শরীফ হোসাইন, ভোলা

  ২২ জুন, ২০২৬

পাঁচ বছর ধরে তালাবদ্ধ ভোলার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

ভোলার প্রায় ২২ লাখ মানুষের উন্নত চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। অথচ হাসপাতালটির ৬ বেডের আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা) ইউনিটটি গত ৫ বছর ধরে অচল অবস্থায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহৃত না হওয়ায় অকেজো হয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছে প্রায় কোটি টাকার সরকারি যন্ত্রপাতি। এখানে এসে আইসিইউ সেবা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগী ও তাদের স্বজনরা। গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিটটি চালুর ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো তোড়জোড় নেই বলে অভিযোগ সচেতন মহলের। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও দক্ষ জনবল পেলেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

সরেজমিনে এবং হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ভোলা জেনারেল হাসপাতালের নতুন বহুতল ভবনের তৃতীয় তলায় ২০২১ সালে করোনাকালীন ৬টি আইসিইউ বেড স্থাপন করা হয়। এর সঙ্গে ৫টি ভেন্টিলেটর, ৭টি অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর ও ৬টি হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়। রয়েছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থাও। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে গত ৫ বছরেও ইউনিটটি চালু করা যায়নি। ফলে কোটি টাকার সরঞ্জামসহ এটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

তীব্র চিকিৎসক ও নার্স সংকট : হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই হাসপাতালের প্রধান সমস্যা হলো তীব্র চিকিৎসক ও নার্স সংকট। এখানে ৮৭ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন এবং ৯২টি নার্সের পদের বিপরীতে কর্মরত ৭৬ জন। হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য পুরো হাসপাতালে মাত্র একজন কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। এর ওপর হাসপাতালে প্রতিদিনই ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণেরও বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।

পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে গত এক সপ্তাহ ধরে চিকিৎসাধীন সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের আশিোর্ধ্ব মো. আবু কালাম হাওলাদার। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা পাইতেছি না, কইয়া লাভ নাই। টাকা-পয়সা নাই দেইখাই পোলাপানে আমারে এখানে ভর্তি কইরা রাখছে।"

তার পাশের বেডেই গত ১৪ দিন ধরে চিকিৎসাধীন উত্তর দিঘলদী ইউনিয়নের মো. ফরমুজুল হক হাওলাদার (৮৪)। ভাঙা ভাঙা স্বরে তিনি বলেন, "ভোলা সদর হাসপাতালের বেডে শুধু শুয়েই আছি। যে অবস্থায় ছেলে-মেয়েরা এনে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিল, সে অবস্থাতেই আছি। স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হয়নি।"

রোগীদের স্বজনদের ক্ষোভ : হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের স্বজন লাইজু বেগম, মনোয়ারা বেগম ও আলী আকবর বলেন, "আমরা গরিব মানুষ। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর বাবাদের চিকিৎসার জন্য এখানে এনেছি। কিন্তু দিনের পর দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো উন্নতি দেখছি না। হাসপাতালের লোকজন ঢাকা বা বরিশাল নিয়ে যেতে বলে। আমাদের টাকা-পয়সা থাকলে তো আর এখানে পড়ে থাকতাম না।"

তারা আরও অভিযোগ করেন, প্রতিদিন সকালে একজন চিকিৎসক কয়েক মিনিটের জন্য ওয়ার্ড রাউন্ড দিয়ে চলে যান। এরপর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হৃদরোগের আর কোনো ডাক্তার হাসপাতালে পাওয়া যায় না। চিকিৎসার অভাবে কেউ মারা গেলে এই দায়ভার কে নেবে? হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিটটি চালু থাকলে রোগীরা অন্তত সঠিক চিকিৎসা পেতেন।

বোরহানউদ্দিনের পক্ষিয়া ইউনিয়নের মো. ওমর ফারুক হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ভোলা জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা হয়। কিন্তু সেখানেও যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ করেন তার ভাগনে মো. রাসেল। তিনি বলেন, "আমার মামাকে আনার পর হৃদরোগের কোনো সঠিক চিকিৎসা পাইনি। বাধ্য হয়ে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।"

ক্ষুব্ধ সচেতন মহল : ভোলাবাসীর চিকিৎসায় কাজে না আসায় এই আইসিইউ বেড কেন এবং কাদের জন্য স্থাপন করা হয়েছে—সেই প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহলের মো. রাকিব ও হাসনাইন। তারা বলেন,

"মুমূর্ষু রোগীরা এই আইসিইউর সুবিধা আজও পেল না। ভোলাবাসী হিসেবে আমরা রাষ্ট্রীয় বহু সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এখানে হৃদরোগীদের নামমাত্র চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা বা বরিশালে রেফার করা হয়। ফলে অনেক রোগী পথেই প্রাণ হারান, যে খবর কেউ রাখে না। আইসিইউর অভাবে ভোলায় আর কত প্রাণ ঝরবে?"

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান জানান, আইসিইউ ইউনিট চালানোর মতো দক্ষ জনবল তাদের নেই। তিনি বলেন, "আইসিইউ সচল করতে চিকিৎসক, অ্যানেসথেটিস্ট ও বিশেষায়িত নার্সসহ দক্ষ জনবল প্রয়োজন। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। প্রয়োজনীয় জনবল ও অন্যান্য সুবিধা পেলে আমরা অবশ্যই আইসিইউ ইউনিটটি চালু করব।"

রেফার করার বিষয়ে তিনি বলেন, হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের সাধ্যমতো চিকিৎসা এখানে দেওয়া হয়। তবে যাদের জরুরি ভিত্তিতে 'স্পেশালাইজড' চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, কেবল তাদেরই রেফার করা হয়ে থাকে।

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মুমূর্ষু রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটটি চালুর ব্যাপারে সরকার অতিদ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা জেলাবাসীর।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়