চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
পুশইনচেষ্টায় নারী-শিশু বিএসএফের ‘ঢাল’
* ১৬ দিনের ব্যবধানে ৪ বার পুশইনের চেষ্টা * বিজিবি-জনতা মিলে রুখে দিয়েছে অপচেষ্টা * ৬৪ জনের মধ্যে ৫২ জনই নারী ও শিশু

কাঁটাতারের সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দিতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবার বেছে নিয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও চতুর কৌশল। অস্ত্রের জোর বা পেশিশক্তি নয়- প্রকৃতির বৈরিতা ও মানুষের মানবিক দুর্বলতাকে হাতিয়ার বানিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। তবে বিএসএফের প্রতিটি চতুর ‘চাল’ নস্যাৎ করে দিয়েছে বিজিবি এবং সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষ।
চলতি বছরের ৪ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর ও শিবগঞ্জ উপজেলা সীমান্তে অন্তত চারবার বড় ধরনের অনুপ্রবেশের ছক কষে বিএসএফ। তবে প্রতিবারই বিজিবি ও স্থানীয় জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধে তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এই চার দফায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ৬৪ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত সবাইকে ভারতের অভ্যন্তরেই ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
অনুপ্রবেশের এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করে বিএসএফের বেশ কিছু নতুন ও চতুর কৌশল চিহ্নিত করা গেছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কৌশল ছিল পুশইনের শিকার হওয়া দলগুলোতে নারী ও শিশুদের ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করা। মোট ৬৪ জনের এই বহরে মাত্র ১২ জন পুরুষ থাকলেও বাকি ৫২ জনই ছিল নারী ও শিশু। বিএসএফ মূলত এটি করেছিল একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। তারা ভালো করেই জানত, কাঁটাতারের জিরো লাইনে একঝাঁক অবুঝ শিশু ও নারীকে দেখলে বিজিবি সহজে কঠোর হবে না। তীব্র ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে জিরো লাইনে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে বিজিবির নৈতিক অবস্থান দুর্বল করার এক চতুর চেষ্টা চালানো হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত ছিল সময় ও আবহাওয়ার কৌশলগত ব্যবহার। বিএসএফ প্রতিটি পুশইনের জন্য বেছে নিয়েছে গভীর রাত কিংবা ভোরবেলার মতো সংবেদনশীল সময়, যখন সাধারণ মানুষ ও বিজিবির টহলদল কিছুটা অসতর্ক থাকে। যেমন, গত ৪ জুন প্রথম বড় পুশইনের ঘটনাটি ঘটানো হয় ভোররাত ৩টার দিকে, যখন সীমান্ত এলাকায় প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। বিএসএফের ধারণা ছিল, এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নজরদারি দুর্বল থাকবে এবং সেই সুযোগে সহজে মানুষকে এপারে পার করে দেওয়া যাবে।
স্থলসীমান্তে সুবিধা করতে না পেরে বিএসএফ তাদের কৌশলের ‘রুট’ বদলে নদীপথেও অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়।
জেলার গোমস্তাপুরের রোকনপুর নদীসীমান্ত দিয়ে গভীর রাতে নৌকাযোগে নিঃশব্দে মানুষ পার করার ছক কষা হয়। এ কাজে তারা অর্থের বিনিময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের কিছু স্থানীয় দালাল ও মাঝির সঙ্গে গোপন আঁতাত গড়ে তোলে, যেন পুশইনের শিকার ব্যক্তিদের এপারে নামিয়ে দ্রুত দেশের ভেতরে লুকিয়ে ফেলা যায়। অবশ্য বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারিতে সেই পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়। এই অপকর্মের সহযোগী হিসেবে এরই মধ্যে সাত বাংলাদেশি দালালকে আটক করেছে পুলিশ ও বিজিবি।
এর পাশাপাশি প্রতিবারই যখন জিরো লাইনে বিজিবি অনড় অবস্থান নিয়েছে, তখন বিএসএফ পেছনে অতিরিক্ত সদস্য সমাবেশ ঘটিয়েছে, যা ছিল মূলত বিজিবিকে ভয় দেখানো ও চাপ সৃষ্টি করার একটি অপকৌশল।
৪ জুন ভোররাতের বৈরী আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে জেলার গোমস্তাপুরের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্ত দিয়ে ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী এবং ৬ শিশুসহ মোট ২৮ জনকে জোর করে ঠেলে দেয় বিএসএফ। বিজিবির বাধার কারণে তারা জিরো লাইনের খোলা আকাশের নিচে আটকে থাকে। দীর্ঘ সময় অমানবিক কষ্টের পর বিজিবির অনড় অবস্থান ও দুই দেশের কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকের ফলে বিএসএফ তাদের ভারতীয় সীমান্তে ফিরিয়ে নেয়।
এর ঠিক এক সপ্তাহ পর ১২ জুন মধ্যরাতে একই উপজেলার রোকনপুর সীমান্তের নদীপথে রাত পৌনে ১টার দিকে নৌকাযোগে ২ জন পুরুষ, ৮ জন নারী এবং ৫ শিশুসহ ১৫ জনকে এপারে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি সদস্যরা দ্রুত নদীতীরে অবস্থান নিলে প্রায় দুই ঘণ্টা জিরো লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত রাত পৌনে ৩টার দিকে পিছু হটে বিএসএফ।
একইভাবে ১৫ জুন রাত পৌনে ১১টার দিকে একই সীমান্ত দিয়ে এক নারীকে নদীপথে পুশইনের চেষ্টা চালানো হলে স্থানীয় গ্রামবাসী ও বিজিবি যৌথভাবে তা প্রতিহত করে। এ ঘটনায় বিএসএফকে সহায়তাকারী সাত দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সর্বশেষ ২০ জুন ভোর আনুমানিক ৬টা ৫০ মিনিটে জেলার শিবগঞ্জের চৌকা সীমান্তে ৫ জন পুরুষ, ১১ জন নারী এবং ৪ শিশুসহ ২০ জনকে পুশইনের চূড়ান্ত চেষ্টা চালায় বিএসএফ। এবার শুধু বিজিবি নয়, স্থানীয় গ্রামবাসীও লাঠিসোঁটা হাতে বিজিবির পাশে এসে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। জনতা ও বিজিবির এই নজিরবিহীন প্রতিরোধে অনুপ্রবেশকারীরা বাংলাদেশের মাটিতে পা ফেলার সাহস পায়নি। পরে তারা জিরো লাইন থেকে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
৫৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতিতে চলছে। বিএসএফের যে কোনো চতুর বা ধূর্ত কৌশল নস্যাৎ করতে বিজিবি এখন আরো আধুনিক ও কৌশলগত টহল জোরদার করেছে। সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে সীমান্তসংলগ্ন সাধারণ মানুষের দেশপ্রেম, যারা বিজিবির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে।’
১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, জেলার চারটি পুশইনচেষ্টার মধ্যে তিনটি তার ব্যাটালিয়নের আওতাধীন সীমান্ত এলাকায় ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনাই স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রতিহত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্ত এলাকায় সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে বিজিবি।’
এদিকে গত শনিবার শিবগঞ্জ সীমান্তে ২০ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। তবে বিজিবির কড়া হুঁশিয়ারি ও তীব্র বাধার মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। একপর্যায়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেলেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুই বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থানের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিজিবি সদস্যরা দৃঢ় অবস্থান নিয়ে বিএসএফকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, ‘এক পা-ও সরব না এখান থেকে। আপনারা আগে সরে যান, তারপর আমরা সরে যাব।’ বিজিবির এমন অনড় ও সাহসী অবস্থানের মুখে শেষ পর্যন্ত বিএসএফ পিছু হটে এবং পুশইনের চেষ্টা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
"








































