গাজী শাহনেওয়াজ

  ১০ মে, ২০২১

বেপরোয়া ঈদযাত্রা

* বিজিবি নামিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না * সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নেওয়ার শঙ্কা

নভেল করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ঠেকাতে দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ রাখাসহ আরোপিত বিধিনিষেধ রুখতে পারছে না ঈদে ঘরমুখো মানুষের স্রোত। বাস বন্ধ, ট্রেন বন্ধ, ফেরি সীমিত, সর্বশেষ ফেরিঘাটে বিজিবি মোতায়েন সত্ত্বেও চলছে বেপরোয়া ঈদযাত্রা। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বিকল্প বাহনে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ। কেবল দেশের দুই প্রধান নৌরুট শিমুলিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে দক্ষিণাঞ্চলগামী মানুষের ঢলই নয়, উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের মানুষও বসে নেই। ঢাকা থেকে বেরোনোর কোনো বাধা না থাকায় রাজশাহী-রংপুর এবং সিলেট-ময়মনসিংহ-চট্টগ্রামগামী মানুষের ঢলও রয়েছে সড়কে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ আকাশপথ খোলা থাকায় সেখানেও রয়েছে যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ। সড়কে ফেরিতে জনসমুদ্রে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই নেই। সব মিলিয়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানার সব চেষ্টা ব্যর্থ হতে বসেছে বলেই আশঙ্কা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক উত্তম বড়ুয়া প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘মানুষের যে জনস্রোত সড়ক-মহাসড়কগুলোতে আমরা দেখছি, করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য এর চেয়ে বড় ঝুঁকি আর কিছুই হতে পারে না। কারণ এত দিন বড় শহর ও ঢাকাকেন্দ্রিক করোনা ছড়ালেও এবার তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।’

------
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘মানুষ ঢাকা ছাড়ছে ঠিক তবে স্বাস্থ্যবিধি মানায় তাদের মধ্যে কোনো সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না। গাদাগাদি করে, মাস্ক না পরে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ছাড়াই বাড়িতে যেতে সড়কে নেমে পড়েছে মানুষ। এতে ঈদের ১৪ দিন পর করোনায় দেশজুড়ে সংক্রমণের ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যেখানে ভারতে শনাক্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড হচ্ছে প্রতিদিনই; সেখানে আমরা বাড়ি যেতে উন্মুখ হয়ে পড়েছি। আর এরই মধ্যে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ধরা পড়েছে। সব মিলিয়ে আমরা খারাপ অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে।’

অধ্যাপক উত্তম বড়ুয়া বলেন, ‘করোনার ভয়াবহতা মানুষ দেখার পরও যদি তাদের বোধদয় না হয়, তাহলে সরকার যে আশায় বিধিনিষেধ আরোপ করছে তার প্রভাব পড়বে না। আলটিমেটলি যা হওয়ার তাই হবে। ভারতে করোনার ভয়াবহতা দেখেও মানুষ কেন শিক্ষা নিচ্ছে না, তা একজন চিকিৎসক হিসেবে মেনে নিতে পারছি না।’

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. মো. আহাদ হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘করোনা নিয়ন্ত্রণে আসা সরকারের কঠোর বিধিনিষেধের সুফল। কিন্তু যেভাবে মানুষ ঢাকা ছাড়ছে তাতে আমাদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। প্রতিদিনই বিকল্প বাহনে মানুষ ঢাকা ছাড়ছে, যা করোনা বিস্তার ছড়ানোর জন্য সহায়ক।’

এরই মধ্যে দেশে কোভিডে মৃত্যু আবার বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু ঈদ সামনে রেখে ঘরমুখো জনস্রোত পরিস্থিতি আরো খারাপ দিকে নিয়ে যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানুষকে নিরুৎসাহিত করে বলছেন, ‘একটা ঈদে বাড়িতে না গেলে কি হয়।’ তবু ঘরে ফেরা মানুষকে ঠেকানো যাচ্ছে না, কোনো বাধাই টিকছে না মানুষের কাছে। সরকারের সব নির্দেশনা অমান্য করে মানুষ ছুটছে ঢাকা ছেড়ে।

অন্যান্য বছর ঈদের এ সময়টায় রাজধানী থেকে বের হওয়ার অন্যতম বাস টার্মিনাল গাবতলী থাকত লোকে লোকারণ্য। গাবতলীতে এবার সে চিত্র নেই, কারণ বাস বন্ধ। তবে আমিনবাজার সেতু পার হলেই দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। হাজার হাজার মানুষ গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। সেখানে সহজেই মিলছে কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল। গতকাল রবিবার সকালে দেখা যায়, সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস, কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে চেপেই যাত্রীরা যাচ্ছেন আরিচা-পাটুরিয়া ঘাটের দিকে। প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসে জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। অন্যদিকে বাসে জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। তবে প্রশাসনের তৎপরতায় যাত্রীদের গাবতলী থেকে হেঁটে আমিনবাজার গিয়ে ঘাটের গাড়ি ধরতে হচ্ছে।

মামুন হোসেন নামে এক ব্যক্তি রওনা দিয়েছেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার উদ্দেশে। গুলিস্তান থেকে ভ্যানে এসেছেন আমিনবাজার। পরিবার নিয়ে ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছেন তিনি। ফেরি বন্ধ, কীভাবে যাবেন জানতে চাইলে মামুন বলেন, ‘ফেরি না চললেও স্টিমার চলছে। ছোট ছোট লঞ্চ, ট্রলার আছে। ফেরি ছাড়া অন্যসব চলছে। কোনো একটায় নদী পার হয়ে যাব।’

এদিকে ফেরিতে মানুষের ঢল থামাতে বিজিবি মোতায়েন করা হলেও মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়ায় ঘরমুখো ঈদযাত্রীদের স্রোত থামেনি। বিজিবির বাধা সত্ত্বেও জোর করে ফেরিতে উঠছেন যাত্রীরা। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে শিমুলিয়া ঘাট থেকে গতকাল রবিবার সকাল ১০টার দিকে প্রায় দুই হাজার যাত্রী নিয়ে ছেড়ে গেছে ফেরি শাহপরান। এর আগে ১১টি অ্যাম্বুলেন্স ও কিছু যাত্রী ছেড়ে যায় ফেরি ফরিদপুর। এর পরও হাজার হাজার যাত্রী দেখা গেছে ঘাটে ফেরির অপেক্ষায়। যদিও এদিন বেশির ভাগ ফেরিই ছিল নোঙর করা।

এদিকে সকালের দিকে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ঘরমুখো যাত্রীদের তেমন একটা চাপ দেখা না গেলেও দুপুরের দিকে কিছুটা চাপ বেড়েছে। সাব্বির নামের আরেকজন যাবেন পাবনায়। তিনি বলেন, ‘বাড়িতে যাচ্ছি অসুস্থ মায়ের জন্য। মূলত মাকে দেখতেই বাড়ি যাচ্ছি। মা অসুস্থ না থাকলে এই পরিস্থিতিতে বাড়িতে যেতাম না।’

মো. রফিক নামে এক যাত্রী যাবেন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায়। তিনি বলেন, ‘গাড়ি চলাচল না করায় বিপদে পড়েছি। সরকারের লকডাউনে আমরা সাধারণ জনগণ বিপদে পড়েছি। ফার্মগেট থেকে বাসে গাবতলী এসেছি। গাবতলী থেকে হেঁটে আমিনবাজার এসেছি। এখান থেকে লেগুনা করে যাব।’

রোজিনা নামে আরেকজন বলেন, ‘ঈদ করতে বাড়িতে যাচ্ছি। ঈদ শেষে আবার ঢাকায় আসব।’ কীভাবে যাবেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্রাইভেট কারে যাব। ভাড়া একটু বেশি লাগবে, তবে নিশ্চিন্তে বাড়িতে যেতে পারব, এটাই স্বস্তির।’

এদিকে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে রাতে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে চলছে দূরপাল্লার বাস। এ ছাড়া তিন চাকার সিএনজি চলাচল করছে মহাসড়কে। এসব যানবাহনে চলাচল করা যাত্রী ও চালকদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি। মহাসড়কের জোকারচর, আনালিয়াবাড়ী, হাতিয়া, সল্লা ও এলেঙ্গায় এমন চিত্র দেখা গেছে। প্রাইভেট কারসহ ব্যক্তিগত গাড়িতে গাদাগাদি করে চলাচল করছেন মানুষ।

মহাসড়কে গণপরিবহন না পাওয়ায় বিভিন্ন স্ট্যান্ডে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষ জানায়, গত শনিবার থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে ২৫ হাজারের অধিক যানবাহন পারাপার হয়েছে। এতে টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আন্তজেলা গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে পারাপার হয়েছে অন্তত ৩০০ বাস। এ ছাড়া পণ্যপরিবহনে নিয়োজিত যানবাহন, ব্যক্তিগত ছোট যানবাহন ও মোটরসাইকেল চলাচল করেছে বেশি।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close