সোহেল মাজহার

  ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক রচনা । ২

উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু

রশীদ করীমের আমার যত গ্লানি (১৯৭৩) : পঞ্চাশের দশক ও ষাটের দশক বাঙালির মহত্তম গণজাগরণের সময়। একমাত্র নির্বোধ ও স্বার্থবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ছাড়া কোনো বাঙালির পক্ষে এই সময়খণ্ডে নির্লিপ্ত থাকা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট, ছয় দফা, এগারো দফা গণ-অভ্যুত্থান ও অসহযোগ আন্দোলন অধিকার সচেতন ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন যেকোনো বাঙালিকে স্পর্শ করেছে। ব্যতিক্রম ছিল না তা কিন্তু নয়। এত কিছু সত্ত্বেও পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো বাঙালিদের ভেতর একশ্রেণির নির্লিপ্ত, আত্মপ্রেমমত্ত ও নিরাপদ দূরত্বে অবস্থানকারী আত্মমোহকাতর ব্যক্তির জন্ম নিয়েছে। ব্যক্তি মানুষ চাইলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, এগারো দফা, গণ-অভ্যুত্থান অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করতে পারে। কিন্তু তার সর্বগ্রাসী প্রভাব-অভিঘাত ঘটনার তাৎক্ষণিকতা থেকে কোনো ব্যক্তি মানুষ মুক্তি পায়নি। বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকার ভেতর এক ধরনের গ্লানি ও হীনম্মন্যতার জন্ম নেয়, প্রতিনিয়ত তাড়া করে, অব্যক্ত যন্ত্রণায় কাতর করে। রশীদ করীমের উপন্যাসে আমার যত গ্লানিতে এমন একজন ব্যক্তির আত্মবিবৃতি, তার কর্মক্ষেত্র, সামাজিক পরিম-ল, পারস্পরিক সম্পর্ক সূত্র ও জাতীয় ঘটনাপ্রবাহে তার নিস্পৃহ থাকা ও গোপন প্রত্যাশার করুণদশা ফুটে উঠেছে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এরফান মিয়া একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। লেখক তাকে সাধারণ গড় মনোবৃত্তি দিয়ে নির্মাণ করেননি। উচ্চশিক্ষা, মার্জিত রুচি, ব্যক্তিত্ববোধ ও সংবেদনশীল মানসিক গড়ন তাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। অসুখী ও সন্দেহপ্রবণ এরফান মিয়া পারিবারিক জীবনেও নিঃসঙ্গ। তার এই নিঃসঙ্গ অবস্থা তাকে তার বালক বেলার স্মৃতির কাছে পরাভূত করে। অন্যভাবে বলা যায়, বালক বেলার স্মৃতির হীরক দ্যুতি তার নিঃসঙ্গ অবস্থায় অপরিমেয় সঙ্গ দিয়ে তাকে অধিকতর সংবেদনশীল করে তোলে।

দেশ-সমাজ রাষ্ট্র রাজনীতিকে সযতনে এড়িয়ে যেতে চাইলেও এরফান মিয়ার পক্ষে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কার্যত ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ এত ব্যাপ্তি নিয়ে বিস্তৃত হয় যে, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে তা ভিন্ন ভিন্নভাবে সংক্রামিত করে। উপন্যাসের আক্কাস কিংবা আবেদ সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলনকে প্রত্যক্ষ রি-অ্যাক্ট করে আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠে। এমন দেখা যায়, গরিব মায়ের একমাত্র সন্তান শুধু শেখ মুজিবকে একবার দেখবে বলে দুদিনের পথ হেঁটে ঢাকায় চলে আসে। লেখক বলেন- ‘আজকের কাগজে একটি খবর আছে।

একটি দশ-বারো বছরের ছেলে। গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছে। গরিব মা-বাপের ছেলে। কিছু না বলেই চলে এসেছে। বললে, অচেনা শহরে বাপ-মা আসতে দিত না। না, বাক্স ভাঙেনি সে; একটি পয়সাও নেই তার পকেটে। হেঁটে এসেছে, সারা পথ। দুদিন কিছু খায়নি।

তার একমাত্র সাধ, বঙ্গবন্ধুকে একবার দেখবে।’ (পৃ. ৭৫, আমার যত গ্লানি, রশীদ করীম, মুক্তধারা, ১৯৮৬, ঢাকা)

এটি থেকে প্রমাণ হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বয়সভেদে সব মানুষের আবেগ স্পর্শ করতে পেরেছিলেন। যেকোনো বালক-কিশোর কিংবা তরুণ সেই সময় বঙ্গবন্ধুর জন্য অসাধ্যসাধন করতে রাজি ছিল। এমনকি তারা তাদের জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। লেখকের নির্লিপ্ত ভাষায় বলা সেই সংবাদ শেষ পর্যন্ত আর নির্লিপ্ত থাকেনি। ভাষা হয়ে ওঠে নির্বিকার শৈল্পিক ভঙ্গি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ বিপুল ব্যাপ্তি নিয়ে সেই সময়ের জীবন, রাজনীতি, ব্যক্তি ও পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক মাত্রাকে প্রভাবিত করে। লেখক সেই বাস্তব সত্য চিহ্নিত করেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, আমার যত গ্লানি ব্যক্তির ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অপরাধ বোধের মর্ম যাতনা ও স্বীকারোক্তি। ব্যক্তি গ্লানি অনুভব করেন। কারণ সে গৌরবের অংশীদার হতে পারেনি। এই সত্য ও দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয় যে, আত্মকেন্দ্রিক মানুষও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহের প্রভাবের বাইরে যেতে পারেনি। একজন উন্নাসিক মানুষ একাত্তরের মার্চকে যেভাবে প্রত্যক্ষ করেন- ‘এত লোক কেন পথে? হাতে লাঠি-সড়কি-দা এসব প্রিমিটিভ অস্ত্রই বা কেন! হঠাৎ হলোটা কী। একটা দারুণ অস্থিরতা উত্তেজনা সকলের চোখে-মুখে। সবাই কিছু একটি ভেঙে ফেলার জন্য কোথাও চলেছে। চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে, তারা যে কি চায়, সে সম্পর্কে আর কোনো সংশয় নেই। তাদের শরীরের প্রতিটি পেশি ইস্পাত হয়ে গেছে। প্রতিটি পদক্ষেপ, কোনো কিছুর ওপর পদাঘাত।

এরা যাচ্ছে কোথায়? হয়েছে কী?

গর্জন করে উঠছে :

শেখ সাহেবের কাছে চলো

এহিয়ার পাছায় লাতথি মারো।’ (পৃ. ১৫৩, আমার যত গ্লানি, রশীদ করীম, ১৯৮৬, মুক্তধারা, ঢাকা)

এরফান মিয়ার মতো নির্লিপ্ত নির্বিরোধী মানুষও অসহযোগ আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি দেখে ভেতরে ভেতরে বিস্মিত হতে থাকেন। সেই বিস্ময়ের মধ্যে কোনো বিরক্তি বা অসন্তুষ্টি নেই। তিনি তা প্রবলভাবে ব্যক্ত না করলেও কিংবা অনুভূতি প্রকাশের সময় নিরপেক্ষ থাকতে চাইলেও তার অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রকাশ ধ্বনির ভেতর অসহযোগের জন্য এক ধরনের পক্ষপাত ঠিক লক্ষ করা যায়। এরফান মিয়ার অভিজ্ঞতা- ‘অফিস-কাছারি বন্ধ। স্কুল-কলেজ শূন্য মন্দির। এমনকি, আমলারা পর্যন্ত তাদের অ্যাসোসিয়েশন মারফত, বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্য জানিয়েছেন। শেখ সাহেবের নির্দেশ প্রকাশিত হচ্ছে প্রতিদিন। আমাদের কর্তব্য তিনি বলে দিয়েছেন।

সেক্রেটারিয়েটে লোক নেই। হাইকোর্টে তালা ঝুলছে। সেক্রেটারিয়েট হাইকোর্ট স্তব্ধ কবরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কিংবা অভিশপ্ত রাজপুরীর মতো, সোনার কাঠির স্পর্শের প্রতীক্ষা করছে।

শেখ সাহেবের মুখের একটি কথায়, ইসলামাবাদের দোর্দ- প্রতাপ প্রতিনিধিরা রাতারাতি কাগজের তৈরি শার্দূলে পরিণত হয়েছে। এমনকি, অমন যে তাদের সাধের ক্যান্টনমেন্ট, তাও এখন তাসের দেশ এবং সেখানকার পরাক্রান্ত সৈনিকদের রকম-সকম দেখে মনে হয়, তারা এখন খড় দিয়ে তৈরি এক-একটি সিংহ। মাঝে মাঝে পথে-ঘাটে তাদের দেখা যায়- ঠিক যেন খড়ের সিংহই।’ (পৃ. ২৬২, আমার যত গ্লানি, রশীদ করীম, ১৯৮৬, মুক্তধারা, ঢাকা)

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close