মেহেদী হাসান
আগের দামেই সার বাজারে নেই সংকট

নওগাঁর মান্দা উপজেলার কৃষক জালাল উদ্দিন চলতি বোরো মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তবে তাকে বেশিদিন দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়নি। ডিলারের কাছে গিয়ে নিয়ে এসেছেন চাহিদামতো সার। কিনতে পেরেছেন তুলনামূলক কম দামেই। মৌসুমের শুরু থেকেই কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সারের সংকট হবে না বলে যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে প্রমাণ পাওয়া গেছে। সার সংকটের গুজব তুলে সরবরাহ ঘাটতির সুযোগে কিছু ডিলার সারের কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বেশি নিলেও তারা সতর্ক হয়েছেন। বর্তমানে বেশিরভাগ ডিলার দোকানে টাঙিয়েছেন সারের মূল্যতালিকা।
গত শুক্রবার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, প্রতি কেজি ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট ডিএপি ২১ টাকা, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) ২৭ এবং মিউরেট অফ পটাশ এমওপি ২০ টাকা দরে কিনতে পারবেন কৃষক। প্রতি কেজি ইউরিয়া কিনতে কৃষককে গুনতে হবে ২৭ টাকা। ডিলার পর্যায়ে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের বিক্রয়মূল্য ২৫ টাকা, ডিএপি ১৯, টিএসপি ২৫ এবং এমওপি ১৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল রবিবার দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষকের কাছে সরকার নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করছেন ডিলাররা। দুয়েক জায়গায় কিছুটা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও পাওয়া গেছে।
চলতি মৌসুমে ৫০ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে ২ কোটি ২৬ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিগত বছরের তুলনায় বেশি। ফলে এবার সারের চাহিদাও বেশি। দেশের কৃষি খাতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি (পটাশ)- এ চার ধরনের সারই সাধারণত প্রধান সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ইউরিয়া সার আমদানি করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। অন্যান্য সার আমদানি করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। দেশে চলতি বছর ৬৫ লাখ টনেরও বেশি সারের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ২৬ লাখ টন ইউরিয়া, সাড়ে ৭ লাখ টন টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট), সাড়ে ১৬ লাখ টন ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) এবং সাড়ে ৮ লাখ টন এমওপি সারের চাহিদা রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য সারের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৮ লাখ টন। বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন সার কারখানাগুলোয় বছরে ইউরিয়া সার উৎপাদন হয় ৯ থেকে ১০ লাখ টন। এর বাইরে কাফকোয় উৎপাদিত সব সারই সরকার আন্তর্জাতিক দরে এবং বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয় করা হয়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সরকার ইউরিয়া সার আমদানি করে।
চলতি বোরো মৌসুমে সারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার আগেই জানিয়েছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। গত ডিসেম্বরে দেশে ৬.৮১ লাখ টন ইউরিয়া, ১.২৫ লাখ টন ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ২.২৮ লাখ টন ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) এবং ২.৪৮ লাখ টন মিউরেট অফ পটাশ (এমওপি) মজুদ রয়েছে বলে জানান তারা। কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, পর্যাপ্ত মজুদ থাকায়, বোরো মৌসুমে সার সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। বোরো চাষের আগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অধীনে বাফার স্টক গোডাউন ও ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। মার্চ পর্যন্ত রবি মৌসুমে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের মোট চাহিদা ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৭০১ টন, টিএসপি ৪ লাখ ৬৬ হাজার ২৭৯ টন, ডিএপি ৯ লাখ ৬৮ হাজার ৭৭৭ টন এবং এমওপি ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৮৪৬ টন নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বিসিআইসি ও বিএডিসি পরিচালিত বাফার গোডাউনে সব ধরনের সারের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। চলতি বছরের সামগ্রিক ও মৌসুমি সারের চাহিদার কথা মাথায় রেখে বিএডিসি ও বিসিআইসিসহ বেসরকারি-সরকারি খাতের আমদানিকারকরা ধারাবাহিকভাবে সার আমদানি করছে। সারের মোট চাহিদার মধ্যে বিসিআইসি স্থানীয়ভাবে ১০ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদন করবে। বাকি ১৫ লাখ টন সার চট্টগ্রামভিত্তিক যৌথ উদ্যোগের বহুজাতিক কোম্পানি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি বা কাফকো উৎপাদন করবে ও বিদেশে থেকে আমদানি করা হবে। বিসিআইসির এক কর্মকর্তা জানান, সারা বছর আমদানি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে বিসিআইসি ১ লাখ টন টিএসপি ও ১ লাখ টন ডিএপি আমদানি করবে। বিএডিসি ৪ লাখ ৫০ হাজার টন টিএসপি, ৯ লাখ টন ডিএপি এবং ৭ লাখ টন এমওপি সংগ্রহ করবে। বাকি ২ লাখ টন টিএসপি, ৫ লাখ টন ডিএপি ও ২.৫০ লাখ টন এমওপি বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আমদানি করা হবে।
নওগাঁর বরুণকান্দি (ঠ্যাং ভাঙার মোড়) এলাকার বিসিআইসি অনুমোদিত রাসায়নিক সার ডিলার সাইফুল ইসলাম তার দোকানে সারের মূল্যতালিকা টাঙিয়ে দিয়েছেন। ব্যানারে দেখা যায়, প্রতি কেজি ইউরিয়া ও টিএসপি ২৭ টাকা দরে ৫০ কেজির বস্তার দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। ডিএপি ২১ টাকা কেজি দরে ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকা কেজি দরে ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকায়। জানতে চাইলে আব্বাস আলী নামে এক কৃষক জানান, আপাতত সারের কোনো সংকট নেই। আমরা সার পাওয়া নিয়ে চিন্তায় ছিলাম, কিন্তু এখন দেখি সমস্যা নেই। আমরা ডিলারের কাছে গেলেই সার পাচ্ছি। ইউরিয়া ২৭ টাকা, ডিএপি ২১, টিএসপি ২৭ এবং এমওপি ২০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় একটু বেশি নিচ্ছে শুনেছি। শেখ হাসিনা সরকার পালিয়ে যাওয়ার পর দেশে বেশকিছু জটিলতা তৈরিতে আমাদের মতো কৃষক দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম। এখন আর সেই চিন্তা করতে হয় না। সার-ওষুধ সবই আমরা পাচ্ছি। নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করছেন ডিলাররা। বেশি দাম নিলে যদি কাউকে জানিয়ে দিই, সেই ভয়ে হয়তো তারা বেশি দাম নেওয়ার সাহস করছে না।
সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার না কেনার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কোনো ডিলার এর চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করলে জেলা বা উপজেলা প্রশাসক, কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানাতে বলা হয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে সারের দাম প্রতি কেজি ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়েছিল। তখন কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতে দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে তখন বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম ৪৮ টাকা, ডিএপি ৭০, টিএসপি ৫০ ও এমওপি ৬০ টাকা। ৫ টাকা দাম বাড়ার পরও সরকারকে প্রতি কেজি ইউরিয়ায় ২১ টাকা, ডিএপিতে ৪৯, টিএসপিতে ২৩ এবং এমওপিতে ৪০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
সারের সংকট বিষয়ে কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, দেশ থেকে সারের সংকট চিরতরে জাদুঘরে পাঠানো হবে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সারের মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। সারের মজুদাগার নির্মাণ করা ছাড়াও সম্ভাব্য বিকল্প স্থানে মজুদাগার তৈরি করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এজন্য বন্ধ ঘোষণা করা বা পরিত্যক্ত পাট কারখানাগুলোয় সারের মজুদাগার করা হবে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজার থেকে স্বল্প দামে অফ সিজনে সার কিনে আনা সম্ভব হবে। এতে বছরে দেড় থেকে ২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
"






































