গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ
বাজারে সংকট
লোকসানের মুখে সিরাজগঞ্জে অনির্দিষ্টকালের জন্য ডিম বিক্রি বন্ধ

ডিমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগে সিরাজগঞ্জে অনির্দিষ্টকালের জন্য ডিম বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করেছেন জেলার পোল্ট্রি খামার মালিকরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ডিমের দাম অনেক কম হওয়ায় ক্রমাগত লোকসানের মুখে খামারিরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। খামারিদের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তের বড় প্রভাব পড়েছে জেলার স্থানীয় বাজারগুলোতে। এরই মধ্যে বিভিন্ন বাজারে ডিমের সরবরাহ কমে গিয়ে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
রবিবার (২১ জুন) বিকেল ৫টার দিকে সিরাজগঞ্জের 'সুপ্ত পোল্ট্রি ফার্ম অ্যান্ড ফিড'-এর মালিক মোস্তাক আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, এর আগে শনিবার (২০ জুন) সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল এলাকায় খামার মালিকদের এক জরুরি বৈঠকে ডিম বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ থেকে জেলার খামারিরা ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
উৎপাদন খরচই উঠছে না : খামারিদের অভিযোগ, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে তাদের খরচ হচ্ছে প্রায় ৯ টাকা। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে ডিমের পাইকারি দাম কমিয়ে ৭ টাকা ৭০ পয়সা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। এতে উৎপাদন খরচও উঠছে না। ফলে বাধ্য হয়েই তারা ডিম বিক্রি বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল এলাকার খামারি লোকমান হোসেন বলেন, "আমরা খামারে দিনরাত পরিশ্রম করে ডিম উৎপাদন করি, অথচ দাম নির্ধারণ করেন কিছু মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী। তারা সিন্ডিকেট করে আমাদের কাছ থেকে পানির দামে ডিম কিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চড়া দামে বিক্রি করছেন। আমরা প্রতিবাদ করলে নামমাত্র কিছু টাকা বাড়ানো হয়। এতেই স্পষ্ট যে বাজার নিয়ন্ত্রণে একটি চক্র কাজ করছে। আমরা প্রশাসনের কাছে এর তীব্র প্রতিকার জানাই।"
আরেক খামারি গোলাম মোস্তফা জানান, খামার পরিচালনা করতে মুরগির খাবার, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরিসহ সব ধরনের খরচই বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় ডিমের দাম মিলছে না। লোকসান সামলাতে না পেরে অনেক ক্ষুদ্র খামারি ইতোমধ্যে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। খামারিরা যেন উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ন্যায্যমূল্য পান, সেজন্য দ্রুত বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেন তিনি।
বাজারে সরবরাহ সংকট, ভোগান্তিতে ক্রেতারা : এদিকে খামারিরা ডিম সরবরাহ বন্ধ রাখায় খুচরা বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শহরের কয়েকটি বাজারের খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় ডিমের সরবরাহ একপ্রকার তলানিতে ঠেকেছে।
ডিম বিক্রেতা আলাউদ্দিন বলেন, "খামার থেকে ডিম আসা প্রায় বন্ধ। আগে নিয়মিত যে পরিমাণ ডিম পাওয়া যেত, এখন তার চারভাগের একভাগও মিলছে না। ফলে ক্রেতাদের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পাইকারি বাজারেও সংকট তৈরি হওয়ায় আমরা নিজেরাও বিপাকে আছি।"
বাজারে ডিম কিনতে আসা ক্রেতা মো. রাশিদুল ইসলাম বলেন, "ডিম সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী প্রোটিনের উৎস। হঠাৎ বাজারে ডিমের সংকট হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা বিপাকে পড়ে। খামারি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যকার এই দ্বিমুখী সমস্যা সরকারকে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে, যাতে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে।"
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যা বলছে : বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডিমের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে খামারি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সৃষ্ট সংকটের সমাধান না হলে সাধারণ ক্রেতাদের আরও খেসারত দিতে হতে পারে।
জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, "ডিমের দাম নির্ধারণ করে সরকার। কোনো ব্যাপারী বা ব্যবসায়ী ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন না। তবে বর্তমানে গরম ও অন্যান্য কারণে বাজারে ডিমের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় দাম কিছুটা কমেছে। আমরা খামারিদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছি।"
পিডিএস/এমএইউ









































