ড. হারুনুর রশীদ, ড. মোহাম্মদ মতিউর রহমান, ড. মুহাম্মদ মাহফুজুল হক ড. মো. জসিম উদ্দিন ও ড. জোয়ার্দ্দার ফারুক আহমেদ

  ২৮ আগস্ট, ২০২৫

বিশ্লেষণ

অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে জীববৈচিত্র্য সংকট ও পুনরুদ্ধারের উপায়

গতকালের পর

আইনি সংস্কার ও সমন্বয় : বাংলাদেশের জলজ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে আইনি কাঠামোর দুর্বলতা আজ একটি অদৃশ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় (যেমন: মৎস্য, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, নৌপরিবহন প্রভৃতি)-এর মধ্যে সমন্বয়হীনতা একটি প্রধান অন্তরায়। আইন অনুযায়ী মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব এক মন্ত্রণালয়ের, আবার মাছের বাসস্থান (জলমহাল)-এর দায়িত্বে আরেক মন্ত্রণালয়। সুন্দরবনের মতো মাছের প্রাকৃতিক প্রজনক্ষেত্র ও নার্সারি গ্রাউন্ডের ব্যবস্থাপনা এককভাবে বন বিভাগের হাতে ন্যস্ত, অথচ এর ৪০ শতাংশই মৎস্য সম্পদ সমৃদ্ধ জলাভূমি।

সমাধানের উপায় : প্রথমত, আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য আইনে মৎস্য সম্পদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো প্রাকৃতিক জলাশয়ের ব্যবস্থাপনায় মৎস্য অধিদপ্তরকে সম্পৃক্ত করার ব্যবস্থা করা। নদী রক্ষা কমিশনকে ক্ষমতা দিয়ে জরিমানা আরোপ ও দূষণকারীর লাইসেন্স বাতিলের অধিকার দেওয়া। প্রতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের জন্য ‘জাতীয় জলজ সম্পদ কর্তৃপক্ষ’ বা অনুরূপ কোনো সমন্বয় কর্তৃপক্ষ গঠন করা এবং মৎস্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, নদী রক্ষা কমিশন ও স্থানীয় সরকারকে এর অন্তর্ভুক্ত করা। এ ছাড়া ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে ‘জলজ ড্যাশবোর্ড’ প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেখানে ই-লিজিং সিস্টেম ও জিপিএস প্রযুক্তির ব্যবহারে বাধ্যবাদকতা তৈরি করা যাতে জলাশয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আসে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশন (যেমন: রামসার কনভেনশন) মানার বিষয়টি আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

কিশোরগঞ্জের ইতনা-মিঠামইনসহ হাওরাঞ্চলে অপরিকল্পিত রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণের ফলে মাছের জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব : কিশোরগঞ্জের ইতনা-মিঠামইন হাওরে অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণের ফলে সৃষ্ট জলজ বিপর্যয় শুধুমাত্র একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলব্যাপী হাওর এলাকার একটি ক্রমবর্ধমান সংকটের প্রতিচ্ছবি। এই হাওরটি কিশোরগঞ্জ ছাড়াও সংলগ্ন নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিস্তৃত জলাভূমি নেটওয়ার্কের অংশ, যেখানে অনুরূপ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর কারণে মাছের জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। ইতনা-মিঠামইনের মতোই নেত্রকোনার মদন, খালিয়াজুড়ি কিংবা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও ধর্মপাশায় নির্মিত অসংখ্য রাস্তা ও বাঁধ হাওরগুলোকে খণ্ডিত করে ফেলেছে। এসব নির্মাণে প্রায়শই কালভার্টের সংখ্যা অপর্যাপ্ত রাখা হয় (প্রতি কিলোমিটারে ২-৩টির বেশি নয়), আকার অত্যন্ত সীমিত এবং উচ্চতা পানির স্বাভাবিক প্রবাহের স্তরের নিচে নির্ধারণ করে নির্মাণ করায় বর্ষা মৌসুমে মাছের অত্যাবশ্যকীয় মাইগ্রেশন পথ ব্যাহত হচ্ছে; ফলে মাছ তার কাঙ্ক্ষিত প্রজননক্ষেত্রে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে অনেক মাছই প্রজনন করতে বা ডিম ছাড়তে ব্যর্থ হচ্ছে।

এই বিচ্ছিন্নতার প্রভাব শুধু মাছের মাইগ্রেশনেই সীমিত নয়, বরং সমগ্র জলজ বাস্তুতন্ত্রের শৃঙ্খলাকে ধ্বংস করছে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় কোথাও কোথাও দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, জলজ উদ্ভিদের আচ্ছাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং পানি দূষণের মাত্রা বেড়ে গিয়েছে। এসব অঞ্চলে মাছের ‘মৌসুমি চলাচল’-এর মতো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া (যেখানে মাছ বর্ষায় উজানের প্লাবনভূমিতে ডিম ছাড়ে ও শীতকালে গভীর জলাশয়ের বিলে ফিরে আসে) সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে শুধু মাছের সংখ্যাই কমছে না, জিনগত বৈচিত্র্যও হ্রাস পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রজাতির টিকে থাকার জন্য হুমকিস্বরূপ।

সমাধানের উপায় : সবার আগে দরকার বিদ্যমান অবকাঠামোগত ত্রুটিগুলো যতদুর সম্ভব ঠিক করা। ছোট কালভার্টগুলোকে সম্ভব হলে প্রশস্ত করা, কালভার্টের সংখ্যা বাড়ানো, এবং সম্ভব হলে প্রশস্ত স্প্যানবিশিষ্ট আর্চ ব্রিজ নির্মাণ করা যাতে পানির প্রবাহ ও মাছের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত হয়। এ ছাড়া ফিশ পাস ও মাছের চলাচলের জন্য বাইপাস চ্যানেলের মাধ্যমে মাইগ্রেশন রুট পুনরুদ্ধার করতে হবে। এ ছাড়া, সমগ্র হাওর অঞ্চলের ‘মৃত খাল’গুলো চিহ্নিত করে সেগুলো পুনঃখনন করা জরুরি, যাতে করে পানির সংযোগ ও প্রাকৃতিক করিডোরগুলো সক্রিয় হয়। রাস্তা নির্মাণের কারণে বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে, রাস্তার উভয় পাশে নির্দিষ্ট বাফার জোন ঘোষণা করা এবং অপেক্ষাকৃত গভীর পুলগুলোকে ‘বায়োলজিক্যাল স্যাংচুয়ারি’ হিসেবে সংরক্ষণ করা উচিত। পাশাপাশি আর কোনো অপরিকল্পিত অবকাঠামো যাতে হাওরকে বিভক্ত করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকা।

উপসংহার : বাংলাদেশের জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষার সংগ্রামে সমন্বিত পদক্ষেপই একমাত্র পথ। অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে প্রকৌশলগত সমাধান (ফিশ পাস, জলাশয় পুনঃখনন), কঠোর আইনি প্রয়োগ (ধ্বংসাত্মক মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধকরণ, ইজারা ব্যবস্থার সংস্কার) এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ (অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা, কমিউনিটি নজরদারি) একত্রিত হলেই পরে ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অভিযোজন কৌশল অপরিহার্য। ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণের ফলে হাওরাঞ্চলের যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে যথাযথ ও কার্যকর অবকাঠামো সংষ্কার (যেমন : ফিশ পাস স্থাপন, আরো কালভার্ট নির্মাণ, ইত্যাদি) করা জরুরি। সর্বোপরি ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ এই প্রবাদকে টিকিয়ে রাখতে হলে রাষ্ট্র, গবেষক, নাগরিক ও মৎস্যজীবীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি নদী তার প্রাণপ্রবাহ ফিরে পাবে, আর প্রতিটি জলাভূমি হবে জীববৈচিত্র্যের প্রাণবন্ত অভয়ারণ্য।

লেখক : অধ্যাপক, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়