আমানুর রহমান

  ৮ ঘণ্টা আগে

দৃষ্টিপাত

চার দেয়ালে বন্দি গৃহকর্মীর মর্যাদা

ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আমাদের আধুনিক ও কর্মব্যস্ত সংসার সচল হয়, সেই গৃহকর্মীরাই আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত; তাদের জীবনযাপনও চরম অনিরাপদ। আমরা নিজেদের বসতবাড়িকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল বলে মনে করলেও, চার দেয়ালের ভেতরে কাজ করা মানুষগুলোর জন্য তা অনেক সময়ই নীরব কারাগারে পরিণত হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে গৃহকর্মের সঙ্গে যুক্ত। এর প্রায় ৯০ শতাংশই প্রান্তিক নারী ও শিশু। এই বিশাল ও সস্তা শ্রমশক্তির ওপর ভর করে আমাদের শহুরে অর্থনীতি ও কর্মজীবী মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো স্বস্তিতে দিন পার করলেও, বিনিময়ে এই মানুষগুলোর ন্যূনতম জীবননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। আরামদায়ক জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই অন্ধকার ও বৈষম্যমূলক বাস্তবতা অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং আধুনিক সমাজের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

?উঁচু ভবনগুলোর অ্যাপার্টমেন্টের বদ্ধ দরজার আড়ালে গৃহকর্মীদের ওপর প্রায়শই যে নির্মম নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তা যেকোনো সভ্য সমাজকে লজ্জিত করার জন্য যথেষ্ট। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিবছর গড়ে প্রায় অর্ধশতাধিক গৃহকর্মী কেবল শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারান। অন্যদিকে আহত ও লাঞ্ছিত হওয়ার সংখ্যা কয়েক শ ছাড়িয়ে যায়, যার প্রায় পুরোটাই থেকে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে। গৃহকর্মের অপ্রাতিষ্ঠানিক ও বিচ্ছিন্ন প্রকৃতির কারণে এই কর্মীরা সহজেই শোষণের শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী নিয়োগকর্তারা ক্ষমতার দাপটে অপরাধ ধামাচাপাও দিয়ে ফেলেন। কাজে সামান্য ভুল হলে কিংবা পান থেকে চুন খসলে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেওয়া বা অমানবিক মারধরের মতো বর্বরতা যেন এক নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহায়সম্বলহীন এই মানুষদের ওপর এমন পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা কেবল অমানবিকই নয়, মানবাধিকারেরও চরম লঙ্ঘন।

?সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও, গৃহকর্মীদের আইনি সুরক্ষার জায়গাটি এখনো মারাত্মকভাবে দুর্বল ও প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১৫ সালে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’ প্রণয়ন করা হলেও প্রায় এক দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও এটি কেবল একটি নির্দেশিকাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে; বাধ্যতামূলক আইনে পরিণত হতে পারেনি। ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’ অনুযায়ী গৃহকর্মীদের এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আইনি কাঠামোর এই শূন্যতার কারণে তাদের নির্দিষ্ট কোনো কর্মঘণ্টা নেই, সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি নেই, এমনকি বিনা নোটিশে কাজ থেকে ছাঁটাই হলেও আইনি প্রতিকার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কলকারখানা বা অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক খাতের মতো বাসাবাড়িতে শ্রম পরিদর্শকদের প্রবেশের আইনি এখতিয়ার না থাকায়, চার দেয়ালের ভেতর কী ঘটছে, তা দেখার কেউ থাকে না। আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়া কেবল একটি কাগুজে নীতি এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কখনোই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।

?চরম দারিদ্র্য, অভাব ও বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামই মূলত গ্রামগঞ্জের অসংখ্য পরিবারকে বাধ্য করে নিজেদের শিশুসন্তানদের গৃহকর্মের মতো ঝুঁঁকিপূর্ণ পেশায় ঠেলে দিতে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউনিসেফের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট গৃহকর্মীর একটি বিশাল অংশ- প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই শিশু। এদের বয়স ১৪ বছরেরও কম। যে বয়সে এই শিশুদের স্কুলে যাওয়ার বা মাঠে খেলার কথা, সে বয়সে তারা চার দেয়ালের বন্দিজীবনে অমানবিক খাটুনির শিকার হচ্ছে, যা দেশের প্রচলিত শিশুশ্রম আইনের সরাসরি পরিপন্থী। শৈশবেই পরিবার ও প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই শিশুরা তীব্র মানসিক একাকিত্বে ভোগে এবং পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে তাদের শারীরিক বিকাশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এই অসহায় শিশুদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কেবল আমাদের নৈতিক দায়িত্বই নয়, উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান শর্তও বটে।

গৃহকর্মীদের এই অমানবিক ও অনিরাপদ জীবনের অবসান ঘটাতে হলে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ও কঠোর আইনি সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। গৃহকর্মীদের আনুষ্ঠানিক শ্রম খাতের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ এবং নিয়মিত তদারকির জন্য আলাদা মনিটরিং সেল গঠন করা হলে নির্যাতনের মাত্রা বহুগুণে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্বের যেসব দেশ আইএলও কনভেনশন-১৮৯ অনুসমর্থন করেছে, সেখানে গৃহকর্মীদের আইনি অধিকার অনেক বেশি সুরক্ষিত। তাই বাংলাদেশেরও অবিলম্বে এই কনভেনশন অনুসমর্থন করে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা উচিত। নিয়োগকর্তাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, গৃহকর্মীরা কোনো ‘কাজের বুয়া’ বা ‘দাস’ নন; বরং তারা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবাপ্রদানকারী। যে হাতগুলো প্রতিদিন পরম যত্নে আমাদের ঘরকে বাসযোগ্য করে তোলে, সেই হাতগুলো নিরাপদ থাকলেই কেবল আমরা নিজেদের সত্যিকারের সভ্য ও মানবিক সমাজ হিসেবে দাবি করতে পারব।

লেখক : শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ

শান্তিনগর, ঢাকা

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়