বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২০, ১০:৩১ | আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২০, ১১:৩৯

মাহবুবুল আলম

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে একদল জুনিয়র অফিসারই জড়িত ছিল তা ভাবাটা বোকামি ছাড়া কিছু নয়। কেননা, ইতিহাসের এ নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডে দেশি এবং আন্তর্জাতিক মহলও যে জড়িত ছিল, তা বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারিক আদালতে প্রদত্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণে উঠে এসেছে। ইতিহাসের এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে তখনকার উপ-সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে পুরোপুরি জড়িত ছিলেন। খন্দকার মোশতাক আহমেদকে শিখণ্ডী বানিয়ে পর্দার অন্তরাল থেকে জিয়াউর রহমানই এ ষড়যন্ত্রে সব কলকাঠি নেড়েছেন, তা এখন সর্বসত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পুরো বিষয়টা ছিল পূর্বপরিকল্পিত ‘একটি নীলনকশার’ অংশ, যেখানে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন অবস্থানে থেকে যার যার ভূমিকা পালন করেছেন মাত্র। তবে আজকের এই লেখায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়ার ভূমিকা নিয়েই লেখাটি সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। জিয়াউর রহমান যে বঙ্গবন্ধু হত্যা চক্রান্তের বিষয়ে জ্ঞাত ছিলেন, তা সম্ভবত প্রথম প্রচারিত হয় ১৯৭৬ সালে ব্রিটিশ আইটিভি চ্যানেলের World in Action প্রোগ্রামে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে দেওয়া লে. কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান এবং লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে। এই সাক্ষাৎকারে ফারুক-রশীদ দাবি করেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা চক্রান্তের বিষয়ে ১৫ আগস্টের অনেক আগেই জিয়াকে তারা অবহিত করেন। ফারুক জানান, ২০ মার্চ ১৯৭৫ সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটের দিকে তিনি জিয়ার বাসায় গিয়ে তার সাথে দেখা করেন এবং তাকে বলেন The country required a change.

উত্তরে জিয়া বলেন, Yes, yes, lets go outside and talk. তখন জিয়া ফারুককে নিয়ে বাইরে বাড়ির লনে যান। সেখানে ফারুক আবার বলেন We have to have a change. We, the junior officers, have already worked it out. We want your support and leadership|’ এ ব্যাপারে জিয়াউর রহমানের কথা ছিল খুবই স্পষ্ট। জিয়া বলেন If you want to do something, you junior officers should do it yourself… (Anthony Mascarenhas, Bangladesh–A Legacy of Blood, page 54, Hodder and Stroughton, London, 1986)

অনেকেই হয়তো বলতে পারেন বা প্রশ্ন করতে পারেন—ফারুক-রশীদ বলল বলেই কি তা সত্য হয়ে গেল? এমনটাও তো হতে পারে যে, তারা তাদের দোষ ঢাকার জন্য অন্যের ঘারে দোষ চাপাতে চেয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছেশুধু জিয়া ছাড়া অন্য কোনো সিনিয়র অফিসারের কথা এখানে আসেনি কেন? বিষয়টি তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭৬ সালে দেওয়া জিয়ার মাসকারেনহাসকেই দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে। মাসকারেনহাসের ভাষায় In July, 1976, while doing a TV programme in London on the killing of Sheikh Mujib I confronted Zia with what Farook had said (তাদের সাক্ষাৎকারে)। জিয়া এ ব্যাপারে উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। ফারুকের সঙ্গে তার এমন কথোপকথনের বিষয়টি এসেছে Zia did not deny it– nor did he confirm it (Anthony Mascarenhas, Bangladesh– A Legacy of Blood, page 54, Hodder and Stroughton, London, 1986) ।

সাক্ষাৎকারে জেনারেল জিয়ার গড়িমসি বা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ভাব দেখে ধারণা করা যেতে পারে, ফারুকের সঙ্গে জিয়ার এ কথোপকথন সত্য। এর সত্যতার আরো প্রমাণ মেলে ১৯৯৭ সালে, যখন ফারুক জেলে আর রশীদ ইউরোপে। ১৯৯৭ সালে রশীদের সঙ্গে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজের সাক্ষাৎ হয় ইউরোপে। লিফশুলজের ভাষায়,1997 I met Rashid for several hours in an European city… I went over with him exactly what he had told Mascarenhas about Zias involvement. Rashid confirmed to me the accuracy of his interviwe with Mascarenhas|

জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় কর্নেল শাফায়েত জামিলের ভাষ্য থেকে—‘জেনারেল জিয়া একদিকে শেভ করছেন, একদিকে শেভ করে নাই। স্লিপিং স্যুটে দৌড়ে আসলেন। শাফায়াতকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘শাফায়াত কী হয়েছে?’ শাফায়াত বললেন, ‘অ্যাপারেন্টলি দুই ব্যাটালিয়ন স্টেজড্ এ ক্যু। বাইরে কী হয়েছে এখনো আমরা কিছু জানি না। রেডিওতে অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতেছি প্রেসিডেন্ট মারা গেছেন।’ তখন জেনারেল জিয়া বললেন, সো হোয়াট? লেট ভাইস প্রেসিডেন্ট টেকটক ওভার। উই হ্যাভ নাথিং টু ডু উইথ পলিটিকস।’

১৫ আগস্টের নির্মম ঘটনার পর ঘাতক চক্রের সঙ্গে বিএনপির সব সময়ের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ঘাতকদের সঙ্গে দেনদরবার চালিয়ে গেছেন সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করতে। এজন্য সাইফুর রহমানের গুলশানের বাসায় তার ভায়রা বঙ্গবন্ধুর ঘাতক কর্নেল রশীদের সঙ্গে মেজর জিয়াসহ বৈঠক করেন।

ঘাতক কর্নেল রশীদের স্ত্রী জোবাইদা রশীদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ‘১৫ আগস্ট বিকালে বঙ্গভবনে জেনারেল জিয়াউর রহমান রশীদের কাছে ঘোরাঘুরি করছিল, যাতে তাকে চিফ অব আর্মি করা হয়। ১৬ অথবা ১৭ তারিখ সাইফুর রহমানের গুলশানের বাসায় সাইফুর রহমান, আমার স্বামী ও জিয়ার উপস্থিতিতে জিয়াকে চিফ অব আর্মি স্টাফ করার বিষয় ঠিক হয়।’

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঘাতক ফারুকের জবানবন্দির অংশবিশেষ এখানে তোলে ধরা হলো‘১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট রাতে মিলিটারি ফার্মে নাইট ট্রেনিংয়ের সময় কো-অর্ডিনেশন মিটিং করে ১৫ আগস্ট ভোরে চূড়ান্ত অ্যাকশনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৫ আগস্ট ঘটনার পর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে চিফ অব আর্মি স্টাফ করার বিষয়ে সাইফুর রহমানের বাড়িতে মিটিং হয়। জিয়া, রশিদ ও সাইফুর রহমান মিটিং করেন। পরে জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হবে, সাইফুর রহমান ও রশীদ মন্ত্রী হবে, ওই উদ্দেশ্যে জিয়াউর রহমানকে চিফ অব আর্মি স্টাফ করা হয়।’

জিয়াউর রহমান যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায় জিয়ার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত জেনারেল জিয়া বাংলাদেশে তার সামরিক শাসন বহাল রেখেছিলেন। এ সময় তিনি বন্দুকের নলের মুখে নিজের ক্ষমতা সংহত করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে বিচারপতি সায়েম যখন নির্বাচন দিতে চেয়েছিলেন তখন জিয়াউর রহমান তাকে বাধা দিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বিচারপতি সায়েম ঘোষণা করেছিলেন, ১৯৭৭ সালের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চান। তার সেই ইচ্ছা অনুযায়ী নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য বিচারপতি ছাত্তারকে বিশেষ সহকারী নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু জিয়ার বশংবদ ছাত্তার ও উপদেষ্টাদের বাধার কারণে বিচারপতি সায়েমের সে চেষ্টা ভেস্তে যায়। প্রেসিডেন্ট সায়েম তার এক লেখায় বলেছেন, ‘আশ্চর্য এই যে বিশেষ সহকারী, যিনি শুধু হাইকোর্টে নন সুপ্রিমকোর্টেও বিচারপতি ছিলেন...বিষয়টি ভেবে খারাপ লাগল যে তিনি জানতেন নির্বাচন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য আমি তাকে ঐ পদে নিয়োগ দিয়েছি।’ বিচারপতি সায়েম এও বলেছেন, বিচারপতি ছাত্তার তাকে বলেছিলেন, ‘ভাই তিনি যখন সিএমএলএ হতে চাচ্ছেন তখন তাকে হতে দিন।’ বিচারপতি প্রেসিডেন্ট সায়েম যখন দেখলেন, এ ক্ষেত্রে তিনি একা হয়ে পড়েছেন, তখন তিনি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। একপর্যায়ে এসে তাকে প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হলো। বাধ্য হয়ে জে. জিয়াকে নিজের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর সায়েম পদত্যাগ করেন এবং তা করতে হয়েছিল বন্দুকের জোরেই।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে খুনি মুসতাকের সিভিল মূর্তিকে সামনে নিয়ে এগিয়েছে জিয়াউর রহমান। তার এ উদ্দেশ্যের পেছনে যে কুটচালটি কাজ করেছিল তা হলো দেশের আমজনতাকে বোঝানো যে, আর্মি বা জেনারেল জিয়া তো ক্ষমতা গ্রহণ করেনি, ক্ষমতা দখল করেছে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার সদস্য মুসতাক আহমদ এবং তার মন্ত্রিসভায় যেসব সদস্য যোগ দিয়েছে, তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী না হয়, প্রথম সারির নেতা। সুতরাং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে তার (জিয়ার) সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে নায়ক হিসেবে নিজেকে যতই আড়াল করার চেষ্টাই করে থাকুন না কেন, ইতিহাসের বিচারে সে ষড়যন্ত্রে তার সংশ্লিষ্টতার নানা কাহিনি বেরিয়ে এসেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নীলনকশার আগাগোড়া সবই ছিল জিয়ার নখদর্পণে।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক লরেন্স লিফশুজের একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখাটি শেষ করব‘১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের মূল নেপথ্য নায়ক ছিলেন জিয়া’ জাতীয় শোক দিবস ২০১১ উপলক্ষে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন ‘মূল ছায়া ব্যক্তি’। তিনি আরো বলেন, ‘আমার ধারণা ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের জড়িত থাকার ব্যাপারে ভবিষ্যতে আরো তথ্য বেরিয়ে আসবে।’ তিনি বলেন, ‘জিয়া নিজেই এ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব না দেওয়ার নিজস্ব কারণ ছিল। তবে তার সমর্থন ছাড়া এ অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করি না। এ হত্যাকাণ্ডে তিনি ছিলেন ছায়া ব্যক্তি। তিনি যুক্তি প্রদর্শন করে বলেন, ‘যদি তিনি এ অভ্যুত্থানবিরোধী হতেন, তাহলে তিনি নিজেই এ অভ্যুত্থান থামাতে পারতেন। তা করা ছিল তার সাংবিধানিক দায়িত্ব...। তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান ছিলেন খুবই জটিল চরিত্রের লোক। ওই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জিয়াউর রহমান কীভাবে ছায়ায় থেকে কাজ করেছেন, সে সম্পর্কে আমাদের আরো গভীরে গিয়ে জানা উচিত।’...

লেখক : কবি-কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গবেষক
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল