সাব্বির আহমেদ চৌধুরী
মতামত
শেখ হাসিনার কূটনীতি ও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশ নামক ছোট একটি ভূখণ্ডের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো কিংবা কীভাবে আন্তর্জাতিক বিশ্বের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণকে সরলীকরণের মাধ্যমে দুর্বার গতিতে সামনের দিকে নিরন্তর ছুটে চলা যায় তাই দেখিয়েছেন টানা তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হেনরি কিসিঞ্জারের উপহাস করা সেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ কিংবা বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের ‘দুর্নীতিতে টানা পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ থেকে ‘ইমার্জিং এশিয়ান টাইগার’ এবং ‘ইকোনমিক মিরাকল’র তকমা পাওয়ার পথ এতটা মসৃণ ছিল না।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের সময় বৃহৎ শক্তির মধ্যে রাশিয়া ছিল বাংলাদেশের পক্ষে এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্র ‘পিং-পং কূটনীতি’র নামে ‘বিরোধী’ অবস্থান নিয়েছিল। চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর। চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুকে তাদের তৎকালীন মিত্র পাকিস্তান ভাঙার জন্য দায়ী করেছিল।
৭৫-পরবর্তী বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ ছাড়াই বেইজিং ধারাবাহিকভাবে ঢাকার বন্ধুতে পরিণত হয়। কিন্তু দূরদর্শী শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেতা থাকাকালে এই সম্পর্কের ‘বরফ’ গলাতে প্রথমবারের মতো চীন সফর করেন। সে সফরে বেইজিং নেত্রীর প্রতি ব্যতিক্রমীভাবে উষ্ণ ছিল এবং ইঙ্গিত দিয়েছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে তার দৃঢ় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা তাকে সম্মান করছে। কিন্তু তাইওয়ানকে পূর্ণ কনস্যুলার সেবাসহ একটি প্রতিনিধি অফিস খোলার অনুমতি দিয়ে তৎকালীন বিএনপি সরকার চীনের সঙ্গে তাদের পরীক্ষিত সম্পর্কের একটি ভুল করে বসে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সময় থেকে কূটনৈতিক সম্পর্কে শক্ত অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও বিএনপি সরকারের এ পদক্ষেপ ছিল বন্ধুর মুখে চড় মারার শামিল।
পক্ষান্তরে শেখ হাসিনা রাশিয়া ও ভারতের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করেন। চীন, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ কাজ ছিল না, কিন্তু শেখ হাসিনার জাদুকরী কূটনীতিতে তা সম্ভব হয়েছে। কৌশলগত পরিকল্পনার পাশাপাশি তার নেতৃত্বের দক্ষতা এবং ক্যারিশমা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর এশিয়ার উদীয়মান জায়ান্ট চীনের সঙ্গে তিন দশকেরও বেশি পুরোনো দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে উদ্ভাবনী উপায় বের করার প্রয়াসে ২০১০ সালে শেখ হাসিনা ও চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাওর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ‘সহযোগিতার ঘনিষ্ঠ বিস্তৃত অংশীদারত্ব’ গড়ে তোলার একটি সংকল্প গৃহীত হয়। চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েব জিয়াবাও শেখ হাসিনাকে সব ক্ষেত্রে সার্বিক সমর্থন ও সহযোগিতার আশ্বাস দেন। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের সঙ্গে ‘ব্যাপক অংশীদারত্ব’ অর্জনে শেখ হাসিনার উচ্চাকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই যুগান্তকারী আলোচনায় উভয় দেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। উন্নয়ন প্রকল্প, কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতায় চীনের আর্থিক সহায়তা ও কারিগরি সহায়তার জন্য শেখ হাসিনার আহ্বানে চীন ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৯ সালে আরো দুবার প্রধানমন্ত্রী চীনে সরকারি সফর করেছেন।
এ সময় এসে এক যুগ পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার চীন। সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমদানি-রপ্তানি মিলিয়ে মোট বাণিজ্যের প্রায় ১৪ শতাংশই হয় চীনের সঙ্গে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য হয়েছিল ৬৭৭ কোটি ডলারের। প্রায় এক দশক পর ২০২১-২২ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য তিন গুণ বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৩ কোটি ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চীনের সঙ্গেও বাণিজ্য বাড়বে। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশে আপাতত চীনের কোনো বিকল্প নেই বলেও তাদের দাবি। এক দশক পর ২০২১-২২ অর্থবছরে চীন থেকে ১ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। একই সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পণ্যের অর্থমূল্য ছিল ৬৮ কোটি ডলার। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরেও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই)।
২০১৬ সালে দুদেশের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক সই হয় সেটির আওতায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ট রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় এরই মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। আরো সাড়ে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। ২০২৬ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোয় বিনিয়োগ আসতে পারে আরো সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। কর্ণফুলী টানেল পার্শ্ববর্তী চীনা অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চলে আগামী বছর থেকেই বড় ধরনের চীনা বিনিয়োগের আশা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। অঞ্চলটিতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, সৌর ব্যাটারি, সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানসহ সম্ভাবনাময় কিছু প্রকল্প হবে। চীন শুধু বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক অংশীদারই নয়, চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানির গন্তব্য বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশের উদ্বেগ সত্ত্বেও বাংলাদেশকে দুটি অত্যাধুনিক সাবমেরিন দিয়েছে চীন।
বাংলাদেশ সরকার চীনকে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ, পদ্মা সেতু নির্মাণে কারিগরি সহায়তা, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে সহায়তা, কোভিডকালীন সিনোফার্ম ভ্যাকশিন সহায়তাসহ চীন সর্বদা বাংলাদেশের পাশে থেকেছে। গত মে মাসে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন খাতে বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও হাই-টেক সহযোগিতা জোরদার করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
চীন এ অঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধির জন্য তিস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ঋণ হিসেবে এক বিলিয়ন ডলার দেবে বলে অঙ্গীকার করেছে তারা। অবশ্য তিস্তা চুক্তি নিয়ে দিল্লির সঙ্গে বোঝাপড়ার বিষয়টি ঝুলে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে পানির প্রবাহ বাড়াতে ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন’ নামক ওই প্রকল্প প্রস্তাব করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রায় আট হাজার কোটি টাকার ওই প্রকল্প এখনো ফিজিবিলিটি স্ট্যাডির পর্যায়ে রয়েছে, যা চীন বিনা পয়সায় করে দিচ্ছে।
চীনকে পাশে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে সম্প্রতি ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক তিন বামপন্থি দলের নেতারা চীন সফরে যান। জবাবে চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পশ্চিমা হস্তক্ষেপ তারা পছন্দ করছে না।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনীতির সমীকরণ দিনে দিনে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্কের ক্রমেই নিবিড়করণ বিশ্বের অনেক পরাশক্তি ভালোভাবে দেখছে না। তবে শেখ হাসিনা জানেন কীভাবে দ্বিমত পোষণের মধ্যেও সবচেয়ে ভালো মতটি গ্রহণ করা যায়। বিশ্ব রাজনীতিতে আগামী ৭-৮ বছরের মধ্যে চীন সুপার পাওয়ার হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে পারে বলে অনেক আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ মনে করেন। হতে পারে তখন বঙ্গবন্ধু তনয়ার সিদ্ধান্তের যথার্থতা বিশ্ব বুঝতে পারবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হওয়া মানে বাংলাদেশে চীনের আসন আরো মজবুত হওয়া। আর প্রতিবেশী বন্ধু দেশ ভারতও কখনোই চাইবে না যে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাক। ভারতও তাই বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন নীতিতে অনেকটা কৌশলী ভূমিকা নিয়েছে। বাংলাদেশ যেমন মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়াডে যোগ না দিয়ে চীন, রাশিয়ার কাছে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে পশ্চিমাদের কাছে বাংলাদেশকে মুক্তবিশ্বের একটা গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচয় করে দিয়েছে। তবে শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা। এ চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে পারলেই দক্ষিণ এশিয়ায় এমন কোনো রাজনৈতিক শক্তি নেই যে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারে।
তাই আমরা বলতে পারি, ‘সুনীল সাগরের বুকে উদ্বেলিত প্রফুল্ল যেমন জল, তেমনি মুক্ত হৃদয় শেখ হাসিনার সীমানাহীন চিন্তার দল’। সীমাহীন এই চিন্তাকে নিয়ে এ দেশের মানুষ এগিয়ে যাবে পরস্পরের হাতে হাত রেখে। বাংলাদেশের জয় হোক শেখ হাসিনার হাত ধরে, দুইয়ের সম্মীলনে গড়ে উঠুক নতুন এক ইতিহাস।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
"




































