মো. জিল্লুর রহমান
বিশ্লেষণ
সমন্বিত গ্রাম উন্নয়নই উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি

তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্স হলো এ দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। কিন্তু মোট জনশক্তির ৪০ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত এবং গার্মেন্ট ও প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বিশাল অংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অথচ জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান মাত্র ১৬ শতাংশ। অন্য দিকে কৃষি শ্রমশক্তির বিরাট একটি অংশ মাইগ্রেশন করে কৃষি থেকে শিল্প ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত আছে। তাদের যদি গ্রামীণ অর্থনীতির বহু ক্ষেত্র যেমন- হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ, পশুপালন, দুগ্ধখামার, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রভৃতি কাজে লাগিয়ে পল্লী উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যায়, তবে এটি জাতীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখে। তাই পরিকল্পিত পল্লী উন্নয়ন শুরু হলে গ্রামের অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে এবং তার ফলে কৃষির আধুনিকায়ন সম্ভবপর হবে যার সুফল শিল্প-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে পড়বে। পল্লী উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষির উন্নতি হলে দেশের মোট জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাবে এবং জনসাধারণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। তাই গ্রামীণ উন্নয়নকে বাদ দিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না।
সাধারণ অর্থে গ্রাম বা পল্লী উন্নয়ন বলতে পল্লীর জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নকে বুঝায়। ব্যাপক অর্থে পল্লী উন্নয়ন বলতে পল্লী এলাকার জনগণের জীবন ধারণের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা বিজ্ঞানসম্মত কারিগরি দিকগুলোর কাক্সিক্ষত পরিবর্তনকে বুঝায়। প্রচলিত ধারায় পল্লী উন্নয়ন কৃষি ও বনের মতো প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও শহরাঞ্চলের উত্তরোত্তর পরিবর্তনের ফলে গ্রাম্য এলাকার বৈশিষ্ট্যাবলি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সম্পদের বিচ্ছুরণ ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষিজ সম্পদের পরিবর্তে পর্যটন, উৎপাদক এবং বিনোদন ব্যবস্থা স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। তবে সচরাচর পল্লী উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থানীয় অথবা আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ, আঞ্চলিক উন্নয়ন সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা, সরকার ব্যবস্থা অথবা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংগঠনের মাধ্যমে শীর্ষ থেকে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত প্রয়োগ করা হয়। তারপরও স্থানীয় জনসাধারণ উন্নয়নের ধারায় সম্পৃক্ততার লক্ষ্যে নিজস্ব পরিকল্পনাও গ্রহণ করতে পারে।
পল্লী উন্নয়নের উদ্দেশ্যাবলি হিসেবে গ্রামীণ জীবনধারার সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে সম্পৃক্ত করার পথ খোঁজা ও গ্রামীণ এলাকায় অবস্থান করে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা। বহিরাগত কোনো ব্যক্তি খুব সহজেই এলাকার অবস্থা, সংস্কৃতি, ভাষা ও অন্যান্য অতি প্রচলিত বিষয়বস্তুর সঙ্গে নিজের অবস্থান মেলে ধরতে পারেন না। কিন্তু সাধারণ মানুষ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে তাদের উপযোগী কৌশল গ্রহণে খুব সহজেই সম্পৃক্ত হতে পারে। নেপাল, ভারত, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গৃহীত সমন্বিত উন্নয়ন কৌশল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষিত হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনেক কলা-কৌশল ও চিন্তাধারা পল্লী উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়েছে।
পল্লী উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব শর্ত হলো গ্রামীণ শিক্ষার উন্নয়ন। পল্লীর জনগণকে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে সচেতন করে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যেমন সম্ভব, তেমনিভাবে পল্লী উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে কুটিরশিল্প, সেলাই ও হাতের কাজের প্রকল্প স্থাপন, মাছ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু চাষের ব্যবস্থা করা যায়। এ ধরনের কার্যক্রম সফল হলে গ্রামীণ জনগণের আয় বৃদ্ধি পায় এবং টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
পল্লী উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দ্বারা একশ্রেণির উদ্যোগী ও দক্ষ কর্মী বাহিনী সৃষ্টি করা যায়। এতে করে গ্রামীণ স্থানীয় সমষ্টির সমাধান করা যায়। পল্লী উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে গণশিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে নিরক্ষরতা দূর করে শিক্ষার প্রসার ঘটানো সম্ভব। গ্রামীণ এলাকায় বিভিন্ন সমবায় সমিতি, ক্লাব গঠন কিংবা জনকল্যাণমূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে মাসিক স্বল্প হারে চাঁদা আদায়ের ব্যবস্থা করলে পরবর্তী সময়ে তা বড় অঙ্কের টাকায় রূপান্তরিত হবে। যা গ্রামীণ উন্নয়নে ভূমিকা পালন করতে পারে।
পল্লীর সুষম উন্নয়ন হলে পল্লীর অনেক অব্যবহৃত ও প্রাকৃতিক জনসম্পদ সুষ্ঠুভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে দেশের জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। দেশের পল্লী উন্নয়ন দেশের শিল্পায়নকেও প্রভাবিত করে। পল্লী উন্নয়নের ফলে কৃষির উন্নতি হলে কাঁচামালের জোগান বাড়ে। কৃষকের আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে শিল্পজাত পণ্যের বাজার বিস্তৃত ঘটে। এতে করে দেশের শিল্প-উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়। পল্লী উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষির উন্নতি সাধিত হলে আমাদের রপ্তানি বৃদ্ধি পায় এবং আমদানি হ্রাস পায়। ফলে দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্যের প্রতিকূলতা হ্রাস পায়। পৃথিবীর অনেক দেশ পল্লী উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বেকার সমস্যা একটি জাতীয় সমস্যা। এ বেকারত্ব দূর করতে হলে পল্লী উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ শিল্পের উন্নতি ও পল্লী অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও হালকা শিল্পের ব্যবহার করে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। পল্লী উন্নয়নের লক্ষ্যে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে ফলন বৃদ্ধি করতে হবে। পল্লী উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নত বীজ, সার, প্রয়োজনীয় কীটনাশক এবং সেচের ব্যবস্থা করলে কৃষির ফলন কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।
উন্নয়নশীল অনেক দেশেই বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হলো কৃষি তথা পল্লী অঞ্চল। রপ্তানিযোগ্য কৃষি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করে রপ্তানি বাড়ানো। এরই মধ্যে বাংলাদেশ প্রমাণ করছে চিংড়ি, শাকসবজি ইত্যাদি রপ্তানির যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে কৃষি ও পল্লী উন্নয়নের মাধ্যমে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। কোনো দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বীকৃতি দিতে চাইলে সে দেশে এই সার্বিক অবস্থার উন্নয়ন আবশ্যক। আর যেহেতু বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান দেশ, তাই গ্রামীণ সার্বিক উন্নয়ন যেমন- বেকারত্ব দূরীকরণ, শিক্ষার প্রসার গ্রামীণ উন্নয়ন প্রভৃতির মাধ্যমে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সাধন করা যাবে।
ব্রিটিশ আমল হতে বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের জন্য নানাবিধ পরিকল্পনা কর্মসূচি হাতে নেওয়া সত্ত্বেও পল্লীর কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হচ্ছে না। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায় ৬০ দশকে কুমিল্লা মডেল, ৬০ দশকে আরেকটি সবুজ বিপ্লব, ৭০ দশকে স্বনির্ভর আন্দোলন কর্মসূচি হলো সরকার কর্তৃক গৃহীত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির অন্যতম। কিন্তু তবুও পল্লী উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়নি। যদিও সরকার গ্রাম উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এর অংশ হিসেবে তৃতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচি’। এর আগে দুই পর্যায়ের সফলতার পর তৃতীয় ধাপের বাস্তবায়ন চলছে। এ পর্যায়ে দেশের সব জেলার ১৬২টি উপজেলায় ১০ হাজার ৩৫টি গ্রামে কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে গ্রামভিত্তিক একক সমবায় সংগঠনের আওতায় ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করা হচ্ছে।
এ ছাড়া একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত সমবায় সমিতি ভিত্তিক একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিকল্পনা। এই প্রকল্পটির আওতায় গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিক ইউনিট হিসেবে তৈরি করার মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি ২০০৯ সালের জুলাই মাসে গ্রহণ করা হয় এবং এটি ৬৪ জেলার ৪৯০ উপজেলার ৪ হাজার ৫০৩টি ইউনিয়নের ৪০ হাজার ৯৫০টি গ্রামে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০২০ সালের মধ্যে দেশে দরিদ্রতার হার ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল কিন্তু করোনা মহামারির কারণে এটি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সমন্বিত গ্রাম উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিটি বাড়িকে অর্থনৈতিক কার্যাবলির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াসে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অন্য দিকে, একটি বাড়ি একটি খামার শীর্ষক প্রকল্পটি দেশের গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করা, তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ নারীর ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখছে। এ ছাড়া গ্রাম সংগঠন সৃজন, তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান, তহবিলের জোগান এবং ঋণদানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনেও এটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। আর এ কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং তাদের সঞ্চয় ও অর্জিত লেনদেন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঋণ ও অগ্রিম প্রদান এবং বিনিয়োগের জন্য সরকার বিশেষায়িত পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। এ ব্যাংকটি দেশের সব জেলা-উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে সমিতিভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জাতিসংঘের এ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) পৌঁছানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের ব্যাপক প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত উদ্দেশ্যগুলো সমন্বয় ও ভিন্ন ভিন্ন অংশীদারদের মধ্যে বিদ্যমান পরিকল্পনাগুলো একত্রিত করে স্থানীয় সরকার এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্য দিকে, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার কার্যকর গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান এবং কার্যকর গণতন্ত্র সুশাসন নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত। প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র তখনই কার্যকর, যখন সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগণসহ সব মানুষ রাষ্ট্রের শাসন প্রক্রিয়ায় অংশ নেন এবং তারা প্রশ্ন করার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষমতা রাখে।
সরকারের আওতাধীন বিআরডিবি, বার্ড ও আরডিএর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রামমুখী কর্মকা-েই মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে। এ ক্ষেত্রে আমরা হয়তো কিছু দারিদ্র্য কমাতে পেরেছি কিন্তু চরম দারিদ্র্য ও আয় বৈষম্য কমাতে পারিনি। এই চরম দারিদ্র্য ও বৈষম্য না কমাতে পারলে কোনো উন্নয়ন টেকসই হবে না এবং তখন মধ্যম আয়ের দেশের লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে। তাই পল্লী উন্নয়নের মাধ্যমেই আমাদের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট
"




































