ডা. আরমান রেজা চৌধুরী
নিরাপদ খাদ্য, ক্যানসার ঝুঁকি এবং আমাদের করণীয়

খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই খাদ্য যদি নিরাপদ না হয়, তবে তা শুধু পেটের অসুখ, ডায়রিয়া বা তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; দীর্ঘমেয়াদে তা ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। বাংলাদেশসহ সম্পদ-সীমিত দেশগুলোর জন্য নিরাপদ খাদ্য তাই শুধু জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়, এটি অর্থনীতি, কৃষি, বাজারব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি জাতীয় অগ্রাধিকার।
ক্যানসার সাধারণত একদিনে হয় না। দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে জেনেটিক পরিবর্তন, পরিবেশগত প্রভাব, জীবনযাপন, সংক্রমণ, খাদ্যাভ্যাস এবং রাসায়নিক উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয়। খাবারের সঙ্গে এই সম্পর্কটি সরাসরি ও পরোক্ষ, দুইভাবেই কাজ করে। কিছু খাবার বা খাদ্যদূষণ সরাসরি কোষের ডিএনএ ক্ষতি করতে পারে। আবার অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত, প্রক্রিয়াজাত বা অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাদ্য স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের মাধ্যমে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নিরাপদ খাদ্য বলতে শুধু ভেজালমুক্ত খাবার বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন থেকে ভোক্তার প্লেট পর্যন্ত পুরো খাদ্যশৃঙ্খলের নিরাপত্তা। জমিতে কী সার বা কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে, মাছ বা মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হচ্ছে কিনা, খাদ্য সংরক্ষণে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার হচ্ছে কিনা, শস্যে ছত্রাকের বিষ বা আফলাটক্সিন তৈরি হচ্ছে কি না, রান্না ও পরিবেশনের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা হচ্ছে কিনা, সবই নিরাপদ খাদ্যের অংশ।
আমাদের দেশে খাদ্য নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো অসচেতনতা। অনেক কৃষক বা উৎপাদক জানেন না কোন রাসায়নিক কী মাত্রায় ব্যবহার নিরাপদ। অনেক ব্যবসায়ী দ্রুত লাভের আশায় ফল পাকানো, মাছ সংরক্ষণ, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ বা খাবারের রঙ-স্বাদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। আবার অনেক ভোক্তাও জানেন না কোন খাবার কীভাবে কিনতে, ধুতে, সংরক্ষণ করতে বা রান্না করতে হবে। ফলে দায় শুধু একজনের নয়; এটি একটি সমন্বিত সামাজিক সমস্যা।
ক্যানসারের সঙ্গে খাদ্যের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গেলে অতিরঞ্জন করা যাবে না। কোনো একটি অনিরাপদ খাবার খেলেই ক্যানসার হবে, ব্যাপারটি আসলে এমন নয়। কিন্তু নিয়মিত অনিরাপদ খাবার গ্রহণ, প্রক্রিয়াজাত মাংসের অতিরিক্ত ব্যবহার, পোড়া বা অতিরিক্ত উচ্চ তাপে রান্না করা খাবার, ছত্রাকযুক্ত শস্য, অতিরিক্ত লবণ, ট্রান্সফ্যাট, অতিরিক্ত চিনি এবং দূষিত পানি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে আফলাটক্সিনযুক্ত চাল, ভুট্টা, বাদাম বা মসলা লিভারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একইভাবে ধূমায়িত, লবণাক্ত বা রাসায়নিকভাবে সংরক্ষিত খাবার অতিরিক্ত গ্রহণ পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নটি আরো জটিল। এখানে ছোট কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খোলা বাজার, রাস্তার খাবার, সীমিত ল্যাব সুবিধা, দুর্বল নজরদারি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। একজন নিম্ন বা মধ্যবিত্ত মানুষ সবসময় দামি অর্গানিক খাবার কিনতে পারবেন না। তাই নিরাপদ খাদ্যের সমাধান শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হতে পারে না; এটি হতে হবে সাশ্রয়ী, বাস্তবসম্মত এবং সবার নাগালে।
প্রথম করণীয় হলো উৎপাদন পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কৃষককে শাস্তি দেওয়ার আগে তাকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কোন কীটনাশক কখন ব্যবহার করা যাবে, ফসল তোলার কতদিন আগে তা বন্ধ করতে হবে, কীভাবে শস্য শুকাতে ও সংরক্ষণ করতে হবে, এসব বিষয়ে সহজ ভাষায় মাঠপর্যায়ে শিক্ষা দিতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
দ্বিতীয় করণীয় হলো বাজার নজরদারি শক্তিশালী করা, তবে তা যেন শুধু অভিযানে সীমাবদ্ধ না থাকে। মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্ট চালিয়ে জরিমানা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, বাজারভিত্তিক রেটিং ব্যবস্থা এবং জনগণের জন্য সহজ অভিযোগ পদ্ধতি। বড় শহর থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত খাদ্য পরীক্ষার সহজলভ্য ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। সবকিছু একদিনে সম্ভব নয়, তবে উচ্চঝুঁকির খাদ্য যেমন দুধ, মাংস, মাছ, তেল, মসলা, শিশুখাদ্য ও শস্য দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
তৃতীয় করণীয় হলো খাদ্যশিল্প ও রেস্তোরাঁ খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো। খাবারে কী উপাদান আছে, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং পুষ্টিগুণ স্পষ্টভাবে লেখা থাকতে হবে। ছোট খাবার দোকান বা রাস্তার খাবার বিক্রেতাদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সাশ্রয়ী লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে সহায়তা দিতে হবে।
চতুর্থ করণীয় হলো জনসচেতনতা। মানুষকে ভয় দেখিয়ে নয়, বাস্তব শিক্ষা দিয়ে সচেতন করতে হবে। যেমন, ছত্রাকধরা বাদাম বা শস্য ফেলে দিতে হবে; ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুতে হবে; অতিরিক্ত পোড়া খাবার কম খেতে হবে; প্রক্রিয়াজাত মাংস নিয়মিত খাবার তালিকা থেকে কমাতে হবে; শিশুর খাবার, দুধ ও পানি নিয়ে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে; বাসায় খাবার সংরক্ষণে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। স্কুল, মসজিদ, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কমিউনিটি ক্লিনিক এই সচেতনতায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
পঞ্চম করণীয় হলো ক্যানসার প্রতিরোধকে জাতীয় খাদ্যনীতির অংশ করা। আমরা ক্যানসার চিকিৎসায় হাসপাতাল, রেডিওথেরাপি মেশিন, কেমোথেরাপি ও ওষুধের কথা বলি। এগুলো অবশ্যই জরুরি। কিন্তু ক্যানসারের বোঝা কমাতে হলে প্রতিরোধে বিনিয়োগ করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য, ধূমপান নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান, সংক্রমণ প্রতিরোধ, শারীরিক সক্রিয়তা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসকে একসঙ্গে দেখতে হবে।
সম্পদ-সীমিত দেশে বড় সমাধান সবসময় ব্যয়বহুল হতে হবে, এমন নয়। স্থানীয় পর্যায়ে কৃষক প্রশিক্ষণ, কম খরচে খাদ্য পরীক্ষা, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, স্কুলভিত্তিক সচেতনতা, বাজার কমিটির দায়িত্ববোধ, ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের ধারাবাহিক প্রচার অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। পাশাপাশি গবেষণারও প্রয়োজন আছে। কোন অঞ্চলে কোন খাদ্যে বেশি ঝুঁকি, কোন রাসায়নিক বা দূষক বেশি পাওয়া যায়, কোন জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে আছে, এসব তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতি তৈরি করা কঠিন।
নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের জীবনরক্ষা, রোগ প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখার অন্যতম ভিত্তি। ক্যানসার চিকিৎসা ব্যয়বহুল, দীর্ঘমেয়াদি এবং অনেক পরিবারের জন্য আর্থিকভাবে বিধ্বংসী। তাই ক্যানসার প্রতিরোধে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা আমাদের জন্য শুধু স্বাস্থ্যনীতি নয়, মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন।
শেষ কথা হলো, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার, উৎপাদক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, গণমাধ্যম এবং ভোক্তা সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। খাদ্য যেন পুষ্টির উৎস হয়, রোগের কারণ নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে দরিদ্র মানুষও নিরাপদ খাবার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা গেলে ক্যানসারসহ অনেক প্রতিরোধযোগ্য রোগের বোঝা কমবে, চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং একটি সুস্থ জাতি গঠনের পথ আরো শক্তিশালী হবে।
লেখক: ক্যানসার বিশেষজ্ঞ
এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা।
"









































