জি কে সাদিক

  ২৮ জুলাই, ২০১৯

বিশ্লেষণ

দক্ষিণ এশিয়ায় নয়া রাজনৈতিক সমীকরণ

চলমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটা আশাতীত পরিবর্তন হয়েছে। এদিকে যেমন নতুন করে শক্তিধর রাষ্ট্রের উত্থান হয়েছে, তেমনি অঞ্চলভেদে বেড়েছে আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি এবং বদলে গেছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিধারাও। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কর্যকারিতা হারাচ্ছে এবং সেই স্থানে আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর আবেদন বাড়ছে। একসময় যেমন ভাবা হতো যে, আধুনিক মানুষ ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে কিন্তু এখন আর সে সমীকরণ খাটছে না। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল ও আফগানিস্তানের রাজনীতিতে একদিকে যেমন বহিঃশক্তি নতুন মাত্রায় প্রভাব বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণও আগের তুলনায় অনেক বদলে গেছে। পুরাতন রাজনৈতিক শক্তিগুলো নানা কারণে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পিছিয়ে পড়ছে আর নতুন রাজনৈতিক শক্তি মাথাচাড়া দিচ্ছে; মাঠের রাজনীতিতে তাদের অবস্থানও ভালো।

ভারতে ১৭তম জাতীয় নির্বাচনের আগে একটা শক্ত সমীকরণ হয়েছিল যে, এবার ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পরাজিত হবে। কিন্তু এই শক্ত সমীকরণের স্বপক্ষে বিজেপির বিপক্ষ জোট নিজেদের শক্তিমত্তা নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বিশেষ করে বিজেপি নেতৃত্বের বিপরীতে সর্বজন আস্থাশীল নেতৃত্ব গড়ে উঠেনি। বিজেপির জয়ের নানা কারণ নিয়ে এরই মধ্যে গণমাধ্যমে অনেক আলোচনা হয়েছে। কথা হচ্ছে, বিজেপির জয় কোনো বিচ্ছিন্ন বা অনভিপ্রেত ঘটনা নয়। বরং উপমহাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যাওয়ারই একটা ধারাবাহিকতা মাত্র। এই পাল্টে যাওয়া রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনৈতিক দুভাবেই হয়েছে। আর বৈশ্বিক রাজনীতিতে লোকরঞ্জনবাদের যে উত্থান বিজেপির জয় তারই একটা লক্ষণ। উপমহাদেশে তথা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এখন আর আগের সমীকরণে নেই। এখন এই অঞ্চলে বৈশ্বিক রাজনীতির যে মেরুকরণ তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে অনেক ফারাক সৃষ্টি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে মানুষ আগের তুলনায় অধিকতর একমুখী চিন্তা করছে আর উগ্র-জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে। মানুষ রাজনৈতিক বৃহৎ স্বার্থে চাইতে স্বজাতি কেন্দ্রিক স্বার্থ বেশি দেখছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একদিকে যেমন বাহিরের অধিপত্যের শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উগ্র-জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব বাড়ছে। যেটা দীর্ঘ মেয়াদে আদর্শিক রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ধর্মীয় রাজনীতির ভেদ আরো শক্তিশালী হতে পারে। ফলে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়বে।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে দুটি দেশ ছিল প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীÑ ভারত ও পাকিস্তান। আর এই দুটি দেশ ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটা সমীকরণ দাঁড়িয়েছিল। গত শতকের ৫০ এর দশকে পাকিস্তান যোগ দেয় ইঙ্গ-মার্কিন জোটে। আর ভারত অনেকটা নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সঙ্গে থাকে। ইঙ্গ-মার্কিন জোটে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ নিয়ে সে সময় পাকিস্তানের পূর্বাংশ তথা বর্তমান বাংলাদেশে এর বিপক্ষে গড়ে উঠে আন্দোলন। যার মূল ভূমিকায় ছিলেন বেইজিংপন্থি কমিউনিস্ট নেতা মওলানা আবদুল হাদিম খান ভাসানী এবং এর বিরুদ্ধে তিনি করেছিলেন অনেক আন্দোলন ও প্রতিবাদ। মওলানা ভাসানী কখনো রাজনীতি করে ক্ষমতায় আসেননি। তিনি ছিলেন মূলত সাধারণ মানুষের পক্ষ হয়ে জনঅধিকার বিষয়ে আন্দোলন-প্রতিবাদের নেতা। তার এই চরিত্রের জন্য পেয়েছিলেন ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স’ খেতাব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়। পূর্বে পাকিস্তান সবসময় পূর্ব-পশ্চিম দুই দিক থেকে ভারতকে চাপের মুখে রাখতে চেষ্টা করত। কিন্তু ১৯৭১ সালে পরাজিত হওয়ার পর পাকিস্তান সেই আর আগের অবস্থানে নেই। মার্কিন প্রশাসনের কাছে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রীর বিপক্ষে পাকিস্তানের যে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিল সেই গুরুত্ব অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। পাকিস্তানের অন্যতম আরেক মিত্র রাষ্ট্র চীন। গত শতকের ষাটের দশকের আগে সোভিয়েত-চীন মৈত্রী ছিল আর তখন ভারত-চীনের সম্পর্ক ছিল ভালো। কিন্তু ষাটের দশকে সোভিয়েত-চীন দ্বন্দ্বের ফলে চীনা প্রশাসন আমেরিকার সঙ্গে নানা কারণেই সখ্যতা গড়ে তোলে আর সেই সুবাধে চীন-পাকিস্তানের মধ্যে সখ্যতা আরো প্রগাঢ় হয়। এর মূলে রাজনৈতিক আদর্শ ছিল না; এই বন্ধন সম্পূর্ণটাই ছিল ‘জিও পলিটিক্সের’ কারণে। আলোচনা থেকে আমরা দুটি বিষয় পেতে পারি। এক. দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে গত দশকের মানুষ বিশেষ সর্তক ছিল এবং এর সঙ্গে দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও তাদের ছিল বিশেষ ভূমিকা। দুই. দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অন্য অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন বিশ্বের পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকার অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একমাত্র ভারতবাদে অন্যরাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মর্জির ওপর অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যাওয়ার ফলে এই বলয়ের রাষ্ট্রগুলোর একদিকে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যেমন নিজেরা সমাধান করতে পারছে না, অন্যদিকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রও নষ্ট করে ফেলছে। আগে এই অঞ্চলের রাজনীতিতে আমেরিকার ভূমিকা ছিল বড়। এখন সেই স্থান দখল করে নিয়েছে চীন। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় যেমন ভালোর দিকে যাচ্ছে একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। ২০১৫ সালের পর থেকে নেপাল স্বীয় পররাষ্ট্রনীতির অতীত রেকর্ড ভেঙে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ায়। ২০১৭ সালে নেপালের নির্বাচনে চীনপন্থি বাম রাজনৈতিক দল জয়লাভ করে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার তামিল গেরিলাদের সহায়তা করার অভিযোগে ভারতে সঙ্গে শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক অনেক আগে থেকে মন্দ যাচ্ছিল। চীন শ্রীলঙ্কার গুরুত্বপূর্ণ হাম্বানটোটা বন্দরের ৭০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় চীনের অবদান ও ঋণ বেড়েছে। শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে চীন ভারতের চেয়ে বেশি প্রধান্য পাচ্ছে। পাকিস্তান অনেক আগে থেকেই চীনের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। বর্তমানে কাতারে চলমান আফগান শান্তি আলোচনা চলমান রয়েছে। গত জুন মাসে আফগান শান্তি আলোচনার জন্য তালেবানদের একটি প্রতিনিধিদল চীন সফর করে। এই শান্তি আলোচনায় চীন মূলত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখছে। স্বয়ং আমেরিকা প্রশাসনও চীনের এই মধ্যস্থতা মেনে নিয়েছে। গত ২৯ জুন ওসাকার জি-২০ সম্মেলনের এক ফাঁকে শি ও ট্রাম্পের মধ্যে এক বৈঠকে এ বিষয়েও আলোচনা হয়। ফলে আফগানিস্তানে আমেরিকার পর চীনের প্রভাব বাড়বে। ফলে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের ক্ষেত্রে আফগানিস্তান হবে গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্র। একইভাবে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপেও চীনের ঋণ সহায়তা প্রকল্প আগের তুলনায় বেড়েছে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে চীনের পছন্দ-অপছন্দ প্রভাব ফেলছে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাÑ সার্কÑ মৃত প্রায়। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের ফলে এই সংস্থাটি এখন মৃত। ফলে এই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সার্ক আগের মতো কাজ করতে পারছে না। যদি সার্ককে বাঁচিয়ে তোলার কোনো উদ্যোগ নেওয়া না হয় তাহলে সংস্থাটির মৃত্যু নিশ্চিত। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক সব সময়ই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে ভারত বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ায়নি। রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা নয়Ñ এটা আন্তর্জাতিক সমস্যা। কিন্তু এটা এখন দ্বিপাক্ষিক সমস্যার রূপ নিয়েছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হচ্ছে চীনের মর্জির ওপর। ফলে মিয়ানমারে চীনের প্রভাব আরো শক্ত হয়েছে এবং বাংলাদেশের ওপর চীনের প্রভাবও আগের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তুলনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাগুলোর আবেদন বৃদ্ধি পেয়েছে। কোন অঞ্চলের একটি দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সমস্যা নিরসনে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাগুলো যখন বিশেষ ভূমিকা রাখছে ঠিক সে মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলত মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করার জন্য বাংলাদেশকে চীনের ওপর নির্ভশীল হতে হচ্ছে। গত ১ জুলাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে আলোচনার টেবিলে রোহিঙ্গা সমস্যা আলোচনায় বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট যখন পুনরায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয় ২৯ আগস্ট নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফরে যান এবং কথিত সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের প্রতি শক্ত সমর্থন দেন।

গত ২৯ জুন ওয়াসাকার জি-২০ সম্মেলনে রাশিয়া-চীন-ভারত এই ত্রিদেশীয় রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে একটি ত্রিপাক্ষীয় বৈঠক হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন যে, এটা ছিল ভারতকে ‘ইউরেশিয়া ইন্ট্রিগেশন ট্রায়াঙ্গল রোড ম্যাপে’ এ ঢুকতে প্রলুব্ধ করা। এই প্রকল্পের নকশা করেছিলেন গত মাসে অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন আর্গানাইজেশন (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে শি ও পুতিন। ফলে আগামীতে চীন ও রাশিয়ার বিশ্বব্যাপী বাড়ন্ত প্রভাবে ভারত হবে দক্ষিণ এশিয়ার বড় আঞ্চলিক সহযোগী।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়