কানের যত্ন-আত্তি
নানা কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে পারে। তখন সার্বিক যোগাযোগ ক্ষমতায় ব্যত্যয় ঘটে। তাই কানের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কানের যত্ন-আত্তি নিয়ে লিখেছেন ডা. মো. ফখরুল আলম

বিশ্বে আনুমানিক সাড়ে ৪৬ কোটি মানুষ শ্রবণ হ্রাসজনিত সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৬৩০ মিলিয়ন। বধিরতা ও শ্রবণ সমস্যা একটি সামাজিক ব্যাধি। প্রতি চারজনে একজনই শ্রবণ সমস্যায় ভুগবে। আর প্রায় ৭০ কোটি মানুষের শ্রবণযন্ত্র লাগবে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে শ্রবণ সমস্যায় ভুগছে।
কারণ
* জন্মগত ত্রুটির জন্য শ্রবণত্রুটি দেখা দিতে পারে।
* বংশ ও জিনগত কারণ।
* প্রসবকালীন জটিলতা। যেমন- কম ওজন, প্রিম্যাচিউরিটি, বার্থ এসফ্যাক্সিয়া, নিউনেটাল জন্ডিসের কারণেও বধিরতা হতে পারে।
* বধিরতার জন্য দায়ী মায়ের গর্ভকালীন কিছু সংক্রমণ। যেমন- সাইটোমেগালো ভাইরাস, রুবেলা, মাম্পস ইত্যাদি।
* শিশুর মেনিনজাইটিস বা ব্রেনে কনফেশন এবং ভাইরাসজনিত রোগ, যেমন মাম্পস, মিসেলস।
* উচ্চশব্দ। হেডসেট বা হেডফোনের বেশি ভলিউম, উচ্চশব্দের মিউজিক ও কনসার্ট, আতশবাজির শব্দ, রাস্তার গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজ ও কলকারখানার শব্দ এবং বজ্রপাতের শব্দ কানের জন্য ক্ষতিকর।
* কানের ক্ষতিকর ওষুধের ব্যবহার।
* কানে আঘাত ও দুর্ঘটনা।
* দীর্ঘদিনের কানের প্রদাহ বা ইনফেকশন।
* শিশু ও কিশোরদের দীর্ঘদিনের টনসিলে ইনফেশন ও এডিনয়েডের জন্য মধ্যকর্ণে পানি জমা হয়ে শ্রবণত্রুটি হতে পারে।
* দীর্ঘদিন কানে ময়লা জমা হয়ে শ্রবণ হ্রাস হতে পারে।
* বয়সজনিত কারণেও শ্রবণক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।
* ধূমপান, রক্তে চর্বি জমা, পুষ্টিহীনতা ও হঠাৎ খারাপ ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে শ্রবণ সমস্যা হতে পারে।
প্রতিরোধ
* বংশ ও জিনগত বধিরতা দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। জেনেটিক রোগ সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। বিশেষ করে কনসেনগুয়াল ম্যারেজ তথা রক্ত সম্পর্কিত বিবাহ (কাজিন-কাজিন) পরিহার করা।
* জন্মগত ত্রুটি দূর করতে নিরাপদ গর্ভধারণ ও প্রসব নিশ্চিত করা।
* জন্ম-পরবর্তী নবজাতকের সঠিক যত্ন ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
* জন্মের পরপরই কানের শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করা এবং সেটি স্বাভাবিক স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা। এ ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসা
শোনা ও কথা বলার সঙ্গে একটা সেতুবন্ধ আছে। মানবশিশু আগে শোনে এবং সে অনুযায়ী কথা বলতে শিখে। অর্থাৎ জন্মবধিরতা বাকশক্তি বিকাশের অন্তরায়। শিশু যদি আশপাশে বড় আওয়াজ বা শব্দে চমকে ওঠে, যদি ছয় মাস বয়সে শব্দের উৎসর দিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে চেষ্টা না করে, যদি এক বছর বয়সেও কোনো অর্থপূর্ণ শব্দ না বলে, যদি দুই বছর বয়সের মধ্যে দুটি শব্দের বাক্য না বলে তাহলে দেরি না করে নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ও হেড- নেক সার্জনের কাছে যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট ও অডিওলজিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করে ককলিয়ার ইমপ্লান্ট (অন্তঃকর্ণ প্রতিস্থাপন) নামক একটি অপারেশনের মাধ্যমে শিশুর শোনা ও কথা বলার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এটি একটি ব্যয়বহুল অপারেশন। তবে বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ফ্রি ইমপ্লান্ট বরাদ্দ দেওয়ার মাধ্যমে এটি সহজলভ্য হয়েছে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি হাসপাতাল), সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), জাতীয় নাক কান-গলা ইনস্টিটিউট (মহাখালী), ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে এ অপারেশন করা হয়।
* সুস্থ স্বাভাবিক শ্রবণ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু পেতে মা ও শিশুর টিকা নিশ্চিত করতে হবে।
* শিশু বয়সে কোনো ভাইরাসজনিত রোগ বিশেষ করে জ্বর হলে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা নেওয়া এবং কানে শোনার সমস্যা আছে কি না খেয়াল রাখা।
* বাচ্চাদের টনসিলে ইনফেশন ও এডিনয়েডের (নাকের পেছনের টনসিল) সঠিক চিকিৎসা নেওয়া এবং প্রয়োজনে সার্জারি করানো।
* কান থেকে পানি, পুঁজ, রক্ত পড়লে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং সঠিক চিকিৎসা নেওয়া।
* দীর্ঘদিন ধরে কানের প্রদাহ বা পর্দায় ছিদ্র থাকলে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া, প্রয়োজনে অপারেশনের মাধ্যমে জোড়া লাগানো।
* বয়স্কজনিত কারণে বা অন্য যেকোনো কারণে শোনার সমস্যা হলে কানের শ্রবণ পরীক্ষা-পরবর্তী রোগ নির্ণয় করে অনেক ক্ষেত্রে শ্রবণযন্ত্রের সাহায্যে কানে শোনার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা যায়।
* শব্দদূষণ পরিহার। আমাদের দেশে শব্দদূষণ ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশে শব্দদূষণ প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপে দেখা যায়, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মাত্রা ১৩০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে গেছে। যা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি এবং কানের স্থায়ী বধিরতার জন্য যথেষ্ট। সুতরাং শব্দদূষণ প্রতিরোধ আইনের যথেষ্ট প্রয়োগ ও সচেতনতা জরুরি। যত্রতত্র অপ্রয়োজনীয় হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার না করা, নির্মাণকাজে শব্দদূষণের হার নিয়ন্ত্রণ, কলকারখানা ও জেনারেটরের শব্দ নিয়ন্ত্রণ, পরিকল্পিত নগরায়ণ, উচ্চ শব্দের কনসার্ট ও মাইকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়া উচিত।
* বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কানে কোনো ওষুধ, তেল ড্রপ ব্যবহার না করা। কানে ময়লা বা খৈল জমে কান বন্ধ হলে বা কানের মধ্যে বাইরের কোনো বস্তু প্রবেশ করলে অপসারণ করতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
* এ ছাড়া স্বাস্থ্য সেবাদানকারীদের শ্রবণ প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করা জরুরি।
* হিয়ারিং ডিভাইস এবং থেরাপি সহজলভ্য করা সময়ের দাবি।
সুতরাং ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে শ্রবণত্রুটি ও বধিরতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। আসুন, কানের যতেœ সচেতন হই, শ্রবণযন্ত্র নিরাপদ রাখি।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, নাক-কান-গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগ, জয়নুল হক সিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা
"









































