ফুলবাড়িয়া, হাতিরপুল

বাস রাস্তার পিচের নিচে রেললাইন

থাকছে না শেষ স্মৃতিচিহ্নটিও

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

রাজধানীর ফুলবাড়িয়ায় একসময় চলত ট্রেন। এখন যেখানটায় হাতিরপুল বাজার সেখানে সত্যিই ছিল পুল। সেই পুলের নিচ দিয়েই হাতি যেত হাতিরঝিলে। কিন্তু বাসওয়ালাদের দৌরাত্ম্যে আজ সে কথা মনেও করেন না অনেকে। সেই রেললাইন উপড়ে ফেলে করা হয়েছে বাসের রাস্তা। তবে শুধু কি রেললাইন, ভেঙে ফেলা হয়েছে রেলের বিভিন্ন স্থাপনাও। এখন ফুলবাড়িয়ায় রেলের শেষ স্মৃতিচিহ্ন মুছতে ভাঙা হচ্ছে ঢাকার প্রথম যাত্রীবাহী রেলওয়ের ভবনটি।

ইতিহাসবিদরা বলছেন, ১৮৮৫ সালের দিকে ঢাকায় প্রথমবারেরর মতো যাত্রীবাহী রেলওয়ে চালু করা হয়। স্টেশন স্থাপন করা হয় ফুলবাড়িয়ায়। আর্কাইভ ঘাঁটলে সে স্টেশনের ছবি এখনো দেখা যায়। কিন্তু শুধু স্টেশন নয়, আশপাশের বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল রেলওয়ে কমপ্লেক্স।

ইতিাসবিদ মুনতাসীর মামুনের মতে, জায়গার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ একর। স্টেশন ছাড়াও এখানে রেলওয়ে ওয়ার্কশপ, কর্মচারীদের কোয়ার্টারও ছিল।

ঢাকা ইতিহাস গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী হাশেম সুুফির তথ্য মতে, বর্তমান ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড, টেলিফোন ভবন, নগরভবন, পুলিশ সদর দফতর, গোটা ওসমানী উদ্যান, হাইকোর্টের একাংশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক হল ওই কমপ্লেক্সের জায়গায় নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখান থেকে ট্রেনলাইন সরিয়ে নেওয়া হয়। কমলাপুরে স্থানান্তরিত হয় স্টেশন। একইসঙ্গে ভবনগুলো পরিত্যক্ত বা অন্য কাজে ব্যবহার হতে থাকে। বর্তমান পর্যন্ত এসে টিকে আছে শুধু রেলওয়ে হাসপাতাল ভবনটি।

হাশেম সুফির মতে, খুব সম্ভবত ১৮৯০ সালের দিকে ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করে হাসপাতাল চালু করা হয়। লাল রঙের দ্বিতল ভবন ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন। ব্রিটিশরা রেলওয়ের সব স্থাপনায় লাল রং ব্যবহার করত। হাসপাতালটির ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। ভবন নির্মাণে লাল রঙের ১০ ইঞ্চি মাপের ইট ব্যবহার করা হয়। বিশেষ ইট তখন ভারতের বর্ধমান থেকে আনা হয়েছিল বলে জানান এ ইতিবাসবিদ। সব মিলিয়ে বেশ দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছিল ভবনটি। তার চেয়ে বড় কথা, এখন পর্যন্ত প্রাচীন রেলওয়ের স্মৃতি ধরে রেখেছে। এ এলাকায় রেল ছিল। স্টেশন ছিল। ভবনটি সে ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। এসব বিবেচনায় ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে ভবনটি সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। কিন্তু সম্প্রতি রেলওয়ে হাসপাতাল ভবন বাদ দিয়ে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার নতুন তালিকা প্রকাশ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।

এ ধারাবাহিকতায় গত ১ সেপ্টেম্বর ভবনটি ভেঙ্গে নতুন ভবন নির্মাণের কথা জানা যায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুনের তথ্য মতে, এখানে হবে নতুন ১৬ তলা হাসপাতাল ভবন। ৩৮০ কোটি টাকার প্রকল্পে সায় দিয়েছে একনেক।

তবে এটিকে সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে ইতিহাসবিদরা বলছেন, রেলওয়ের কোন পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর নেই। ভবনটিতে একটি সুন্দর জাদুঘর হতে পারে। জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে সময়টাকে ধরে রাখা রাখার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।

ইতিহাসে আছে একসময় মোঘল ও ইংরেজ আমলে ঢাকায় অনেক হাতি ছিল। যাতায়াত করা ছাড়াও এই হাতিগুলো নানা কাজে ব্যবহৃত হতো। পিল মানে হাতি, আর খানা মানে আশ্রম। সরকারের এই হাতিগুলো থাকত পিলখানায়। পিলখানা নামটা এখনো আছে। তবে এখন সীমান্ত স্কয়ার নামেই বেশি পরিচিত। এই পিলখানা থেকে রমনা পার্কে হাতি চারণের জন্য নেওয়া হতো। যে রাস্তা দিয়ে নেওয়া হতো সেটাই আজকের এলিফ্যান্ট রোড। রমনার চারপাশে খাল ছিল। হাতিগুলোকে নেওয়ার জন্য খালের ওপর নির্মিত হয় সেতু। পিলখানা থেকে বর্তমান হাতিরপুল এলাকায় হাতি চলাচলের জন্য ইস্টার্ন প্লাজা ও পরিবাগ বরাবর যে সেতু বা পাকা পুল নির্মাণ করা হয়েছিল হাতি পারাপারের জন্য, যা পরবর্তী সময়েহাতিরপুল নামে পরিচিতি লাভ করে।

হাতিরপুল ভেঙে নিচের লাইন বরাবর যে রাস্তাটি নির্মাণ করা হয়, সেই রাস্তার নাম ছিল পেনিট্রেটর রোড। এই পুলটি যখন ভাঙা হয় ৭০ এর দশকে, তখন ইত্তেফাকে একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল এই হাতিরপুল ভাঙা নিয়ে। ফুলবাড়িয়া-তেজগাঁও রেললাইনের ওপর দিয়ে পরিবাগ ও ধানমন্ডি এলাকার মধ্যে যান চলাচলের সহজ উপায় ছিল এই হাতিরপুল বা রেলওয়ে ওভার ব্রিজটি। নগর সংস্কারের জোয়ারে ও আকাশচুম্বি অট্টালিকা তৈরির জন্য এই পুলটি ভাঙা হয় তখন। তবে সেসময়ের নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেছিলেন রেলওয়ে স্টেশন কমলাপুরে সরিয়ে নেওয়ার পর এই পুলের আর দরকার নেই।

 

 

"