মো. আরাফাত রহমান

  ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বিশ্লেষণ

জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহার ও নতুন সম্ভাবনা

জৈবপ্রযুক্তি হলো বৈজ্ঞানিক এবং প্রকৌশলগত নীতি অনুসরণ ও প্রয়োগ করে জীবদের ব্যবহার করার মাধ্যমে মানুষের জন্য কল্যাণকর ও ব্যবহারযোগ্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি তৈরির বিশেষ প্রযুক্তি। এটি মূলত জীববিদ্যাভিত্তিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে যখন প্রযুক্তি কৃষি, খাদ্য বিজ্ঞান এবং ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত হয়। ১৯১৯ সালে হাঙ্গেরীয় কৃষি প্রকৌশলী কারোই এরাকি সর্বপ্রথম শব্দটি ব্যবহার করেন। জাতিসংঘের কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি অনুসারে জৈবপ্রযুক্তিক হলো যেকোনো ধরনের প্রায়োগিক প্রাযুক্তিক কাজ, যা জৈবিক ব্যবস্থা, মৃত জৈবিক বস্তু অথবা এর থেকে প্রাপ্ত কোনো অংশকে ব্যবহার করে কোনো দ্রব্য বা পদ্ধতি উৎপন্ন করে বা পরিবর্তন করে যা বিশেষ ব্যবহারের জন্য ব্যবহৃত হয়।

যদিও কৃষিকাজে জৈবপ্রযুক্তি বহুকাল থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে, তবুও উদ্ভিদের চাষাবাদে এর আধুনিকতম প্রয়োগ দেখা যায়। নব্যপ্রস্তর যুগের নবোপলীয় বিপ্লবের পর থেকেই কৃষিকে খাদ্য উৎপাদনের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়। আধুনিক যুগের কৃষকরা শ্রেষ্ঠ বীজ নির্বাচন ও ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ফলন ঘটিয়ে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করছে। যখন শস্য ও জমির পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পেয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল, তখন এমন কিছু জীব এবং তাদের থেকে উৎপন্ন পদার্থের সন্ধান পাওয়া যায়, যারা মাটির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি করে, নাইট্রোজেন সংবদ্ধকরণ করে এবং ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমন করে। কৃষির ইতিহাসে দেখা যায়, কৃষক ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন উদ্ভিদের সঙ্গে কোনো উদ্ভিদের প্রজনন ঘটিয়ে উদ্ভিদের জিনে কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে জৈবপ্রযুক্তির প্রাথমিক রূপ উন্মোচন করেছেন।

বিয়ারের গাঁজনও আদিম জৈবপ্রযুক্তির একটি উদাহরণ। এই পদ্ধতিগুলো মেসোপটেমিয়া, মিসর, চীন এবং ভারতে প্রচলিত ছিল এবং পদ্ধতিগুলোর জীব বৈজ্ঞানিক মূলনীতিগুলো এখনো একই রয়েছে। ১৮৫৭ সালে লুই পাস্তুরের গাঁজনবিষয়ক কাজের আগে এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কিছু বোঝা না গেলেও এটিই একপ্রকার খাদ্যকে অন্য প্রকার খাদ্যে রূপান্তরকারী জৈবপ্রযুক্তির প্রাথমিক রূপ। গাঁজন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের কার্বো-হাইড্রেট ভেঙে অ্যালকোহল উৎপন্ন হয়। অনেক বছর ধরে মানুষ শস্য এবং প্রাণীর উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এই পদ্ধতিতে প্রত্যাশিত উন্নত বৈশিষ্ট্যধারী জীবের মিলনে সৃষ্ট সন্তান একই বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ, এই পদ্ধতি ব্যবহার করে বৃহত্তম ও সর্বাধিক মিষ্টি ভুট্টা উৎপাদন করা হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞানীরা অণুজীব সম্পর্কে অনেক তথ্য লাভ করতে থাকেন এবং পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

১৯১৭ সালে চাইম ওয়াইজম্যান বাণিজ্যিক কর্মকা-ে প্রথম বিশুদ্ধ অণুজীব কালচারের প্রয়োগ করেন। তিনি Clostridium acetobutylicum ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে ভুট্টার স্টার্চ প্রক্রিয়াজাত করে অ্যাসিটোন উৎপাদন করেছিলেন। জৈবপ্রযুক্তি অ্যান্টিবায়োটিকের উন্নতিতেও ব্যবহৃত হয়েছে। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯২৮ সালে পেনিসিলিয়াম মোল্ড আবিষ্কার করেন। তার কাজ হাওয়ার্ড ফ্লোরি, আর্নস্ট বোরিস চেইন এবং নরম্যান হিটলিকে পরিচালিত করে পেনিসিলিন উদ্ভাবনের দিকে। ১৯৪০ সাল থেকে পেনিসিলিন মানুষের দেহে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ নিরাময়ে ব্যবহার হয়ে আসছে।

আধুনিক প্রজননবিদ্যার জ্ঞান, জীবজসারের মতো নতুন ধরনের সারের প্রয়োগ ও জৈব-কীটনাশকের মতো নতুন কীটনাশক দ্বারা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির চিরাচরিত পদ্ধতি, উদ্ভিদের টিস্যু-কালচার ও মাইক্রোপ্রপাগেশন প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি উৎপাদনক্ষম বা বিশেষ জৈব রাসায়নিক শক্তিধর অণুজীব পৃথকীকরণ ইত্যাদি প্রচলিত জীবপ্রযুক্তির অন্তর্গত, যেখানে ডিএনএর কৌশলী প্রয়োগ জড়িত নয়। পুনর্বিন্যস্ত ডিএনএ ভিত্তিক জীব প্রযুক্তি, যেমন ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ সৃষ্টি, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগির টিকা উদ্ভাবন, জীবতাত্ত্বিক চিকিৎসাগত উপযোজনের জন্য ডিএনএ ভিত্তিক রোগনির্ণায়ক বিকারকের ব্যবহার ইত্যাদিতে ডিএনএ প্রয়োগ জড়িত বিধায় সেগুলো সমকালীন জীব প্রযুক্তির শ্রেণিভুক্ত।

বর্তমানে বাংলাদেশে জীবপ্রযুক্তির গবেষণা মূলত প্রচলিত পদ্ধতিতে স্বল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও কয়েকটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাণিজ্যিক সম্ভাবনাপূর্ণ বিধায় অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান চারাগাছের ব্যাপক উৎপাদনের জন্য টিস্যু-কালচার প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এতে আছে বেশকিছু অর্থকরী ফসল যেমন- আলু, কলা, পেঁপে, পাট, তুঁত, নিম এবং অর্কিডের মতো কিছু ভেষজ ও বাহারি গাছ। কয়েকটি মাত্র প্রতিষ্ঠানে, বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে, ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ফসলে বহিরাগত জিন স্থানান্তরের মাধ্যমে ট্রান্সজেনিক জীব সৃষ্টির সীমিত সুবিধা রয়েছে।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা কাউন্সিল স্পিরুলিনা উৎপাদন শুরু করেছে এবং বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান এগুলো ট্যাবলেট হিসেবে স্বল্প পরিমাণে বাজারজাত করছে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা কাউন্সিল উত্তরবঙ্গের চিনিকলগুলোতে উপজাত হিসেবে উৎপন্ন ঝোলাগুড় থেকে বেকারিতে ব্যবহৃত ইস্ট উৎপাদনের চেষ্টা করছে। আমাদের দেশে উৎপন্ন প্রায় এক লাখ টন ঝোলাগুড়ের প্রায় অর্ধেকই ডিস্টিলারিতে ইথানল উৎপাদনের জন্য লাগে। বাকি ৫০ হাজার টন ঝোলাগুড় ইস্ট উৎপাদনে ব্যবহৃত হতে পারে। এক টন শুষ্ক ইস্ট উৎপাদনের জন্য আনুমানিক পাঁচ টন ঝোলাগুড় প্রয়োজন অর্থাৎ বার্ষিক ১০ হাজার টন শুষ্ক ‘বেকার্স ইস্ট’ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশে যথেষ্ট পরিমাণ ঝোলাগুড় আছে। লক্ষণীয়, দেশে ইস্টের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪০০ টন।

বাংলাদেশে সংগৃহীত আলুবীজের টিস্যু-কালচার গবেষণার সম্ভাবনা উজ্জ্বল এবং এটা উদ্ভিদ-জীব প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আলু এখানকার একটি প্রধান খাদ্য, জন্মে সারা দেশেই, বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৮২ লাখ টন। বছরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন আলুবীজের প্রয়োজন সত্ত্বেও ভালো জাতের মানসম্মত বীজ দেশে পাওয়া যায় খুবই কম। এ আলুবীজ সাধারণ বংশবিস্তার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জন্মানো হয় আর অবশিষ্ট আলুবীজ আসে রান্নায় ব্যবহার্য আলু থেকে। আলুর ভালো ফলনের জন্য ভালো বীজ অত্যাবশ্যক। হিসাব করে দেখা গেছে যে, টিস্যু-কালচার থেকে পাওয়া রোগমুক্ত সবল বীজের মাধ্যমে আলুর ফলন দ্বিগুণ করা সম্ভব। এ উৎপাদন সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে টিস্যু-কালচারের মাধ্যমে আলুবীজ উৎপাদনে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখাচ্ছে।

সাধারণত টিস্যু-কালচার থেকে উৎপন্ন উদ্ভিদের সুবিধা হলো এ পদ্ধতিতে উৎপন্ন চারাগুলো সবল ও ভাইরাসরোগ থেকে মুক্ত বলে ভালো ফলন দেয়, যেজন্য নির্দিষ্ট কিছু ফসলের ক্ষেত্রে টিস্যু-কালচারের উৎপাদগুলোর ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হবে। এরই মধ্যে প্রায় এক ডজন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের টিস্যু-কালচার নিয়ে গবেষণা চলছে। একই সঙ্গে সম্প্রতি বেসরকারি খাতের কিছু কোম্পানিও গড়ে উঠেছে যেখানে উদ্ভিদের টিস্যু-কালচার জীব প্রযুক্তির পরিমিত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। জীববিদ্যাগত চিকিৎসাক্ষেত্রে জীব প্রযুক্তির কর্মকা- অপেক্ষাকৃত দুর্বল। এ খাতের অধিকাংশ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানই সেবা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত যেখানে গবেষণার সুযোগ স্বল্প।

চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তির প্রয়োগ দেখা যায়। এগুলো হচ্ছে স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্পে শস্য ও অন্যান্য পণ্যের (যেমন- জৈবিক উপায়ে পচনশীল প্লাস্টিক, উদ্ভিজ্জ তেল, জৈব জ্বালানি) ব্যবহার এবং পরিবেশ। অণুজীব দ্বারা জৈব পদার্থ প্রক্রিয়াজাতে জৈবপ্রযুক্তির প্রয়োগ হয়। আকরিক থেকে ধাতু নিষ্কাশনে ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহারও জৈবপ্রযুক্তির উদাহরণ। এ ছাড়া কোনো জিনিসকে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা, বর্জ্য শোধন, কল-কারখানা দ্বারা দূষিত এলাকা পরিষ্কার এবং জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

গোল্ড বায়োটেকনোলজি মূলত বায়োইনফরমেটিকসের ওপরে ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে যা জৈবপ্রযুক্তির একটি আন্তবিষয়ক ক্ষেত্র যেখানে জীববিজ্ঞানের সমস্যাগুলো দ্রুত সাজানো যায় এবং তথ্য বিশ্লেষণ করা যায় কম্পিউটারের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এটি অন্যান্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন- functional genomics, structural genomics and proteomics যা জৈবপ্রযুক্তি ও ওষুধশিল্পের মূল উপাদান তৈরিতে সাহায্য করে। ব্লু বায়োটেকনোলজি মূলত সামুদ্রিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে শিল্পক্ষেত্রে বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদনের ক্ষেত্র। গ্রিন বায়োটেকনোলজি জৈবপ্রযুক্তির সেই শাখা, যেখানে জৈবপ্রযুক্তি কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। যেমন- মাইক্রোপ্রোপাগেশনের মাধ্যমে একসঙ্গে অনেক উদ্ভিদ উৎপন্ন করা যায়। এ ছাড়া নির্দিষ্ট পরিবেশে বেড়ে ওঠার জন্য ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ তৈরি ও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধকারী এবং অধিক ফলনশীল উদ্ভিদ উৎপাদনের অন্তর্ভুক্ত।

রেড বায়োটেকনোলজি চিকিৎসা শাস্ত্র এবং ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত জৈবপ্রযুক্তি। এই শাখার অন্তর্গত কাজগুলো হলো টিকা ও অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি, বিভিন্ন থেরাপি, কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি, কৃত্রিম হরমোন তৈরি, স্টেম কোষ প্রভৃতি তৈরি। হোয়াইট বায়োটেকনোলজি শিল্প ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। ইয়োলো বায়োটেকনোলজি খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত জৈবপ্রযুক্তি। গ্রে বায়োটেকনোলজি পরিবেশে প্রয়োগ করা জৈব প্রযুক্তি। ব্রাউন জৈবপ্রযুক্তি শুষ্ক বা মরুভূমি এলাকার পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত জৈবপ্রযুক্তি। এ ক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বীজ উৎপাদন করা হয়, যা কঠিন প্রাকৃতিক সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে সক্ষম। ভায়োলেট বা বেগুনি জৈবপ্রযুক্তি জৈবপ্রযুক্তির আইনি, নৈতিক এবং দার্শনিক দিকগুলোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

লেখক : সহকারী কর্মকর্তা, ক্যারিয়ার অ্যান্ড প্রফেশনাল

ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস বিভাগ, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়