মনির হোসেন, বেনাপোল (যশোর)

  ৪ ঘণ্টা আগে

যশোরের শার্শা

এক কিমি সড়কে ‘গৃহবন্দি’ শতাধিক পরিবার

স্বাধীনতার পর কেটে গেছে ৫০ বছরেরও বেশি সময়। দেশের আনাচে-কানাচে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া, দৃশ্যমান হয়েছে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প। তবে এর ঠিক উল্টো চিত্র যশোরের শার্শা উপজেলার কায়বা ইউনিয়নের রুদ্রপুর গ্রামে। এখানকার ‘খালধারপাড়া’ এলাকার মাত্র এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা সংস্কারের অভাবে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন শতাধিক পরিবারের মানুষ। দীর্ঘ এই সময়ে এক কোদাল মাটিও না পড়ায় রাস্তাটি এখন নর্দমায় পরিণত হয়েছে, যার ফলে কার্যত জনবিচ্ছিন্ন ও ‘গৃহবন্দি’ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রুদ্রপুর খাঙ ধারপাড়ার গোলাম হোসেনের বাড়ির সামনে থেকে শুরু করে খালধারপাড়ার মুকুল হাজির বাড়ি পর্যন্ত এই এক কিলোমিটার রাস্তাটিই ওই এলাকার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু বছরের পর বছর কোনো সংস্কার না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই এটি চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ইরি-বোরো মৌসুম চললেও রাস্তাটির বেহাল দশার কারণে কৃষকরা মাঠের ধান কেটে ঘরে তুলতে পারছেন না। মাথায় করে বা বিকল্প উপায়ে ধান আনতে গিয়ে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে তাদের।

স্কুল, মাদরাসা, কলেজের হাতেগোনা কিছু শিক্ষার্থী কাদাপানি ঠেলে স্কুলে গেলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী বর্ষা মৌসুমে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে অকালে ঝরে পড়ছে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী। এই রাস্তায় চলতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় আশপাশের গ্রামের মানুষকে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী, বৃদ্ধ, শিশুরা প্রতিদিন যাতায়াত করে এই কাদাময়, পিচ্ছিল পথে। বর্ষাকালে কারো হাঁটাও দায় হয়ে পড়ে, কোথাও কোথাও হাঁটুসমান কাদা জমে যায়।

রুদ্রপুর মাদিনাতুল ফোরকানিয়া কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী মারিয়া বলেন, ‘আমি প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে মাদরাসায় যাই, পা ফেললেই কাদায় আটকে যায় জুতা। অনেক সময় জামা-কাপড় ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। আমরা অনেক কষ্ট করছি। সরকারের কাছে আবেদন, যেন এই রাস্তা পাকা করে আমাদের কষ্টের শেষ করে।

বিআরডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু জাফর বলেন, ভাঙা ও কাদা রাস্তার কারণে প্রতিদিন ক্লাসে যেতে আমাদের ভীষণ কষ্ট হয়। এতে পড়ালেখায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

রুদ্রপুর বিআরডি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বজলুর রহমান বলেন, বর্ষা এলেই আমাদের দুঃখের শেষ নেই, স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তা পার হয়ে স্কুলে আসতে চায় না। এই রাস্তা দিয়ে গর্ভবতী নারী বা অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে চরম বিপদে পড়তে হয়। ভ্যানে উঠানো যায় না, অ্যাম্বুলেন্স তো ঢুকতেই পারে না। আমাদের যেন কেউ দেখার নেই। সরকার আসে-যায় কিন্তু আমাদের কষ্ট থেকে যায় সেই আগের মতোই।

রুদ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, ছাত্রছাত্রীদের প্রতিদিন কাদা রাস্তা দিয়ে যাতায়াতে অনেক কষ্ট হয়। অনেকে সময়মতো ক্লাসে পৌঁছাতে পারে না।

ভোগান্তির চিত্র শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এলাকার সামাজিক ও চিকিৎসাব্যবস্থাও এই এক রাস্তার কারণে ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে জানান, কোনো মানুষ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত ডাক্তারখানায় বা হাসপাতালে নেওয়ার কোনো উপায় থাকে না। এমনকি যাতায়াত ব্যবস্থার এই করুণ দশার কারণে এই পাড়ার মেয়েদের বিয়ে দিতেও চরম বেগ পেতে হচ্ছে অভিভাবকদের। ভাঙা কাদা রাস্তার অজুহাতে অনেকেই এই গ্রামে আত্মীয়তা করতে চান না।

গ্রামের বড় মসজিদের মুয়াজ্জিন জিয়ারুল ইসলাম, গাংধারপাড়ার নুরুল মিয়া, গোলাম হোসেন এবং ছোট খোকা হাজীসহ ভুক্তভোগী এলাকাবাসী জানান, ভোটের সময় এলে অনেক মেম্বার-চেয়ারম্যান রাস্তা পাকা করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ভোট চলে গেলে আর কেউ খোঁজ নেন না। বহুবার অনুরোধ করার পরও রাস্তাটি সংস্কারে কেউ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। আমরা এখন অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।

ভুক্তভোগী এই শতাধিক পরিবারের কষ্ট লাঘব করতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে অতি দ্রুত রাস্তাটিতে মাটি ভরাটসহ পাকাকরণের জন্য বর্তমান সরকার প্রধান ও স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন অবহেলিত রুদ্রপুর খালধারপাড়ার বাসিন্দারা।

এ ব্যাপারে শার্শা উপজেলা প্রকৌশলী সানাউল হক বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ শার্শার রুদ্রপুরে এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার কাজের টেন্ডার হয়েছে। বরাদ্দ প্রক্রিয়াধীন। বরাদ্দ এলেই রাস্তার নির্মাণ কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়