আহা! কী আনন্দ তারুণ্যে

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

তারুণ্য আমার প্রিয়; আমাদেরও। তারুণ্যের বয়স নেই। ঠিক দিনক্ষণ নেই। নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা চরিত্র, ঠিকানা-ঠিকুজি নেই। চাইলেই যে মন শরীর উড়তে পারে আকাশে, ভাসতে পারে চাঁদে, সে-ই তো তারুণ্য। জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসা সম্পাদিত কর্ম বা বিচারবোধকে মানুষের আদলে মানুষের জন্য করে তোলাই আমার কাছে তারুণ্য। তারুণ্য মানে ঘুমঘোরে শিশুর মতো হেসে ওঠা মুখ; হাঁটুজলে সাঁতার কাটা; কিংবা মানুষকে ভালোবেসে মানুষের গল্প বলা।

তরুণের রং লাল। লাল আমার প্রিয়। হলুদ প্রিয়। কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, শিমুল প্রিয়। ওরা আগুন। উজ্জ্বল ডানা মেলে ভাসে আকাশে। ঘুমে জাগরণে কোলাহল করে। সম্মিলিন ঘটায় মানুষের। ম্রিয়মাণ সময় ও মানুষকে ওরা ঠিক ঠিক জাগিয়ে দেয়। ঘুমকাতুরে মানুষকে মিছিলে নামায়। ভালোবাসতে শেখায়। সেøাগানে তর্কে গানে ওরা দোহার হয়ে সুর ভাসিয়ে দেয় দিগ-দিগন্তে।

তারুণ্য প্রকৃতিতে রং ছড়ায়। ফাগুনের রং। মানুষ নামে পথে। হলুদে লালে ছেয়ে যায় চারপাশ। আড্ডায় চলনে রং। বিশ্রামে বেঞ্চিতে চায়ের কাপে রং। চোখে রং। সুরে রং। দলে দলে মানুষ, মানববৃক্ষ। যে ফুল ফোটে পলাশের ডালে, যে পাখি গান ধরে শিমুলের লালে, সেই আনন্দযাত্রা বয়ে যায় সর্বময়, সর্বমানুষে। ছন্দে, প্রকরণে, উল্লাসে আহা কী রং! আহা, কী আনন্দ, কী আনন্দ তারুণ্যে!!

আমার উৎসব ভালো লাগে, দোলা দেয়। পুলকিত মন গান ধরে উজানের, ভাটির। মানুষগুলো কী আনন্দে-উচ্ছ্বাসে হাঁটে চলে। চোখ রাখে চোখে প্রিয়তম। কত কথা, কত গান, কত গল্প। চেতনার বিন্যাসে উদ্ভাসে ভাসে প্রেম; প্রেমালয়। তৃষ্ণার্ত ঠোঁট বসে পাখির ঠোঁটে, মধু আহরণে, সুধা পানে। রসসিক্ত চোখ হাসে। প্রেমরোদ্দুর খেলে উঠোনে। উষ্ণতায় স্পর্শে ছেঁড়া ঘুড়ি হয়ে গল্পে মাতে মন।

মানুষই প্রকৃতি। প্রকৃতিই মানুষ। সবুজই মুখ্য; মূল। মানুষ-প্রকৃতি মিলেই সংসার, ঘর, যাপিত জীবন। খোঁপায় বেঁধে গাঁদা ফুলের মালা, কপালে নিয়ে লাল টিপ, হলুদে লালে সিক্ত যে মেয়েটি নামে পথে, সে-ই তো আমার প্রেম, তারুণ্য, সুখ। ওরা আছে বলেই, হাসে বলেই, মধুর গ্রীবা বাঁকিয়ে পাশ নেয় বলেই, মধুর ঝংকারে গেয়ে ওঠে গান পৃথিবী।

ভাঙা-গড়ার প্রতিনিয়ত যে স্বপ্ন; সৃজনশীলতা, সময় ও সর্বজনÑসেখানেই তারুণ্য। তারুণ্য মানে দুর্বার সাহস; নিজ নয়, অন্য। এই তারুণ্য বয়সে নয়; মনে সাহসে জাগরণে। নিজকে অতিক্রম করে অন্যের জন্য যে আত্মত্যাগ, সেটাই তারুণ্য। এমন তারুণ্যের সম্মিলিত শুভ ফল ইতিহাসে বহুভাবে নানা প্রকরণে আমরা দেখেছি। পেয়েছি। সম্মিলিত মানুষের সংহতি থাকে বৈকি; কিন্তু মূল নাড়া দেয় যে চেতনা, সেখানেই তারুণ্যের জয়। ইতিহাসের নানা বাঁকে, সময়সন্ধিক্ষণে, এই তারুণ্য তরুণরাই রচনা করেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ। শুভযোগে সংহতি বুননে দেন অন্তহীন প্রেরণা।

বয়স বিবেচনায় কিছু তরুণ-তরুণীর নিছক যোগফলই তারুণ্য নয়। আমার কাছে তারুণ্য মানে লিঙ্গ বয়সভেদ ভুলে সারিবদ্ধ শুভ মানুষের সম্মিলিত সম্মিলন। স্বার্থবুদ্ধির হিসাবনিকাশ না করে যে মানুষ ভেতরের উপলব্ধি প্রকাশ করেন নির্দ্বিধায়, তারুণ্য তো সেখানেই। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অনুষঙ্গ যদি বিভ্রান্ত না করে, ভুল পথে না চালায়, তবে কেবল তারুণ্যই পারে মানুষ ও রাষ্ট্রকে সুন্দর সাম্যের পথ দেখাতে। এমন নজির তো ইতিহাসে কম নয়।

আবার আপনি বা আমরা আমাদের স্বার্থবুদ্ধি বিবেচনায় তারুণ্যকে ভুল পথে পাঠাতে পারি বা ফেলতে পারি ঠিকই; কিন্তু রাখতে পারি না, পারব না। সময় পরম্পরায় তারুণ্য ঠিক পথেই হাঁটে, পৌঁছে যায়। এমন নজিরও কিন্তু ভূরি ভূরি।

তারুণ্য মানে আগুন। স্কুলজীবন থেকে আজ অবধি, চারপাশে, পেশার বাইরে ও ভেতরে, নানা পরিম-লে অসংখ্য আগুনমুখো তরুণকে আমি দেখেছি। ক্ষুরধার মেধাবী। চোখেবুকে আগুন। ইতিহাস ঐতিহ্যের পা-ুলিপি; শব্দভা-ার। কত রূপ-রস; হুল্লোড়; স্রোতধারা। পাগলাটে ওসব তরুণের মধ্যে অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি। গল্প যুক্তি তর্ক দিয়ে ওরা মানুষের মেলা জমাত। প্রগতি, শুভ শক্তির সম্মিলন ঘটত। মুগ্ধ আমরা শুনতাম, গাইতাম গান কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বদলের স্বপ্ন নিয়ে।

ঘরে-বাইরে, প্রতিবাদে প্রতিরোধে, রাষ্ট্রসমাজ ব্যক্তি- তারুণ্য সবখানেই। বদলের গল্প। এই তারুণ্যকে সামলানো যেমন কঠিন; তারুণ্য বিপুল শক্তি স্বপ্নের আধারও বটে। আমি অনেক তরুণকে দেখেছি উচ্ছন্নে যেতে; নষ্ট হতে। পাহাড়সম মেধা কী করুণভাবে ক্ষয়ে গেছে! এর জন্য যত না ওরা দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী আমরা। আমরা মানে সমাজ রাজনীতির অবকাঠামো ও নীতি, সংস্কৃতি। আমরা ওদের সঠিক সময় সঠিক কাজে লাগাতে পারিনি। দিকনির্দেশনা দিতে পারিনি। অবহেলা করেছি। এমন অনেক প্রিয়মুখ আমাকে এখনো ভাবায়; কাঁদায়।

তারুণ্যের জয়গান সর্বজনীন, সর্বময়। পরিবারে সমাজে রাষ্ট্রে যা কিছু কূপম-ূকতা, কুসংস্কৃতি, অচেতনবোধ- তারুণ্যই পারে বদলাতে; বদলায়। সময়মতো চোখেমুখে আগুন নিয়ে জ্বলে উঠতে পারে কেবল তারুণ্যই। তারুণ্যকে অস্বীকার করার সাধ্য কারো নেই। গানে, আড্ডায়, বাসে, কিংবা ঘুমে-জাগরণে, গলার সবচেয়ে উঁচু পর্দা থেকে তারুণ্যই গেয়ে ওঠে গান দিনবদলের।

প্রতিদিন আমার ঘুম ভাঙে জাগরণের স্বপ্নে। প্রতি রাতে আমি ঘুমাই স্বপ্নের জাগরণের আশায়। বাসস্টপে গাছ থেকে ঝরে পড়া জারুল যখন মুগ্ধ ল্যান্ডস্কেপ আঁকে হাত তিনেক দূরের পিচে মোড়ানো রাস্তায়; আমার চোখ ঢেকে যায় জারুলে। বাস চলে যায়। কোলাহল থেমে যায়। মেয়েটিকে বিদায় দিয়ে হলুদ দুপুরে সেই জারুলের নিচে একা দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি আমাকে গল্প বলে। আমি গল্প শুনি। সমুদ্র ঢেউ আছড়ে পড়ছে বুকে। উত্তাল জলরাশি। গল্পে গল্পে বেলা কাটে আমার। আমরা অপেক্ষা করি আরো সুন্দর দিন, সুন্দর ঘর, স্বপ্নের যাপিত জীবনের জন্য।

লেখক : সাংবাদিক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী

"