বদরুল আলম মজুমদার

  ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

প্রাণ ফিরল শ্রেণিকক্ষে

প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৮০ শতাংশের বেশি

‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে/রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশে/নবীন পাতায় লাগে রাঙা হিল্লোল-দ্বার খোল্, দ্বার খোল’- কবিগুরুর এই আহ্বানে যেন খুলে গেল স্কুুল-কলেজের দুয়ার; যে মুহূর্তটির জন্য শিক্ষার্থীরা দুরুদুরু বুকে প্রস্তুতি নিচ্ছিল কয়েক দিন ধরে। স্কুলে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ তো ছিলই, সঙ্গে করোনাভাইরাসের কারণে বদলে যাওয়া জীবনের নতুন অভিজ্ঞতাও। এই অপেক্ষায় ছিলেন শিক্ষক-অভিবাবকরাও। যেন মুক্তির আনন্দ সবখানে। টানা ৫৪৪ দিন পর গতকাল রবিবার শুরু হলো ক্লাস। আবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠল শ্রেণিকক্ষ।

ঢাকাসহ সারা দেশেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে শহরের বাইরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিধি মানার হার ছিল কম। এদিকে, ঢাকাসহ বিভাগীয় সদরের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের ফুল ও চকলেট দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন শিক্ষকরা। রাজধানীর তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে শোনা গেল, ‘আহা, আজি এই বসন্তে/এত ফুল ফুটে...’ গান বেজে চলেছে অবিরত। কেননা, নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব শিক্ষার্থীর জন্যই তীর্থস্থান। সেই অনুভব তখনই বোঝা সম্ভব, যখন সেখানে শত ইচ্ছায়ও যাওয়ার সুযোগ থাকে না। যে শিক্ষার্থী রোজ সকালে স্কুলে যেতে হবে বলে নানা বাহানায় দেরি করেছে, সে-ই প্রথম দিন এসেছিল সবার আগে। গেল বছরের ১৮ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি পরে যে পাবলিক পরীক্ষাগুলো হওয়ার কথা ছিল সেগুলোও হয়নি। শিক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী পরীক্ষাগুলোর ফলের ওপর ভিত্তি করে একটি ফল প্রকাশ করা হয় যাকে ‘অটোপাস’ বলে অভিহিত করা হয়েছে পরবর্তী দিনগুলোতে।

এরপর গত দেড় বছরেরও বেশি সময়ে দফায় দফায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানোর কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান হয়নি। তবে অনলাইনে ক্লাস হয়েছে।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখা জানিয়েছে, প্রথম দিন ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত ছিল।

শাখা পরিচালক অধ্যাপক আমির হোসেন বলেন, ‘সারা দেশে ১৯ হাজার অনুমোদিত স্কুল-কলেজ থেকে প্রতিদিনের তথ্য প্রতিদিন পাঠাচ্ছে। বিকাল ৩টার মধ্যে ছক আকারে এসব তথ্য মেইলে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী গতকাল রবিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত ১৪ হাজার ৪৮৮টি বিদ্যালয় থেকে প্রথম দিনের সার্বিক তথ্য পাঠানো হয়েছে।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের প্রকাশিত এক নিবন্ধ থেকে জানা যায়, গত মার্চ মাস পর্যন্ত টানা এক বছর পৃথিবী জুড়ে প্রায় ১৭ কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ কোটি শিশুই ছিল ১৪টি দেশের, যেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি।

রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজ ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকেই শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের বরণ করে নিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সকাল সাড়ে ৮টায় উত্তরার রাজউক কমার্শিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে দেখা যায় গেটে হালকা জটলা লেগেছিল। কয়েকজন অভিভাবক প্রবেশমুখে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের সন্তানদের জন্য। স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা লাইন ধরে সামাজিক দূরত্ব মেনে নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করছে।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধিও মানতে দেখা গেছে প্রতিটি ক্লাসরুম ও প্রবেশমুখে। এ বিদ্যালয়ে আগে দুই শিফটে ক্লাস পরিচালনা করা হলেও এবার তিনটি শিফটে করার প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে প্রথম দিন দুটি শিফটেই ক্লাস পরিচালনা করা হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

পাঠদান শুরুর আগে স্কুলের মাঠে তিনজন শিক্ষার্থী নিরাপদ দূরত্বে থেকে কথা বলতে দেখা যায়। একজন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা তিনজন ভালো বন্ধু, অনেক দিন ধরে একে অপরকে দেখি না। একপ্রকার ঘরবন্দি থেকে আমরা পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।’

তামিমা নামের আরেজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আসলে ভাইয়া আড্ডা না, ব্যাপারটা স্কুলমাঠে এভাবে তিনজন মিলিত হতে পেরে কি যে আনন্দ লাগছে তা বলে বোঝানো যাবে না।’

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কূল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী শারমিন রিহা। সকালে মায়ের সঙ্গে স্কুলে এসেছে। দুপুর ২টার দিকে ক্লাস শেষ করে বের হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি তুলতে দেখা যায় তাকে। এত দিন পর স্কুলে এসে কেমন লাগছে, জানতে চাইলে রিহা বলেন, ‘এ যেন ঈদের দিনের মতো। ঈদের দিন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে যেমন আনন্দ হয়, তেমন আনন্দ হচ্ছে আজ।’

শুধু রিহাই নয়, রাজধানীর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ঘুরে এমন চিত্রই সর্বত্র চোখে পড়েছে। মূলত দীর্ঘদিন পর তারা স্কুলে আসতে পেরে অনেক খুশি শিক্ষার্থীরা। তাদের এ খুশিতে শিক্ষক, স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকরাও খুশি।

দুপুরের দিকে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের পদচারণে রাজধানীর প্রায় সব ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণই ছিল হাসি-আনন্দে ভরপুর। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার মুখে ছিল মাস্ক। দুপুরে স্কুল ছুটি হলে বন্ধুদের নিয়ে একসঙ্গে ভ্রাম্যমাণ দোকানের আচার, ঝালমুড়ি, ডাব, আইসক্রিম খেতেও দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। উত্তরার নওয়াব হাবিবুল্লাহ স্কুল অ্যান্ড কলেজের আরেক শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা নূর ঊর্মিলা স্কুলে আসতে পারার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, এ যেন আমার কাছে একটি স্বপ্নের দিন। কখনো কল্পনাতেই ছিল না, আজ আমার বন্ধুদের দেখব, তাদের সঙ্গে কথা বলব, হাসব, একই সুরে গান গাইব। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দেখেও অনেক ভালো লেগেছে।

উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন শিক্ষক শিরিন আক্তার, দীর্ঘদিন পর ক্যাম্পাসে আসতে পারায় বেশ খুশি। তিনি বলেন, আজকের দিনের যে অনুভূতি তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমি আমার জীবনে মনে হয় কখনোই এত আনন্দিত হইনি, এত উচ্ছ্বসিত হইনি।

আনোয়ার হোসেন নামের একজন অভিভাবক এ সময় প্রতিবেদককে জানান, দেশে সবকিছুই খুলে দেওয়া হয়েছে অনেক আগে। কিন্তু আমরা এ দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম। আশা করছি, ছেলেমেয়েরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে কিছু হবে না।

এদিকে, ঢাকার মতো সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও গতকাল বয়ে যায় আনন্দের বন্যা। শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবকসহ সবাই। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খরব-

বগুড়া : মুখে মাস্ক, হাতে গোলাপ ফুল নিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে বগুড়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সকালে শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়েছে বগুড়া পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষসহ শিক্ষার্থীরা। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় বেজে ওঠে দীর্ঘ বিরতির সেই ক্লাসের ঘণ্টা, ঘণ্টার শব্দে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেছে শহরের স্কুল-কলেজ।

নড়াইল : সবার মধ্যে উচ্ছ্বাসের ছাপ দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাতে বিদ্যালয়গুলো সাজানো হয় বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

সিরাজগঞ্জ : উৎসবমুখোর পরিবেশে করোনাভাইরাসের আতঙ্কের মধ্যেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু হয়েছে। সকালে প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ায় উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গেছে। ছাত্রছাত্রীদের পদভারে আবার ফিরে পেয়েছে চিরচেনা সেই রূপ।

জেলায় ৬৫৯টি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদরাসায় ৮ লাখ ৯০ হাজার ৫৮৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় শিক্ষার্থীরা উৎসবের সঙ্গে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন।

বান্দরবান : স্বাস্থ্যবিধি মেনে বান্দরবানে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে শিক্ষাকার্যক্রম। সকাল সাড়ে ৭টায় বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, বান্দরবান কালেক্টরেট স্কুলসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের সঙ্গে স্কুলে প্রবেশ করছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে উঠেছে বিদ্যাপীঠ। শ্রেণিকক্ষে ছিল আনন্দ আর উল্লাস।

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) : শিক্ষার্থীদের পদচারণে প্রাণ ফিরে পেয়েছে কমলগঞ্জের স্কুল-কলেজগুলো। অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। দেখা যায় উপজেলার স্কুলে ৮০% ও কলেজে ৫০% শিক্ষার্থীর উপস্থিতি।

বেশ কয়েকটি স্কুল ঘুরে দেখা যায়, স্কুলের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে শিক্ষার্থীদের। ছাত্রছাত্রীদের পদচারণে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। দীর্ঘদিন পর চিরচেনা পরিবেশ ফিরে পাওয়ায় অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close