খাদেমুল ইসলাম, মাদারগঞ্জ (জামালপুর) ও রাকিবুল ইসলাম রাকিব, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)
মাদারগঞ্জে অনুমোদনহীন ফার্মেসির ছড়াছড়ি
গৌরীপুরে ‘সুডোএফিড্রিন’ মেশানো সিরাপ * অবাধে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রিতে দোকানদার ও ফার্মেসিগুলোর মালিকরা লাভবান হলেও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষ * বিক্রয় নিষিদ্ধ এসব সিরাপ বাজার থেকে প্রত্যাহার করার কথা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে উচ্চমূল্যে

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই যত্রতত্র অবৈধভাবে বিক্রি করা হচ্ছে ওষুধ। উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার, গ্রামগঞ্জের মুদি দোকান, স্টেশনারি, কনফেকশনারি ও অনুমোদনহীন ফার্মেসিতে অবাধে মিলছে এ ওষুধ। সেই সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের যৌন উত্তেজক সিরাপ, ক্যাপসুল ও ট্যাবলেট। স্থানীয়রা বলেছেন, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনোরূপ নজরদারি না থাকায় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই মুদিদোকানসহ বিভিন্ন দোকানে এ ওষুধ অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওষুধ প্রশাসনের কার্যকর তদারকির অভাবে উপজেলায় ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়াই গড়ে উঠেছে শতাধিক ফার্মেসি। এসব ফার্মেসিগুলোতে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক, নিষিদ্ধ, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে। আরো জানা যায়, এসব দোকানে যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে। সরেজমিনে আরো দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন বাজারসহ সাধারণ মুদি দোকানে চাওয়া মাত্রই পাওয়া যায় অ্যান্টিবায়োটিকসহ নাপা, ভারগন, মেট্রো, টেট্রাসাইক্লিন, থিজা, সেকলো, সেডিল, ক্লোফেনাক এসআর, টোরাঢল, রোলাক, অ্যান্টাসিড, অলকফ, তুসকা, বি-৫০, ক্লোরন, সাফি, সিনকারা, ক্যালসিয়াম ডিসহ যৌন উত্তেজক জে-হর্মোলিন, নিশাত, আরদে খুরমা, জিংসিং সিরাপসহ জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে ওইসব দোকানগুলোতে।
নাম প্রকাশ না করে একাধিক মুদি দোকান মালিক জানান, আমরা জটিল কোনো রোগের ওষুধ বিক্রি করি না। জ¦র, মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা, কাশি এ ধরনের রোগের ওষুধ বিক্রি করি। এতে বরং মানুষের উপকার হচ্ছে। মুদি দোকানে ওষুধ বিক্রি ও যৌন উত্তেজক ওষুদ বিক্রির কোনো প্রকার অনুমতি আছে কি না, জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তারা।
জামালপুর জেলা ড্রাগ সুপার রহমতুল্লাহ প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়া ওষুধ বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। লাইসেন্সকৃত দোকানেও প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি করা যাবে না। তাছাড়া মুদি দোকানসহ অন্যান্য দোকানে ওষুধ বিক্রির কোনো নিয়ম নেই। বৈধ ফার্মেসি ছাড়া অন্য কোনো দোকানে ওষুধ বিক্রি বিষয়ে সুনিদির্ষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর প্রতিনিধি জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গৌরীপুরের বিভিন্ন ওষুধের দোকানে বিক্রি হচ্ছে সুডোএফিড্রিন মেশানো ‘অফকফ’, ‘তুসকা’ ও ‘ডেক্সপোটেন’ কাশের সিরাপ। নিবন্ধন বাতিলকৃত এসব সিরাপ বিক্রি হচ্ছে উচ্চমূল্যে। ফেনসিডিলের তুলনায় দাম কম ও সহজলভ্য হওয়ায় নেশার বিকল্প হিসাবে মাদকাসক্তরা বেছে নিয়েছে এসব নিষিদ্ধ কাশের সিরাপ।
উপজেলা ড্রাগ অ্যান্ড কেমিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কানাই লাল বলেন, নিবন্ধন বাতিলকৃত এই কাশের সিরাপগুলো কোম্পানি এখন আর সরবরাহ করে না। তবে যাদের কাছে আগের স্টক ছিল তারা হয়তো বিক্রি করতে পারে। এ ছাড়াও চাহিদা থাকায় কিছু অসাধুচক্র নাম ও মোড়ক নকল করে ওষুধগুলো গোপনে বাজারে সরবরাহ করছে।
জানা গেছে, ঔষধ প্রশাসন ২০১৭ সালের মার্চে ‘সুডোএফিড্রিন’ দিয়ে তৈরি সব ওষুধের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে এবং এ জাতীয় ওষুধ উৎপাদক সবগুলো প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে। এই তালিকায় ‘তুসকা’, ‘অফকফ’ ও ‘ডেক্সপোটেন’ সিরাপের নাম আছে।
গৌরীপুর উপজেলার উত্তরবাজার, মধ্যবাজার, কালীপুর, ধানমহাল, শ্যামগঞ্জ, শাহগঞ্জ, গাজীপুর, কলতাপাড়া, রামগোপালপুর, পাছার বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন ওষুধের দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ‘সুডোএফিড্রিন’ মেশান কাশের সিরাপ নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ দামে বিক্রয় হচ্ছে। ‘ডেক্সপোর্টেন’ সিরাপের মোড়কে বাজারমূল্য ১০০ টাকা লেখা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। একইভাবে ১০০ টাকার ‘অফকফ’ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা থেকে ১৩০ টাকায় আর ৬৫ টাকার ‘তুসকা’ বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকায়। তবে নিষিদ্ধ ওই কাশের সিরাপ ছাড়াও হিসটাসিন, ডেক্সোফেন, ওকফ, ড্রাইডিল, ফেনারগান, প্যানাডিলসহ বিভিন্ন কোম্পানির কাশের সিরাপ মাদক হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে মাদকসেবীরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালের মেডিকেল অফিসার আব্বাস আলী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের নির্দেশনার পর আমরা ‘অফকফ্’ ও ‘তুসকা’ সিরাপ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছি। স্থানীয় ফার্মেসিগুলোতে আগে থেকে হয়তো কিছু সিরাপ ছিল, সেগুলো হয়তো বিক্রি হচ্ছে। বাজার থেকে ওষুধ প্রত্যাহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত জানা নেই। অন্যদিকে এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালের মেডিকেল সেলস অফিসার দেলোয়ার হোসোইন বলেন, কোম্পানি ডেক্সপোর্টেন সিরাপ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। তবে ডেক্সপোর্টেন প্লাস নামে কাশের সিরাপ বাজারে চালু রয়েছে। এটা সরকার অনুমোদিত।
জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম বলেন, নিষেধাজ্ঞার পর ‘অফকফ’, ‘তুসকা’ ও ‘ডেক্সপোটেন’ কাশের সিরাপ বাজারে রয়েছে কি নাÑ আমার জানা নেই। আর বাজার থেকে ওষুধ প্রত্যাহারের দয়িত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের।
"





































