কর্নেল নাজমুল হুদা খান, এমফিল, এমপিএইচ (অব.)

  ০২ এপ্রিল, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত: নারী ও শিশুর উপর প্রভাব

কর্ণেল নাজমুল হুদা খান, এমফিল, এমপিএইচ ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা ও সংঘাত কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক বিষয় নয়; এটি একটি গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা এই সংঘাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশ। যুদ্ধ পরিস্থিতি তাদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক স্বাস্থ্যের উপর বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

প্রথমত, শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর। বোমা হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ এবং অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে নারী ও শিশুরা সরাসরি আহত বা নিহত হয়। ইউনিসেফের হিসেব অনুসারে, ২০২৬ সালের সংঘাত শুরু হওয়ার পর ১১শ শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ইরানেই প্রায় ২০০ এর বেশি শিশু নিহত। মোট হিসাব অনুযায়ী ১,৮০০+ শিশু নিহত বা আহত হয়েছে বলে রিপোর্ট পাওয়া গেছে। অনেক সময় হাসপাতাল, মাতৃসদন ও শিশু চিকিৎসা কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে জরুরি চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হয়। গর্ভবতী নারীরা নিরাপদ প্রসবের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, যার ফলে মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যুহার বৃদ্ধি পায়। এছাড়া বিশুদ্ধ পানি ও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও অপুষ্টির মতো রোগ বাড়তে থাকে।

দ্বিতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর। যুদ্ধের ভয়াবহতা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে শিশুদের মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD), উদ্বেগ, আতঙ্ক ও বিষণ্নতা দেখা দেয়। অনেক শিশু স্বাভাবিক আচরণ হারিয়ে ফেলে এবং তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে নারীরা ক্রমাগত মানসিক চাপ, ভয় এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করেন, যা তাদের মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জাতি সংঘের রিপোর্ট,এ যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ শিশু মানসিক ট্রমায় ভুগছে।

তৃতীয়ত, প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধের সময় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও নিরাপত্তার অভাব গর্ভবতী নারীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। জরুরি প্রসবসেবা, সিজারিয়ান অপারেশন এবং প্রসবোত্তর সেবা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকে। ফলে জটিলতা বৃদ্ধি পায় এবং মা ও শিশুর জীবন হুমকির মুখে পড়ে।

গার্ডিয়ান পত্রিকা বলছে, পূর্ববর্তী আঞ্চলিক যুদ্ধে ৪১% জন্মহার কমে গেছে, ২,৬০০ গর্ভপাত ঘটেছে, ২২০ জন মায়ের মৃত্যু ঘটেছে। দেড় লাখেরও বেশি গর্ভবতী/স্তন্যদানকারী নারী বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

চতুর্থত, সংক্রামক রোগের বিস্তার একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধের কারণে মানুষ গাদাগাদি করে আশ্রয়কেন্দ্র বা শরণার্থী শিবিরে বসবাস করতে বাধ্য হয়, যেখানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভাব থাকে।

রয়টার্সের মতে, পূর্ববর্তী সংঘাতের ধারাবাহিকতায় এতদঞ্চলে শুধু সীমান্ত এলাকায় ৬৬,০০০ এরও বেশী শিশু বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। চলমান সংঘাতে এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বাস্তুচ্যুতি শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়; এতে হামের মতো রোগ, কলেরা, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

পঞ্চমত, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ভেঙে পড়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। WHO এর ভাষ্য মতে, শুধু ইরানেই ১৮টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা নিশ্চিত হয়েছে। চিকিৎসক সংকট, ওষুধের অভাব এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে সাধারণ রোগের চিকিৎসাও পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে।

ষষ্ঠত, পুষ্টিহীনতা ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যুদ্ধের কারণে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হয়, ফলে পরিবারগুলো পর্যাপ্ত খাবার পায় না। এপি নিউজের মতে, সংঘাতের প্রভাবে ১.৮৪ মিলিয়ন শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। শিশুদের মধ্যে স্টান্টিং (বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া) এবং ওয়েস্টিং (ওজন কমে যাওয়া) বাড়তে থাকে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। এটি শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই এই সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তোলা কখনোই সম্ভব নয়।

পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়