বললেন মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবির মজুমদার

‘একদিন মরতেই হবে, তাই দেশের জন্য লড়াই করে মরবো’ (ভিডিও)

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২০, ১১:১৭ | আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২০, ২০:৪০

দুলাল মিয়া, নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা)

চারদিকে গোলাগুলি আর বিভিন্ন বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও মৃত্যুর খবর শুনি প্রতিদিন। বয়স তখন ২১। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার্থী। কলেজ শাখার ছাত্রলীগের সদস্য। কি করবো কিছুই বুঝতেছি না। চট্টগ্রাম থেকে বাড়িতে চলে আসি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ মনোবল ও শক্তি জোগায়। আর মনে মনে চিন্তা করি, ‘একদিন তো মরতেই হবে, তাই দেশের জন্য লড়াই করে মরবো।’

প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকাকে এসব কথা বলছিলেন কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার রায়কোট উত্তর ইউপির শ্রীরামপুর গ্রামের হাজি আবদুল গণি মজুমদারের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবির মজুমদার। তিনি অকপটে জানিয়েছেন যুদ্ধকালীন স্মৃতিবিজরিত দিনগুলোর কথা। স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া এ বীর সৈনিকের মুখোমুখি হয়েছেন আমাদের নাঙ্গলকোট প্রতিনিধি দুলাল মিয়া

পরিবারে তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে হুমায়ুন কবির সবার ছোট। অভাবের সংসার। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা মারা যান। কোনোমতে নিজের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর তখন সারা দেশে যুদ্ধ শুরু হলো। 

হুমায়ুন কবির বলেন, যেমন ভাবনা তেমন কাজ। শপথ নিয়ে রোব বা সোমবার দিন ভোর সকালে একা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই যুদ্ধ করার উদ্দেশে। পায়ে হেঁটে চৌদ্দগ্রাম বাজারের দক্ষিণে হাঁড়ি সদ্দার বাজার দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সোনামুড়া শহরের দক্ষিণে বড়মুড়া ক্যাম্পে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার লোক আসছে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য। সেখানে দু’দিন থাকার পরে আমিসহ ২ হাজার ৭শ জনকে বাছাই করে আসাম রাজ্যের লোহারবন ক্যাম্পে যাই। সেখানে এক মাস প্রশিক্ষণ নিই। পরে আবার চলে আসি বড়মুড়া ক্যাম্পে। একদিন থাকার পর মেজর বিগ্রেডিয়ার খান মোশাররফ হোসেনের অধীনে চলে যাই। 

হুমায়ুন কবির আরও বলেন, মেজর মোশাররফ তাকে দলনেতা করে ২৪ জনের একটি দল গঠন করে দেশে আসার নিদের্শ দেন। সেখান থেকে তিনিসহ ২৪ জনকে নিয়ে চৌদ্দগ্রামের আসেন। তাদের দায়িত্ব চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বর্তমান নাঙ্গলকোট উপজেলা রায়কোট, মৌকরা, ঢালুয়া, বক্সগঞ্জ, সাতবাড়িয়া ও দৌলখাঁড় ইউনিয়নের। আমরা এ ২৪ জনের কাজ হলো ‘হিট অ্যান্ড রান’ আঘাত করে পালানো। মরকটা ব্রিজ, হাসানপুর, ঢালুয়া, সাতবাড়িয়াসহ যেসব এলাকার ব্রিজ ও রাস্তা দিয়ে পাকিস্তানি মেলেটারি যাওয়ায় কথা শুনলে আগ থেকে উৎপেতে থাকতাম। পরে তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে পালাতাম। এভাবে যুদ্ধ করি। 

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ চলাকালীন একবারের জন্যও বাড়িতে আসিনি। সব সময় মায়ের কথা ও পরিবারের কথা মনে পড়তো। আর নীরবে চোখের পানি পড়তো। দেশের কথা ভেবে সব কিছু ভুলে যাই। দেশ আগে, পরে পরিবার। এভাবে যুদ্ধ করতে থাকি। খবর আসলো দেশ স্বাধীন হলো, আমরা সবাই হাসানপুর রেল স্টেশনে গিয়ে সমবেত হই। পরে সেখান থেকে কয়েকটি রাজাকারের বাড়িতে গিয়ে তাদের খোঁজ করি। কিন্তু সব রাজাকার পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। পরে সেখান থেকে যার যেমন বাড়িতে চলে যাই। 

মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন বলেন, আমিও বাড়িতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করি। মনে অনেক শান্তি আসে। অনেক দিন মা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা। এদিকে স্বাধীন দেশ, অন্যদিকে পরিবারে সঙ্গে সাক্ষাৎ। কি যে আনন্দ। আজকের এ স্বাধীন দেশের লাল সবুজের পতাকা এমনি আসেনি। এখনো রাতে ঘুমাতে পারি না। যুদ্ধের কথা মনে হলে চোখ দিয়ে অজস্র পানি পড়ে। 

বর্তমানে হুমায়ুন কবির ৭১ বয়সে পড়েছেন। বয়সের বারে তেমন কথা ও চলাফেরা করতে পারেন না। তিন ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার। বড় ছেলে মেহেদী হাসান ব্যবসায়ী। মেঝো ছেলে প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন ও ছোট ছেলে অ্যাডভোকেট। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে, আরেক মেয়ে পড়াশোনা করেন। 

ভিডিওতে শুনুন হুমায়ুন কবির মজুমদারের যুদ্ধকালীন স্মৃতি

পিডিএসও/হেলাল