রায়হান আহমেদ তপাদার
মতামত
নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গুরুত্ব দিতে হবে

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে মানুষ এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। ফলে সামাজিক গণ্ডি ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছে। অথচ সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের রয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতা, এই দায়বদ্ধতাই তাকে করেছে সৃষ্টির সেরা। অনেক মানুষের সম্মিলিত পরিশ্রমে গড়ে ওঠা সভ্যতায় আমরা সভ্য হয়েছি। এত কিছু ভোগ করার পর খুব স্বাভাবিকভাবে সমাজের জন্য আমাদের অনেক কিছু করার থাকে। এ ভাবনাটাই সামাজিক দায়বদ্ধতার মূল উপজীব্য বিষয়। সমাজের এবং দেশের একজন সুনাগরিক হতে হলে সমাজের প্রতি রয়েছে দায়দায়িত্ব বা কর্তব্যবোধ। একজন সুনাগরিক শুধু নিজের জন্য বা নিজের ভালোর জন্য চিন্তা করেন না, শুধু নিজের অগ্রগতি কিংবা উন্নতি নিয়ে চিন্তা করে না বরং নিজের অগ্রগতির পাশাপাশি সমাজের অন্য মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালান। পুরো সমাজকে এগিয়ে নিতে, উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে চেষ্টা করেন। সমাজের নাগরিক হিসেবে সেই সমাজের প্রতি আমাদেরও রয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। টেকসই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) বর্তমান বিশ্বে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা হলো এক ধরনের ব্যবসায়িক শিষ্টাচার বা নীতি, যা সমাজের প্রতি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে ব্যবসার নিয়মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। একটি ব্যবসা নৈতিক ও আইনগতভাবে পরিচালিত হলেই এর সব দায়মুক্তি হয়েছে তা বলা যায় না। যে পরিবেশে বা যে সমাজে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, সেই সমাজের প্রতি প্রতিষ্ঠানের কিছু দায়বদ্ধতা জন্মায়। বর্তমান যুগে বিশ্বের অধিকাংশ বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই সিএসআর বা সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করছে। এটিকে একটি মানবহিতৈষী বা মানবকল্যাণের নীতি হিসেবে উল্লেখ করা যায়।
বিশ্ব অর্থনীতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ও ব্যবসা-বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে আরো সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও মানবিক রূপ দেওয়ার জন্য সিএসআর বাস্তবায়নে বিশেষ তাগিদ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সামাজিক দায়বদ্ধতাও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত বিষয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা হলো এক ধরনের ব্যবসায়িক শিষ্টাচার বা নীতি, যা সমাজের প্রতি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে ব্যবসার নিয়মের মধ্য অন্তর্ভুক্ত করে। বর্তমান যুগে অধিকাংশ বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই সিএসআর বা সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করছে এবং তাদের শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশের কিছু অংশ এই খাতে বরাদ্দ রাখছে। সিএসআর বর্তমান বিশ্বে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুদান। এটি হলো এক ধরনের ব্যবসায়িক শিষ্টাচার-রীতি বা দায়বদ্ধতা, যা সমাজের প্রতি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে বুঝিয়ে থাকে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যব্যবহার্য সব পণ্যের দাম বেড়েছে এ কথা সত্য। কিন্তু হঠাৎ করে কিছু জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে কোনো না কোনো কারণ অবশ্যই আছে বা থাকে, যা খোঁজে বের করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর-ই বর্তায়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, সবটা নিয়ন্ত্রণ করা আসলে সম্ভবও নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা আসলে তাই, কেননা দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। এরপর ভোক্তা অধিদপ্তরের ভিডিও ক্লিপ জনমানুষের সামনে আসে। সেখানে দেখা যায় অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতেনাতে ধরে জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু আদতে এ অভিযানের ফলে বাজার ব্যবস্থার কোনো উন্নতি ঘটছে কি? সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে হাজার হাজার টাকা পকেটস্থ করা শুধু আইনবহির্ভূতই নয়, বরং অনৈতিকও বটে।
সমাজের প্রচলিত ধারণা হলো ব্যবসার একমাত্র এবং শুধু উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন করা। প্রখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ্যার জনক অ্যাডাম স্মিথ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপারে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তার মতে, প্রত্যেকে যদি নিজের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয় তবে সামগ্রিকভাবে সমাজের সবাই উপকৃত হবে। ব্যক্তিস্বার্থ আর সমাজের স্বার্থকে সমন্বয় করতে তিনি অদৃশ্য হাত তত্ত্বের অবতারণা করেন। অর্থনীতিশাস্ত্রে এ অদৃশ্য হাত তত্ত্ববহুল চর্চিত। অ্যাডাম স্মিথ এ অদৃশ্য হাতের মাধ্যমে বাজারব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এ অদৃশ্য হাতের মাধ্যমে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বর্তমান বাজারে অদৃশ্য হাতের বিপরীতে কালো হাতের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পরিবর্তে একচেটিয়া বাজার বিরাজমান। নিত্যপণ্য সবকিছুর হঠাৎ বেড়ে যাওয়া দামের এ প্রেক্ষাপটে সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিসের দাম বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু এ দামে বাজারে পণ্য বিক্রি হচ্ছে না। সমস্যার সমাধান হয়তো রাতারাতি মিলবে না। কেননা অসাধু ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া বাজার দখলের ফলে ক্রেতারা ব্যবসায়ীদের কাছে একপ্রকার জিম্মি। বিরাজমান এ সংকট মোকাবিলায় ব্যবসা নীতিবিদ্যা নামক বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। জ্ঞানের পৃথক শাখা হিসেবে ব্যবসা নীতিবিদ্যার যাত্রা গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে। ব্যবহারিক নীতি বিদ্যার শাখা হিসেবে গত কয়েক দশকে ব্যবসা নীতিবিদ্যা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে বিস্তর। যদিও ব্যবসা ও নীতিবিদ্যাকে আপাতদৃষ্টিতে বিরোধাত্মক বলে প্রতীয়মান হয় কিন্তু উত্তর-আধুনিক সময়ের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে টেকসই সমাজের জন্য টেকসই ব্যবসার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আর টেকসই ব্যবসা তখনই সম্ভব যখন ব্যবসা ও নীতিবিদ্যা পাশাপাশি সহাবস্থান করবে। ব্যবসা নীতিবিদ্যা বলতে সাধারণ অর্থে ব্যবসা-সংক্রান্ত বিষয়াদির নীতিবিদ্যক আলোচনাকে বোঝায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবসা নীতিবিদ্যা হলো প্রায়োগিক নীতিবিদ্যার একটি বিশেষ শাখা, যেখানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত মানুষের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির ঔচিত্য-অনৌচিত্য, ন্যায়ত্ব-অন্যায়ত্ব, ভালোত্ব-মন্দত্ব প্রভৃতি মূল্যায়ন করা হয়। অর্থাৎ ব্যবসার ক্ষেত্রে ভালো ব্যবস্থাকে গ্রহণ ও মন্দ ব্যবস্থাকে বর্জন করাই ব্যবসা নীতিবিদ্যা। সঠিক মাপে পণ্য দেওয়া, ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করা, ক্রেতার সঙ্গে উত্তম আচরণ করা প্রভৃতি বিষয়ও ব্যবসা নীতিবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক থিওডর লেভি বলেন, ব্যবসায়ের শুধু একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা হলো ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি ব্যবহারিক আদর্শ যেমন সততা, উত্তম বিশ্বাস প্রভৃতির ওপর গুরুত্ব প্রদান করবেন। নীতিবিদ্যার ধ্রুপদি তত্ত্বগুলো পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে ব্যবসায় সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতাকে ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন : নৈতিকতার অন্যতম একটি আলোচনার বিষয় উপযোগবাদ। ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল ও জেরেমি বেন্থাম এ তত্ত্বের প্রবক্তা। উপযোগবাদী তত্ত্ব অনুসারে সমাজে এমন কাজ পরিচালনা করা উচিত যেন অধিকসংখ্যক মানুষের সর্বোচ্চ পরিমাণ সুখ নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু বর্তমানে ব্যবসার ক্ষেত্রে উপযোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে শুধু আত্মস্বার্থমূলক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়। সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে উপযোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ব্যবসা পরিচালনা করলে অধিকাংশ মানুষ উপকৃত হবে। কিছু জিনিসের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিতে লাভবান হয়েছে গুটিকয়েক লোক অথচ উৎপাদনকারী এবং ভোক্তার হয়েছে লোকসান। এ ব্যাপারে অধিকারবিষয়ক নৈতিক তত্ত্ব বলছে, সমাজে আইনি অধিকার সম্পর্কে আমরা অবহিত থাকলেও নৈতিক অধিকার সম্পর্কে খুব একটা অবগত নই। সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি আইনি ও নৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই জনসাধারণের অধিকারকে ক্ষুণ করেছে।
ইউরোপের জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের নীতিদর্শন অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের কিছু নৈতিক দায়িত্ব ও অধিকার রয়েছে। কান্টের অধিকার-সংক্রান্ত মত বিশ্লেষণ করে আমেরিকার সান্তা ক্লারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা নীতিবিদ্যার অধ্যাপক ম্যানুয়েল জি ভেলাসকুয়েজ যে ধরনের অধিকারকে চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে সত্য জানার অধিকারটি অধিকতর প্রাসঙ্গিক। সত্য জানার অধিকার মতে, আমাদের প্রত্যেকের সত্য জানার অধিকার রয়েছে। ব্যবসার ক্ষেত্রে ভোক্তার রয়েছে পণ্যের গুণগত মান ও মূল্যবিষয়ক সত্য জানার অধিকার। অথচ বাজারে হঠাৎ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে ভোক্তার কাছে সঠিক কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয় না। সর্বোপরি বলা যায়, বর্তমানে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিজনিত সংকট মোকাবিলায় নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সবাইকে নৈতিক ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে কাজ করতে হবে। কেননা আমাদের ভুললে চলবে না যে মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাসরত প্রত্যেক মানুষের অন্যের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। ব্যবসার ক্ষেত্রে মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। সমাজে যে নিজেদের একটা দায়িত্ব আছে, সে বিষয়ে কেউ ভাবতে চায় না। মানুষ তার সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা ক্রমেই ভুলে যাচ্ছে। ব্যক্তি হিসেবে আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। সামাজিক দায়বদ্ধতা মানুষের একটি সহজাত গুণ। তাই বিপদে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ যেন হাতছাড়া না করি আমরা। একজনের বিপদে অন্যজনকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সমাজের ও দেশের একজন সুনাগরিক হতে হলে সমাজের প্রতি আমাদের যেসব দায়-দায়িত্ব রয়েছে, তা পালন করতে হবে। সমাজকে এগিয়ে নিতে, উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে চেষ্টা করতে হবে। সবাই যার যার বিবেক জাগ্রত রেখে কাজ করে যেতে পারলে সমাজের উন্নতি হবে।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
"




































