ভাঙ্গুড়া (পাবনা) প্রতিনিধি

  ২৬ নভেম্বর, ২০২১

ভাঙ্গুড়ায় ধর্ষণের ঘটনা ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় মীমাংসা

পাবনার ভাঙ্গুড়ায় পুত্রবধূকে (১৯) ধর্ষণের ঘটনা ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় আপস-মীমাংসা করার অভিযোগ উঠেছে। ভাঙ্গুড়া সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক টুকুন ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সুমন আহম্মেদ সালিসের মাধ্যমে এ ঘটনা মীমাংসা করেন। এই সময় উপস্থিত ছিলেন অভিযুক্ত শ্বশুরের পক্ষে মন্ডতোষ গ্রামের মহুরী শের মাহমুদ, আবু বক্কর, সাবেক ইউপি সদস্য সামাদ আলী ও ইদ্রিস মিয়া। ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত শ্বশুরের বাড়ি উপজেলার মন্ডতোষ গ্রামে। ওই গৃহবধূর নানার বাড়ি উপজেলার নৌবাড়িয়ায়।

ভুক্তভোগী ও তার নানার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই গৃহবধূ যখন ছোট ছিল সে সময় মায়ের সঙ্গে বাবার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এরপর ভাঙ্গুড়া সদর ইউনিয়নের কলকতি নানার বাড়িতে বেড়ে ওঠেন তিনি। ৮ মাস আগে উপজেলার মন্ডতোষ গ্রামের ওই বাড়িতে তার বিয়ে হয়। এরপর তিনি জানতে পারেন তার স্বামী আগের স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ করের। বিষয়টি নিয়ে স্বামীর সঙ্গে তার ঝগড়া চলছিল। এর কিছুদিন পর তার স্বামী কাজের জন্য ঢাকায় চলে যায়। এরপর থেকেই শ্বশুর তাকে বিভিন্নভাবে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। স্বামী না থাকায় গৃহবধূ নিজ ঘরে একাই থাকতেন। এ সুযোগে গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে এক দিন রাত ১২টার দিকে তার শ্বশুর তাকে ডাকাডাকি করলে তিনি দরজা খোলেন। এরপর তার শ্বশুর ঘরে ঢুকেই ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেন। এরপর পুত্রবধূকে ধর্ষণ করে। এ সময় গৃহবধূ চিৎকার দিলে শ্বশুর তার মুখ চেপে ধরে। গৃহবধূর ভাষ্যমতে ঘটনার দিন ঝড়ো আবহাওয়া থাকায় তার চিৎকার কেউ শুনতে পায়নি। এরপর ওই নারী কান্না করতে থাকলে তার শাশুড়ি স্বামীর পক্ষ থেকে তার পা ধরে ক্ষমা চান এবং এই ঘটনা কাউকে জানাতে নিষেধ করেন। এ সময় শ্বশুর তাকে প্রাণে মেরে ফেলার ভয় দেখান। ঘটনার তিন দিন পর শাশুড়ি কথিত এক কবিরাজকে বাড়িতে এনে ওই পুত্রবধূকে ওষুধ খাওয়ায়। এরপর তার শাশুড়ি তাকে উপজেলার বড়ালব্রিজ রেলস্টেশনে এক অপরিচিত যুবকের কাছে ট্রেনের টিকিটসহ রেখে আসে। ওই নারী কিছুটা সুস্থ হলে স্টেশনে কান্নাকাটি করতে থাকেন। আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে স্টেশনের পাশে তার এক দূর-সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে আসে। সেখান থেকে তিনি নানা বাড়িতে ফিরে গিয়ে ঘটনার বিস্তারিত পরিবারের লোকেদের জানান। পরে তিনি তার শাশুড়িকে ফোন দিয়ে ঘটনা কাউকে জানায়নি বলে তাকে নানা বাড়িতে আসতে বলেন। পরিবারের পরামর্শে তার ও শাশুড়ির কথোপকথন রেকর্ড রাখেন। তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে তার শাশুড়ি গৃহবধূর নানার বাড়িতে এলে তাকে ঘরে আটকে রাখা হয়।

অবস্থা বেগোতিক দেখে শাশুড়ি তার ভাইকে ঘটনা জানিয়ে তাকে উদ্ধার করতে বলেন। তার ভাই তখন মন্ডতোষ গ্রামের প্রভাবশালী শের-মাহমুদ, বক্কার, সাবেক ইউপি সদস্য সামাদ ও ইদ্রিসসহ বেশ কয়েকজন লোকজন নিয়ে ওই নারীর নানার বাড়িতে আসেন। সেখানে একটি সালিস বৈঠকে শ্বশুরকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ভাঙ্গুড়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেখানে উপস্থিত হয়। চেয়ারম্যান ধর্ষণের শিকার ওই নারীর কাছ থেকে ঘটনা শুনে মন্ডতোষ গ্রামের প্রধানদের গৃহবধূর শ্বশুরকে সালিসে হাজির করতে চাপ দিলে তিনি সেখানে উপস্থিত হয়। ঘটনা শুনে গ্রামবাসী উত্তেজিত হয়ে উঠলে সুযোগ বুঝে শ্বশুর সেখান থেকে পালিয়ে যান। পরে প্রভাবশালী শের মাহমুদ চেয়ারম্যান টুকুনের কাছে জরিমানার টাকা দেওয়ার কথা দিয়ে সালিস শেষ করে চলে যান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাঙ্গুড়া সদর ইউনিয়নের চেয়রম্যান গোলাম ফারুক টুকুন বলেন, ‘ওই ঘটনা শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আর কিছু বলার নেই।’

গৃহবধূর শ্বশুর মুঠোফনে বলেন, ‘প্রথমে সালিসে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সামর্থ্য না থাকার কথা সুমনের (উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি) কাছে জানালে তিনি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা করেন। ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা সুমনের কাছে দিয়েছি। বাকি ৩০ হাজার টাকা বাড়ি বিক্রি করে দেব।’

তবে এ বিষয়ে উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সুমন কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন।

ভাঙ্গুড়া থানার ওসি মু. ফয়সাল বিন আহসান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব?্যবস্থা নেওয়া হবে।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close