কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

  ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০

জাহাজভাঙা শিল্পে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ

পরিবেশসম্মত জাহাজভাঙা ইয়ার্ড ৩ থেকে ৪টি বাকিগুলো চলছে ঢিমেতালে

জাহাজভাঙা শিল্পে সম্ভাবনার জায়গা থেকে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। কয়েক বছর ধরে বিশ্বের পুরোনো জাহাজভাঙার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে থাকলেও করোনা মহামারি এবং নতুন বাজেটে ভ্যাট এবং এটিভি (অগ্রিম ভ্যাট) আরোপের কারণে এ শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪২টি জাহাজ ভেঙে শীর্ষে উঠে এসেছে ভারত। বাংলাদেশ ৯৮টি জাহাজ ভেঙে দ্বিতীয় স্থানে নেমে এসেছে। তৃতীয় স্থানে তুরস্ক ও পাকিস্তান রয়েছে চতুর্থ স্থানে। বেলজিয়ামভিত্তিক ‘এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম’ সূত্র এ তথ্য দেয়।

২০১৯ সালে ২৩৬টি, ২০১৮ সালে ২২১, ২০১৭ সালে ২১৪ এবং ২০১৬ সালে ২৫০টি জাহাজ ভেঙে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানটি ধরে রেখেছিল। গত বছরের হিসাবে বাংলাদেশে বিশ্বের ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ জাহাজভাঙা হয়েছে।

------
চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার এলাকা ঘিরে গড়ে উঠেছে জাহাজভাঙা শিল্প। বিশ্বে প্রতি বছর যেসব জাহাজ পরিত্যক্ত বা স্ক্র্যাপ ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশি ক্রেতারা এগুলো নিলামে কিনে নেয়। কেনার পর এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বন্দরে আসে। বন্দর থেকে নিয়ে আসা হয় বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা সীতাকুন্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে। এখানে হাজার হাজার শ্রমিক জাহাজভাঙার কাজ করেন। এসব জাহাজে শুধু লোহার যন্ত্র নয়, এর ভেতরে রয়েছে ইস্পাত, ইঞ্জিন, বয়লার, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, আসবাবপত্র, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র। যেগুলো কেটে স্ক্র্যাপ আকারে বিক্রি হয়। নিয়ে যান সারা বাংলাদেশে থাকা বিভিন্ন স্টিল ও অটো রি-রোলিং কোম্পানির মালিকরা।

এ অঞ্চলে প্রায় ১৫০টি ইয়ার্ড ছিল। ক্রমে কমতে কমতে তা নেমে এসেছে ২০ থেকে ২৫টিতে। এর মধ্যে পরিবেশসম্মত জাহাজভাঙা ইয়ার্ড ৩ থেকে ৪টি। বাকিগুলো চলছে ঢিমেতালে। জাহাজভাঙা শিল্পের প্রযুক্তিগত উন্নত না হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের কাছে জাহাজ বিক্রিও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন এনজিও সংস্থার চাপে সুবিধা করতে পারছে না বাংলাদেশ। কারণ পরিবেশসম্মত ইয়ার্ড না হলে জাহাজ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আসছে সামনে। আগামী ২০২৩ সাল থেকে পরিবেশসম্মত ইয়ার্ড ছাড়া অন্য কারো কাছে জাহাজ বিক্রি করবেন না উদ্যোক্তরা। আগে জাহাজ বিক্রি হতো উন্মুক্ত পদ্ধতিতে। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে টেন্ডারের মাধ্যমে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কমে আসছে। বাজার দখল করছে ভারত। জাহাজভাঙার জন্য পরিবেশসম্মত ইয়ার্ড করতে খরচ লাগবে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা। এ বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে এখানে ইয়ার্ড করা অনেকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

২০২০ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ৯ মাসে জাহাজভাঙা তালিকার শীর্ষে উঠেছে ভারত। দেশটিতে রয়েছে পরিবেশসম্মত ইয়ার্ড। ফলে এখানে শ্রমিকের মৃত্যু বাংলাদেশের তুলনায় নগণ্য। বাংলাদেশের ইয়ার্ডগুলোতে ম্যানুয়াল হওয়ার কারণে শ্রমিকের মৃত্যুর হার ছিল বেশি। এছাড়া ইয়ার্ডগুলো পরিবেশ নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হতে থাকে। এজন্য আন্তর্জাতিক চাপে পরিবেশসম্মত ইয়ার্ড না হলে ব্যবসায়ীদের টেন্ডারে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধের দাবি উঠে। নানামুখী চাপে এ বছর বাংলাদেশ জাহাজভাঙার হিসেবে নেমে এসেছে প্রথম থেকে দ্বিতীয় স্থানে।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবু তাহের বলেন, বর্তমানে করোনার কারণে জাহাজভাঙা শিল্পে মন্দা যাচ্ছে এটা ঠিক। তবে আমরা এ অবস্থা কাটিয়ে উঠব। তিনি বলেন, পরিবেশসম্মতভাবে জাহাজভাঙার জন্য অনেকগুলো ইয়ার্ডে কাজ চলছে। আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০টি পরিবেশসম্মত ইয়ার্ড প্রস্তুত হয়ে যাবে। আবু তাহের বলেন, ভারত এ বছর শীর্ষে থাকার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে তারা বড় এবং ছোট সব জাহাজ কাটে। আমাদের এখানে বড় জাহাজের পরিমাণ বেশি। গত বছর এখানে জাহাজের সংখ্যা এবং ওজনের দিক থেকেও শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। এ শিল্প নিয়ে সরকারকে আরো নজর দিতে হবে বলে তিনি মত ব্যক্ত করেন।

সূত্র জানায়, জাহাজভাঙা শিল্প ভারতের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে নতুন বাজেটে ভ্যাট এবং এটিভি (অগ্রিম ভ্যাট) আরোপ। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জাহাজ কিনতে এখন প্রতি টনে ভ্যাট দিতে হচ্ছে তিন হাজার টাকা। নতুন আরোপিত এ ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহার না হলে এ শিল্পের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ খাতে অ্যাডভ্যান্স ট্রেড ভ্যাট ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও ভ্যাট অফিস থেকে সেই টাকাও ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, গত ২০১৯ সালে বিশ্বে ৬৭৪টি সমুদ্রগামী পুরোনো জাহাজ বিক্রি হয়। পুরোনো এ জাহাজগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা কিনেছেন ২৩৬টি। গত বছর বিশ্বে যত জাহাজ বিক্রি হয় তার ৬৫ শতাংশই কিনেছেন বাংলাদেশ ও ভারতের কারখানা মালিকরা।

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়