মিনহাজুল ইসলাম, চট্টগ্রাম

  ২৬ জানুয়ারি, ২০২১

চসিক নির্বাচন : উত্তাপ ছড়াতে পারেন আ’লীগের বিদ্রোহীরা

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে উত্তাপ ছড়াতে পারেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীরা। প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই দলের বিদ্রোহী ঠেকাতে বা সরে দাঁড়াতে বার বার হাই কমান্ডসহ কেন্দ্রীয়, নগর ও জেলার শীর্ষ নেতাদের একাধিক বৈঠকের পরও এসব বিদ্রোহীদের দমানো যায়নি।

ফলে নগরীর সাধারণ ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশেই এবার দলীয় প্রতিদ্বনদ্বীর শক্ত বিরোধিতার মুখে পড়বে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরাই উত্তাপের শিকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, অন্তত ১২টি এলাকায় বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন।

কাউন্সিলর পদে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে যারা নির্বাচন করছেন, তারা হলেন- ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের তৌফিক আহমেদ চৌধুরী, ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের সাহেদ ইকবাল বাবু, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের জহুরুল আলম জসীম, ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের মোরশেদ আক্তার চৌধুরী, ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ডে সাবের আহমেদ, ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডের এফ কবির মানিক, ২৫ নম্বর রামপুরা ওয়ার্ডের এসএম এরশাদ উল্লাহ, ২৭ নম্বর দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের এইচএম সোহেল, ২৮ নম্বর পাঠানটুলী ওয়ার্ডের আব্দুল কাদের, ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের তারেক সোলায়মান সেলিম, ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গীবাজার ওয়ার্ডের হাসান মুরাদ বিপ্লব ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের মাজাহারুল ইসলাম চৌধুরী।

এসব ওয়ার্ডে অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এই আশঙ্কা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও চট্টগ্রাম মহানগর নেতৃবৃন্দ ও দলীয় সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যেও রয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থীর অধিকাংশই চসিকের নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা ভোটের দিন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারেন। এমন সংবাদে তৎপরতা বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের সিনিয়র এক কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সঙ্গে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীদের সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। তবে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে ভোটার ছাড়া কাউকে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না। ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ কোনোভাবেই অবনতি হতে দেওয়া হবে না। যেসব ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন, সেখানে গোয়েন্দা নজরদারিও বেশি থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও তৎপর থাকবেন। যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত। পুলিশ ইতোমধ্যে মাঠপর্যায় থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছে।

সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর জানান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে কোনো ধরনের সহিংসতা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। নির্বাচনকে ঘিরে নগরীতে চেক পোস্ট তিনগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। চট্টগ্রামের বাইরের কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে অবস্থান করছে কি-না তা নজরদারি করা হচ্ছে। নগরীর ৪টি প্রবেশদ্বারেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। এর সঙ্গে বিশেষায়িত সোয়াত টিম, গোয়েন্দা পুলিশ, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট একই সাথে কাজ করছে।

এদিকে, চসিকের পুন: তফসিল ঘোষণার পরও প্রতি ওয়ার্ডে দলীয় সমর্থিত একজন করে কাউন্সিলরপ্রার্থী মাঠে রাখার জন্য কাজ করে নগর আওয়ামী লীগ। কয়েকবার কেন্দ্র থেকে বিদ্রোহীদের বসাতে দফায় দফায় বৈঠক ও নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ৪ জানুয়ারি বিকেলে নগরীর দারুল ফজল মার্কেটের দলীয় কার্যালয়ে নগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির এ সভা বিদ্রোহীদের বিষয়ে কথা হয়। সেখানে বিদ্রোহীদের ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও কথা হয়। দলটির নির্বাচন সমন্বয়কারীরা বিদ্রোহীদের দল থেকে বহিষ্কারের কথাও বলেছিলেন। তবে কোনোকিছুতেই কাজ হয়নি।

বিদ্রোহীদের বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন জানান, কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে প্রশাসন পেশাদারিত্বের সঙ্গে তা মোকাবিলা করবে বলে বিশ্বাস করি। আওয়ামী লীগ মেয়রসহ কাউন্সিলর পদে যাদের মনোনয়ন দিয়েছে তাদের বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে। এখানে কে কোন অবস্থায় আছে আমরা তা বিবেচনা করব না। যারা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, তাদের দলীয় সদস্যপদ থাকবে না। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানান, তারা উভয় সংকটে রয়েছেন। একদিকে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী, অন্যদিকে নেতার অনুসারীর প্রার্থী ফলে তারা কোনোপক্ষেই নামতে পারছেন না।

জানা গেছে, গত সোমবার রাতে নগরীর ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মো.সালাউদ্দিনের বাসায় হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তারা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। রোববার আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীর গণসংযোগে অংশ নিতে গিয়ে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে আহত হন যুবলীগের কেন্দ্রীয় উপ-প্রচার সম্পাদক আদিত্য নন্দী।

গত ১২ জানুয়ারি রাতে ২৮ নম্বর পাঠানটুলি ওয়ার্ডের মগপুকুর পাড় এলাকায় আ.লীগ ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলিতে আজগর আলী বাবুল (৫৫) নামে একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরো আরেকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।

এছাড়াও নগরীর ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলীতে আওয়ামী সমর্থক বিদ্রোহী ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী মোরশেদের বাড়ির সামনে প্রতিপক্ষের হামলায় আনোয়ার জহির তানভির (৪০) নামে এক আওয়ামী লীগ নেতা নিহত হয়েছেন।

এদিকে, চট্টগ্রাম অঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চসিক নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর আচরণবিধি ভঙ্গ, হামলা ও হুমকিসহ ৬০ টি অভিযোগ জমা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১২টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের পক্ষ থেকে।

আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে তিনটি অভিযোগ। বাকি ৪১টি অভিযোগ নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীদের। তবে অধিকাংশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে এসে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ জানান, চট্টগ্রা সিটি নির্বাচনে দল সমর্থিত প্রার্থীর বাইরে যারা সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হিসেবে থাকবেন এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদ্রোহীদের বিষয়েও দল কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

প্রসঙ্গত, চসিক নির্বাচনে পূর্বে নির্ধারিত ৭৩৫টি ভোট কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণ হবে। চার হাজার ৮৮৬টি কক্ষে ভোটগ্রহণে দায়িত্ব পালন করবেন ৭৩৫ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, চার হাজার ৮৮৬ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও নয় হাজার ৭৭২ পোলিং কর্মকর্তা। 

পিডিএসও/এসএম শামীম

চসিক নির্বাচন,আ’লীগ,বিদ্রোহী
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close