসারিক কাজ ছিল তাদের লক্ষ্য। অল্পশিক্ষিত এসব মানুষের মাঝে দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগেই থাকত। এসব অন্ধকারাচ্ছন্ন ও কুসংস্কার দূর করার কারণে আমরা সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করি।

আমাদের ফ্রি পাঠশালা, রক্তদান কর্মসূচি, টলিমেডিসিন সেবাসহ নানা কর্মসূচি চালু রয়েছে। তবে আর্থিক সংকটে আমরা দ্রুত এগোতে পারছি না।

সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম বলেন, সংগঠনে ১১ জনের কার্যকরী কমিটি ও দেড় শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছে।

এরই মধ্যে ‘স্বপ্ন ছুঁই ব্লাড ব্যাংক’ নামে প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি। অধিক ফলনশীল এবং ঔষধি গাছ লাগানোর লক্ষ্যে ‘স্বপ্ন ছুঁই নার্সারি’ করা হয়েছে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে থাকা কোষাধ্যক্ষ মাজেদুল ইসলাম বলেন, চরের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ঝরেপড়া রোধে স্বপ্ন ছুঁই স্কুল, বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতা, মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে তরুণদের উদ্বুদ্ধকরণ, তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিকরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে সংগঠনটি। আঁধারে ঢাকা চরের মানুষকে আমরা আলো ছড়িয়ে দিতে কাজ করছি।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close