করোনার জন্য শুধু বাদুড়কেই দায়ী করা উচিত নয়

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

নতুন করোনাভাইরাস হয়তো বাদুড় অথবা অন্য কোনো প্রাণী থেকেই মানুষের শরীরে এসেছে; কিন্তু সেজন্য কী সেই প্রাণী দায়ী? না মানুষই বারবার নিজের সীমানা পেরিয়ে অন্য প্রাণীর রাজ্যে হানা দিয়ে সংক্রমিত হচ্ছে, যার ফল হচ্ছে মহামারি? বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, করোনাভাইরাস মহামারির জন্যও বাদুড়কেই শুধু দায়ী করা উচিত নয়। খবর বিবিসির।

বিশে^র প্রায় সব দেশেই বাদুড় রয়েছে। কেউ বাদুড়কে বলে ‘ডানাওয়ালা ড্রাগন’; কেউ বলে ‘উড়–ক্কু ইঁদুর’, নয়তো ‘শয়তান’। অনেক সমাজে একটি কুসংস্কার চালু রয়েছে, তা হলো বাদুড়ের ভেতর বাস করে ‘অপদেবতা’, আর তা মানুষের শরীরেও আসর করে। করোনাভাইরাসের এই মহামারির মধ্যে বাদুড় নিয়ে কুসংস্কার আরো বদ্ধমূল হলো।

চীনের উহান থেকে গত বছরের ডিসেম্বরে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস। পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া নতুন এই ভাইরাসের আসল উৎপত্তিস্থল কোথায় তা এখনো জানা যায়নি। তবে বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ একমত হয়েছেন, এই ভাইরাস মানুষের শরীরে পৌঁছেছে খুব সম্ভবত বাদুড়ের মাধ্যমে। তবে সেজন্য বাদুড়কে দোষ দিতে রাজি নন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বণ্য প্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের আনাগোনা বাড়াই সমস্যার মূল কারণ। তারা বলছেন, ‘কেবল বাদুড়কে দোষ দেবেন না’। বাদুড়ের শরীরে থাকা ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন ফ্রেঞ্চ রিসার্চ ইনস্টিটিউট সিরাডের গবেষক ড. ম্যাথিউ বার্গারল। এসব নমুনা ল্যাবে পৌঁছলে বিজ্ঞানীরা বাদুড়ের শরীরে থাকা ভাইরাসের জিন বিন্যাস বের করেন। এভাবে তারা কয়েক রকম করোনাভাইরাস খুঁজে পেয়েছেন, যার মধ্যে আছে সার্স এবং সার্স-সিওভি-২।

বার্গারল বলেন, মানুষ যেভাবে প্রকৃতি ধ্বংস করে চলেছে, তার সঙ্গে নতুন নতুন রোগের বিস্তার ঘটার যোগসূত্র রয়েছে। গরু চড়াতে, চাষ করতে, কিংবা রাস্তা বা স্থাপনা নির্মাণের জন্য মানুষ যখনই বন ও তৃণভূমি দখল করছে, তখনই আসলে বন্যপ্রাণীদের বাধ্য করা হচ্ছে মানুষের বা মানুষের পালিত গবাদিপশুর কাছাকাছি আসতে; আর তাতে বন্যপ্রাণী থেকে মানুষের মাঝে ভাইরাস ছড়ানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

পর্তুগালের ইউনিভার্সিটি অব পোর্তোর রিকার্ডো রোচা বলেন, অন্য অনেক প্রাণীর মতো বাদুড়ও যে সম্ভাব্য অনেক রোগের পোষক, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

তবে বাদুড়ের ১ হাজার ৪০০ প্রজাতির মতো পাখি, গৃহপালিত প্রাণী ও ইঁদুর প্রজাতির প্রাণী থেকেও একই অনুপাতে মানুষের মাঝে ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রতি চারটি নতুন সংক্রামক রোগের মধ্যে তিনটিই মানুষের মাঝে আসে অন্য কোনো প্রাণীর মাধ্যমে। তবে সেজন্য কোনো প্রাণী প্রজাতিকে দোষ না দিয়ে বরং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করতে বলছেন ড. রোচা। তার ভাষায়, একটি সুস্থ বাস্তুসংস্থান এবং মানুষের ভালোর জন্য বাদুড়ের ভূমিকা ?গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং বাদুড়কে ‘অপদেবতা’ বানিয়ে দেওয়াটা ‘ভয়ংকর বিপর্যয়’ ডেকে আনবে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগোর ড. ডেভিড রবার্টসন। তিনি বলছেন, প্রাণী থেকে মানুষের মাঝে রোগ ছড়াচ্ছে মানুষের কারণেই, কারণ তারা বার বার নিজেদের সীমানা ছাড়িয়ে প্রাণী রাজ্যে হানা দিচ্ছে।

সার্স-সিওভি-২ এর আদি রূপ হয়ত বাদুড়ের শরীরে আছে বহু বছর ধরেই, হয়ত আগে অন্য প্রাণীদেরও তা সংক্রমিত করেছে।

এর মধ্যে করোনাভাইরাসের বিস্তার শুরুর পর পেরু, ভারত, চীন ও ইন্দোনেশিয়ায় বাদুড়ের ওপর চড়াও হওয়ার মতো কিছু ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও খুঁজে খুঁজে বাদুড় মারা হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের এ ধরনের ভুল পদক্ষেপ বিপন্ন বাদুড় প্রজাতির জন্য শোচনীয় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে; আর তাতে নতুন নতুন রোগ বিস্তারের ঝুঁকি আরো বাড়তেও পারে।

কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ডগলাস ম্যাকফারলেন বলেন, সবচেয়ে শঙ্কার জায়গাটা হলো, অনেক বাদুড় প্রজাতিই রয়েছে অস্তিত্বের সংকটে। কাজেই এ ধরনের খুব ছোটখাটো ভুলও বাস্তু ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে, কারণ ওই বাস্তু কাঠামোর ওপর মানুষকেও নির্ভর করতে হয়।

 

 

"