আব্দুর রহমান রাসেল, রংপুর ব্যুরো

  ১৮ মে, ২০২১

দুস্থদের ভিজিডির চাল ধনীদের ঘরে

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

করোনাভাইরাসের মধ্যে রংপুর সদর উপজেলার সদ্যপুস্করনী ইউনিয়নে হতদরিদ্রদের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত দুস্থদের মাঝে সরকারি ভিজিডি কার্ড নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, ইউপি চেয়ারম্যান নিজেই ভিজিডি কার্ড প্রভাবশালীদের নামে তালিকাভুক্ত করে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, ছাদপিটা বাড়ি, ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারদের পরিবারের কারো নামে এমন কার্ড ইস্যু করার কোনো বিধান না থাকলেও ওই ইউপি’র সকল সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে চেয়ারম্যান দুই শতাধিক দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিডি কার্ড দিয়েছেন প্রভাবশালীদের নামে। যাদের অনেক ধন-সম্পদ থাকার পরেও প্রতি মাসে ভিজিডির ৩০ কেজি চাল  তুলে আসছেন তারা।

গ্রামের সবাইকে চেনা সত্ত্বেও তাদের নামের তালিকা চূড়ান্ত করেন ইউপি সদস্যরা। ওই তালিকায় সকল সদস্যদের সিলসহ স্বাক্ষরও রয়েছে। তবে সেই তালিকায় রাখা হয়নি পিতা ও স্বামীর নাম। তাহলে তারা কিভাবে প্রতি মাসে ভিজিডির ৩০ কেজি চাল পেলো এ নিয়ে রয়েছে জনমনে অনেক প্রশ্ন।

মঙ্গলবার রংপুর সদর উপজেলার ৪ নং সদ্যপুস্করনী  ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পিতার/স্বামীর নাম নেই, এমন বেশ কিছু তথ্য প্রমাণ মিলেছে। যারা ভিজিডির কার্ড পেয়েছেন তারা হলেন শিক্ষক, চাকরিজীবী, ডাক্তার, প্রভাবশালী ব্যক্তি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইউনিয়নের কয়েকজন বলেন, এখানে যা কিছুই হোক না কেন ইউপি চেয়ারম্যানের যোগসাজসেই হয়।

এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় সব সদস্যই নিজের বা পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ভিজিডি কার্ড ইস্যু করে সরকারি চাল নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিচ্ছেন বলে দাবি তাদের। আবার তাদের বিরুদ্ধে অন্যের নামে ইস্যু করা কার্ডও নিজের কাছে রেখে দুস্থদের বঞ্চিত করার অভিযোগ রয়েছে। অনুরূপ ইউনিয়নের প্রায় সব সদস্যই কোনো না কোনোভাবে সরকারি এসব নানা সুবিধা নিচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পশু চিকিৎসক একরামুল (ভিজিডি কার্ড নং-৩২) প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, আগে চাকরি করতাম, এখন ওষুধের ব্যবসা। চেয়ারম্যান সাহেবকে বলছিলাম, আমার স্ত্রী শিরিনা বেগমের নামে একটি ভিজিডি কার্ড করে দেওয়ার জন্য। তারপর তিনি আমার বউয়ের নামে একটি ভিজিডি কার্ড করে দিয়েছেন। ছাদপিটা বাড়ি থাকলেও কি আমরা বড় লোক? আমরা কি গরিব নই? সরকারের জিনিস, তারাও খাবে আমরাও খাবো।

২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে ইস্যুকৃত ৮ নম্বর ভিজিডি কার্ডের অনুকূলে দেওয়া মাসিক ৩০ কেজি চাল তুলে আসছেন স্বীকার করে মোছা: সায়মা খাতুন (ভিজিডি কার্ড নং-৮) বলেন, নিয়ম না থাকলেও আমার উপর চেয়ারম্যান সাহেবের একটু নেক নজর আছে, তাই কোনো সমস্যা হয় না। আমার স্বামীর দুটি ট্র্যাক্টর আছে। মেম্বারকে বলার পর তিনি আমাকে একটা ভিজিডির কার্ড করে দেন। আমরা চার বস্তা ভিজিডির চাল পাইছি।

শ্রীমতি জোসনা রানী (ভিজিডি কার্ড নং-৪) জানান, আমি দুই দন জমি আবাদ করি এবং শাক-সবজি, আলু, ভুট্টা, ধান চাষ-আবাদ করি। এবার ২৫ মণ ধান পেয়েছি। সোহল চেয়ারম্যান আমাকে ভিজিডি কার্ড দিছেন। আমি  ভিজিডি কার্ড সোবাহানের কাছে সেই ৫ হাজার টাকা  বিক্রি করে দিয়েছি।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক  কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ অযোদ্ধাপুর গ্রামের তাজুল ইসলাম নিসবেতগঞ্জ স্কুল এন্ড কলেজর সহকারী শিক্ষক। তার স্ত্রীর মোছা: ফরিদা পারভীন (ভিজিডি কার্ড নং-৩৬) এর নামে ভিজিডি কার্ড দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে ৪ নং সদ্যপুস্করনী  ইউনিয়ন পরিষদ চেয়াম্যান সোহেল রানা প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, এখন ডিজিটালের যুগ, অনেকে অন লাইনে আবেদন করেছেন, এর মধ্যে কয়েক জন চাকরিজীবীর কার্ড হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ভিজিডি উপকারভোগী বাছাই কমিটি গঠন করে তালিকা তৈরী করা হয়। পরে এসব নামের তালিকায় স্বাক্ষর করে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।

“তাছাড়া নিয়ম না থাকলে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসব কার্ড অনুমোদন দিলেন কীভাবে?” এমন প্রশ্নও ছুড়ে দেন ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল রানা।

রংপুর সদর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা/প্রোগ্রাম অফিসার হাবিবা হেলেন জানান, কোনো জনপ্রতিনিধি অথবা সরকারি কর্মচারী তার নামে ভিজিডিসহ এ ধরনের কার্ড ইস্যু করার নিয়ম নেই। অনলাইনে সাধারণ মানুষ আবেদন করার পর চেয়ারম্যান নিজে তালিকা থেকে মার্ক করে চিহ্নিত করেছেন। এর পর আমাদেরকে ভিজিডির কার্ড তৈরি করতে বলেছেন এবং সেই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্যরা তাদের কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাদেরকে তালিকা দেন। সেই তালিকা দিয়ে আমরা ভিজিডি কার্ড দেই। কেননা, আমরা তো আর সেই এলাকার মানুষদেরকে চিনি না, কে ডাক্তার, কে চাকরিজীবী আর কে ব্যবসায়ী। তবে আমাদের কাছে যদি লিখিত অভিযোগ আসে, তাহলে আমরা সেই কার্ড বাতিল করে দেবো। 

সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার/উপজেলা ভিজিডি কমিটির সভাপতি ইসরাত সাদিয়া সুমি জানান, ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল রানা আমাকে না জানায় মাইকিং করছে এবং আমি মনে করি যে সে নিজে থেকে এইসব কাজ ইচ্ছাকৃত ভাবেই করেছে, তবে আমার কাছে অভিযোগ এসেছে। দ্রুততম সময়ে এই বিষয়ে তদন্ত করে ঢাকায় রিপোট পাঠাবো এবং সে যদি সত্যিকারার্থে অন্যায় করে থাকে তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রংপুর সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নাছিমা জামান ববি জানান, ইউনিয়ন কমিটি যাছাই বাছাই করে তালিকা করা উচিৎ ছিলো। কিন্তু শিক্ষক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী তাদের নাম তালিকা করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই কমিটির যে প্রধান তিনি এসব দেখেছেন এবং নিজেই দেখে সাক্ষর করছেন, আর আমি অনেক জায়গায় দেখলাম, তিনি নিজেই তালিকা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যে, এরা  ভিজিডি কার্ড পাবে। এটা আসলেই অন্যায়, যাদের ৫ শতকের  উপরে জমি আছে তারা কখনোই  ভিজিডি কার্ড পাওয়ার যোগ্য নয়। আর চাকরিজীবী তো প্রশ্নই ওঠে না।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ভিজিএফএর চাল চুরির দায়ে রংপুর র‌্যাব ১৩ ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল রানার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং ১৫। ওই মামলায় জেলহাজতও গিয়েছেন তিনি। পরে জামিনে বেরিয়ে ক্ষমতার দাপটে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

পিডিএসও/ইউসুফ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
রংপুর,সদ্যপুস্করনী ইউনিয়ন,হতদরিদ্র,ভিজিডি’র চাল,ধনীদের ঘরে
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close