ফয়জুন্নেছা মণি

  ১৩ জুন, ২০১৭

ঋতুবৈচিত্র্য

ঝকঝকে গ্রীষ্মের চকচকে রোদ্দুর

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল ঋতু গণনার প্রথম মাস। গ্রীষ্ম বা সামার এমন একটি ঋতু যখন তাপমাত্রা থাকে প্রচ- গরম এবং দিন থাকে দীর্ঘ। গ্রীষ্মেও রাত থাকে শীতকালের রাতের চেয়ে ছোট। তাই এ সময়ে ক্লান্ত দেহে দিনের বেলায়ও ঘুমের ক্লান্তি থাকে। ছোটবেলার বইতে পড়া বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাস নিয়েই গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মের শুরুটাই কালবৈশাখীর হুঙ্কার দিয়ে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘গ্রীষ্মে নাচে বামা কালবোশেখি ঝড়ে,/সহসা বরষাতে কাঁদিয়া ভেঙে পড়ে।’ বৈশাখ মাস হচ্ছে বাংলা বছরের প্রথম মাস। এই মাসে বাংলার ঘরে ঘরে নতুন ফসল তোলার প্রস্তুতি চলে। গ্রীষ্মকালে সূর্যের আলোকরশ্মি যেন চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। গ্রীষ্মের ঝকঝকে রোদ্দুর তীব্র তাপমাত্রায় দাবদাহের সৃষ্টি করে। গ্রীষ্মের কথা কবি ফজলুর রহমান তার কবিতায় লিখেছেন-‘রোদ যেন নয় শুধু ঘন ফুলকি/আগুনের ঘোড়া যেন ছুটে চলে দুলকি।’ আকাশে তুখোড় সূর্যতাপ, কাঠফাটা ঝকঝকে রোদ্দুরে অগ্নিদাহ ছড়ানো বাতাস, ছায়াশূন্য পথ আর ক্লান্ত পথিকের দীর্ঘশ^াস যেন গ্রীষ্মের চিরচেনা রূপ। জানার বিষয় হলো, পৃথিবীর সব এলাকায় গ্রীষ্মকাল একই সময়ে আসে না। উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল জুন থেকে সেপ্টেম্বর এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ডিসেম্বর মাস থেকে মার্চ মাস গ্রীষ্মকাল হয়ে থাকে। আবার গ্রীষ্মকাল গণনা শুরু হয় বিভিন্ন দেশে ভিন্ন সময়ে, যেমন-আয়ারল্যান্ডে মে মাসের ১ তারিখ থেকে, কিছু দেশে জুন মাসের ১ তারিখ এবং আবার অনেক দেশ জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে গ্রীষ্মের গণনা ধরা হয়। আমাদের দেশে গ্রীষ্মকাল এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে পহেলা বৈশাখের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবং জুন মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত টিকে থাকে। ঋতু উদযাপনের ছুটি হিসেবে স্কুল কলেজগুলোতে মধ্য মে থেকে মধ্য জুনের মধ্যে সুবিধাজনক সময়ে গ্রীষ্মের বন্ধ থাকে। তবে সময়ভেদে গ্রীষ্মেও আবহাওয়ার তারতম্য লক্ষ করা যায়। আবহাওয়ার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য একেক সময় একে রকম হয়ে থাকে।

মজার ব্যাপার হলো এই গ্রীষ্মেই অধিকাংশ জনপ্রিয় ফল পাকে। তাই গ্রীষ্মকালে আম-কাঁঠালের ছুটি বা গ্রীষ্মের ছুটি দেওয়া হয় স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ে। ছোটবেলায় মুখস্থ করা পল্লী কবি জসীম উদদীনের ‘মামার বাড়ী’ কবিতার সেই পঙক্তিমালা আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে-‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ/পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ।’ গ্রীষ্মকালে মজার মধুর অনেক ফল পাওয়া যায় বলে এই সময়কে মধুমাসও বলে কেউ কেউ। গ্রীষ্মকাল মানেই তো নানা রকমের রসাল, ঠা-া, মিষ্টি ফলের সমাহার। এ সময় আম, জাম, লিচু, জামরুল, কাঁঠাল, আনারস, তরমুজ, শসা প্রভৃতি ফলে বাজার সয়লাভ থাকে। আবার এই গ্রীষ্মের প্রখর গরমের তাপে ঘামে শরীরের প্রয়োজনীয় পানি বের হয়ে যায়। জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। এ সময় ডায়রিয়া, বদহজম, বমি, জ্বর ইত্যাদি নানা রোগের সঙ্গে হিট স্ট্রোকের মতো জীবনের ভয়ঙ্কর পরিণতিও ঘটে। গ্রীষ্মের ঋতু রূপ নিয়ে আছে কবিতা ও গান। আছে কালবৈশাখী ঝড়, মেঘকালো আকাশ, আর ঘন ঘন ভয়ঙ্কর বজ্রপাত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার দুই বিঘা জমিতে লিখেছেন, ‘সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,/অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।’

মনে রাখতে হবে, গ্রীষ্ম কেবল আগুনই ঝরায় না বাহারি ফুলের পসরা সাজিয়ে হৃদয়ও কাড়ে। আমাদের গ্রীষ্মকে অনেক বেশি ঐশ্বর্যম-িত করেছে জমকালো রঙিন ফুলের বাহার। ফুল বা পুষ্প উৎসবের ঋতু গ্রীষ্মকালকেও বলা যেতে পারে। গ্রীষ্মকালে প্রকৃতির রুক্ষতা ও জীবনের যান্ত্রিকতা ভুলিয়ে দেয় প্রাকৃতিক ফুলের শোভার মোহময়তা। গ্রীষ্মে প্রকৃতির শোভায় গাছের ডালে ডালে পাতার ফাঁকে ফাঁকে চোখ-ধাঁধানো রঙের বাহার লক্ষণীয়। বিশেষত কৃষ্ণচূড়ার রক্তলাল রঙে যেন রঙিন হয়ে ওঠে গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মের খরতাপ অসহনীয় হলেও এ সময়ে ফোটে গোলাপ, টগর, বকুল, শিমুল, জারুল, কাঠগোলাপ, কনকচূড়া, বেলী, পলাশ, জবাসহ নানারকমের সুগন্ধী ও রঙিন ফুল। গ্রীষ্মে নানারকমের বনজ ফুলের উপস্থিতিও প্রকৃতিকে আবেদনময় করে তোলে। গ্রীষ্মের কৃষ্ণচূড়া নজরকারা সৌন্দর্যে বিমোহিত করে প্রকৃতিপ্রেমী মনকে। গ্রীষ্মকাল মনমাতানো রকমারি রঙিন ফুলের ঝকমারি সুবাসে মন উদাস করে দেয় পাগলা হাওয়ার তালে। এই ধরুন কৃষ্ণচূড়ার লাল-কমলা, জারুলের হালকা বেগুনি, ক্যাশিয়ার গোলাপি-সাদা, পেল্টফরাম আর সোনাইলের হলুদ রঙ আলোকোজ্জ্বল করে তোলে প্রকৃতির অপরূপ শোভাকে। গ্রীষ্মের বাতাসে বাতাসে স্বর্ণচাঁপা, শিরীষ, হিজলে মাতাল সুবাসে মন উদাস হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মে প্রখর তাপে জনজীবন অস্থির হয়ে ওঠে। গরমের কারণে নানান ধরনের রোগ বালাইয়ে প্রকোপ বেড়ে যায়। ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পানির কষ্টে উদ্ভিদ-প্রাণী সবার জীবনে হাহাকার নেমে আসে। গ্রীষ্মের গরমে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। জানা যায়, উত্তর আমেরিকার ডেথ ভ্যালি, ক্যালিফর্নিয়ায় ১৯১৩ সালের ১০ জুলাই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৫৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস/১৩৪ ফা.। আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ার কেবিলিতে ১৯৩১ সালের ০৭ জুলাই তাপমাত্রা ছিল ৫৫.০ সেলসিয়াস/১৩১ ফা.। এশিয়ার দেশ ইসরায়েলের তিরাত তভির তাপমাত্রা ১৯৪২ সালের ২১ জুন ছিল ৫৪.০ সেলসিয়াস/১২৯ ফা.। কুয়েতের সুলাইবিয়ায় ২০১২ সালের ৩১ জুলাই তাপমাত্রা ছিল ৫৫.০ সেলসিয়াস/১৩১ ফা.। মহেনজোদারো, সিন্ধু, পাকিস্তানে ২০১০ সালের ২৬ মে তাপমাত্রা ছিল ৫৩.৫ সেলসিয়াস/ ১২৮.৩ ফা.। আলি আইর বেজ, নাসিরিয়া, ইরাকে ২০১১ সালের ৩ জুলাই তাপমাত্রা ছিল ৫৩.০ সেলসিয়াস/১২৭ ফা.। গ্রীষ্মের গরমে গ্রামের দৃশ্য ভিন্নরকম। তখন মানুষ কর্মক্লান্ত হয়ে গাছের নিচে শীতল ছায়া খুঁজে বেড়ায়। গায়ে গামছা ঝুলিয়ে, কিংবা তালপাতার হাতপাখা ঘুরিয়ে দেহ-মনের প্রশান্তি পাওয়ার চেষ্টা করে।

লেখকা : কবি ও কলামিস্ট

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist