নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
পারিবারিক দ্বন্দের জের নাকি প্রতিপক্ষের আঘাত, দুধ বিক্রেতার মৃত্যু ঘিরে ধোঁয়াশা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার টিয়ারা বাজারে দুই পক্ষের আধিপত্য বিস্তারের সংঘর্ষে আহত দাবি করা দুগ্ধ ব্যবসায়ী মো. ইকবাল হোসেনের (৫৫) মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। গত ২ জুন মঙ্গলবার সকালে টিয়ারা বাজারে মারধরের শিকার হওয়ার পর, ১০ জুন (বুধবার) দিবাগত রাত ১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। নিহত ইকবাল টিয়ারা মুন্সি বাড়ির মৃত আবুল খায়েরের ছেলে।
তবে এই মৃত্যুকে ঘিরে স্থানীয় দুটি পক্ষ এখন সম্পূর্ণ মুখোমুখি অবস্থানে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের দাবি—প্রতিপক্ষের পরিকল্পিত মারধরের আঘাতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইকবালের মৃত্যু হয়েছে।
অপরদিকে, অভিযুক্ত পক্ষ এবং নিহতের নিজ গোষ্ঠীরই কারো কারো চাঞ্চল্যকর তথ্যে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাদের দাবি—পারিবারিক কলহের জেরে স্বজনদের আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে। এখন এই ঘটনাকে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে এর দায় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিপক্ষের ওপর চাপানোর ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
কারণ এর আগে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে টিয়ারা গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেন এবং আতিকুর রহমান ওরফে শিশু মিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এর জেরে গত ২ জুন মঙ্গলবার সকালে উভয়পক্ষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে টিয়ারা বাজারে সংঘর্ষে জড়ায়।
নিহতের পরিবারের দাবি, ওই দিন সকালে ইকবাল টিয়ারা বাজারে দুধ বিক্রি করতে গেলে শিশু মিয়ার নেতৃত্বাধীন পক্ষ তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। নিহতের ছোট ভাই শিমুল জানান, পূর্বশত্রুতার জেরে এই হামলা চালানো হয়েছে এবং এ ঘটনায় তাঁরা থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে নিহতের পক্ষের ও পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে স্পষ্ট কিছু গরমিল এবং লুকোচুরির আভাস পাওয়া যায়, যা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদক কারবারের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
চিকিৎসায় অবহেলা ও বিলম্ব: পরিবারের দাবি অনুযায়ী যদি ২ জুনের সংঘর্ষে ইকবাল হোসেন গুরুতরভাবে আহত হয়ে থাকেন, তবে তাৎক্ষণিক কেন তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলো না? ঘটনার প্রায় ৩ দিন পর (৫ জুন) কেন তাঁকে প্রথম হাসপাতালে নেয়া হলো—এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নিহতের দলীয় লোকজন বলছেন, ইকবাল ৫ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি হলে সেখান থেকে সরাসরি ঢাকা রেফার করা হয়। অথচ নিহতের মেয়ে মুক্তা আক্তারের জবানবন্দি ভিন্ন। তিনি জানান, ৫ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ইকবালকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এরপর গত বুধবার (১০ জুন) পুনরায় অসুস্থ হলে তাঁকে আবার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে ঢাকায় পাঠানো হলে রাতে তিনি মারা যান।
২ জুনের ঝগড়ায় যদি লোহার রড বা হকি স্টিক দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়ে থাকে, তবে ইকবালের শরীরে কোনো দৃশ্যমান গুরুতর যখম বা জখমের চিহ্ন নেই কেন—তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে, এই রহস্যময় পরিস্থিতিতে নতুন ও নাটকীয় মোড় এনে দিয়েছে নিহতের নিজস্ব গোষ্ঠী 'মুন্সি বাড়ি'রই এক যুবক শরীয়ত উল্লাহর (তাজুল ইসলামের ছেলে) দেওয়া ভিডিও জবানবন্দি। স্বগোত্রীয় লোকজনের বিরুদ্ধে কথা বলে তিনি ঘটনার পেছনে পারিবারিক কলহের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
শরীয়ত উল্লাহ দাবি করেন, "ইকবাল হোসেন আগে থেকেই শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ২ জুনের ঘটনার পর, মূলত ৫ ও ৭ জুন ইকবালের বাড়িতেই তাঁর নিজের ভাই শিমুল ও ভাতিজারা পারিবারিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তি ও জবরদস্তির সময় ঘরের পাশের একটি উঁচু ড্রেনে পড়ে গিয়ে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান ইকবাল। মূলত ওই আঘাতের কারণেই তিনি অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন।"
শরীয়ত উল্লাহ আরও অভিযোগ করেন, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিহতের পক্ষের লোকজন তাঁকে জিম্মি করে মারধর করে এবং মিথ্যা জবানবন্দি আদায়ের চেষ্টা চালায়। পরে '৯৯৯'-এ ফোন দিলে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে।
সার্বিক পরিস্থিতি, দিন-তারিখের হিসাব এবং পারিবারিক জবানবন্দির বৈপরীত্যের কারণে সচেতন মহলে এখন একটাই প্রশ্ন—তবে কি ঘরের ভেতরের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা রহস্যময় মৃত্যুকে আড়াল করতেই এটিকে ২ জুনের বাজারের সংঘর্ষের সাথে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে? কিংবা রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে একটি মৃত্যুকে পুঁজি করে জলঘোলার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, সেই সন্দেহ উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
যাইহোক দুগ্ধ ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর আসল কারণ ২ জুনের বাজারের মারামারি, নাকি ঘরের ভেতরের পারিবারিক কোনো সহিংসতার বলি—তা নিয়ে রহস্যের জাল দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে এই ঘটনায় হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য প্রশাসনের একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত তদন্ত প্রয়োজন।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্তের পরই কেবল বেরিয়ে আসবে এই রহস্যের শেষ চাবিকাঠি। আপাতত সত্যতা উন্মোচনের অপেক্ষায় পুরো নবীনগরবাসী। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে সচেতন মহল।
পিডিএস/এমএইউ









































