এসএম আলাউদ্দিন সোহাগ, পাইকগাছা (খুলনা)

  ০৭ ডিসেম্বর, ২০২০

মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর করার দাবি

বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর বাড়িটি অরক্ষিত

খুলনার পাইকগাছায় ১৯৭১’র বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর বাড়ীটি দীর্ঘদিন যাবৎ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের বাড়িটি সংরক্ষণের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।

সূত্র জানায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী গুরুদাসীর উপর নির্মম নির্য়াতন চালায় এবং তার চোখের সামনে স্বামী, পুত্র ও কন্যাকে হত্যা করে। স্বামী গুরুপদ মন্ডল ছিলেন পেশায় একজন দর্জী। স্বাধীনতাকামী অত্যান্ত সহজ সরল মানুষ ছিলেন তিনি, তার স্ত্রীর উপর পাকদৌসদের নির্মম অত্যাচার বাধা দিলে তাকে এবং তার দুই পুত্র ও বড় কন্যাকে গুলি করে হত্যা করে তারা।

গুরুদাসীর ছোট মেয়ে যখন মায়ের কোলে দুধ খাচ্ছিল তখন পাক দোশররা ছিনিয়ে নিয়ে কাঁদা মাটিতে পুতে মারে। গুরুদাসী অতি সুন্দরী হওয়ায় পাকদৌসরা তার নিজ বাড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন চালাচ্ছিল। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এ খবর টের পেয়ে তাকে উদ্ধার করেন। কিন্ত ততক্ষণে তিনি মানষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নে স্বামী, পুত্র ও কন্যা মিলে ছিল তাদের সুখের পরিবার। গুরুদাসী ছিলেন দু’পুত্র ও দু’কন্যা সন্তানের জননী। পাকদৌসদের লালসার শিকার গুরুদাসীকে ঐ সময় উদ্ধার করে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কাছেই রাখেন। দেশ স্বাধীন হলে মানষিক ভারসাম্যহীন গুরুদাসীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাবনার মেন্টাল হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেও সেখান থেকে চলে আসেন তিনি।

বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে অবশেষে পাইকগাছার কপিলমুনিতে আসেন। উপজেলা তথা দেশের অধিকাংশ অঞ্চল মানুষের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় মাসী। ভিক্ষাই ছিল তার জীবন জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় লাঠি হাতে মানুষকে ভয় দেখানো, হাত পেতে দু’টা টাকা চাওয়া এই মানুষটিকে মত্যুর আগে চিনতো না এমন মানুষ খুব কম ছিল।

শুধু উপজেলায় নয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তাকে চিনতেন। কারণ তিনি এক দন্ড কোথাও বসতেন না। শুধু ছুটে বেড়াতেন বিভিন্ন অঞ্চলে। পাগল এই মানুষটি একটি কথা বেশি বলতেন “কবে তার স্বামী, সন্তানদের হত্যাকারীদের বিচার হবে”? তার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট স, ম, বাবর আলী এবং নির্বাহী কর্মকর্তা (সাবেক সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব) মিহির কান্তি মজুমদার স্থানীয় কপিলমুনিতে সরকারী জায়গায় তার বসবাসের জন্য একটি বাড়ি তৈরী করে মাথা গোজার ঠাই করে দেন।

বীরঙ্গনা গুরুদাসী মানবেতার জীবনযাপন করতে করতে ২০০৮ সালের ৮ ডিসেম্বর এ বাড়িতেই মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর খবর শুনে সে সময় ছুট আসেন এ অঞ্চলের মুক্তিযাদ্ধা, প্রশাসনসহ সর্ব স্তরের মানুষ। সরকারি তালিকায় তার নাম না থাকায় সাধারণ মানুষের মত শেষকৃত্য অনুষ্ঠান করা হয়। তার শেষ কৃত্য অনুষ্ঠানে গঠন করা হয়ছিল বীরঙ্গনা গুরুদাসী স্মতি সংরক্ষণ পরিষদ।

ঐসময় নেতৃবৃন্দ তার বসবাসের বাড়িটি স্মৃতি যাদুঘর ও পাঠাগার তৈরীর ঘোষণা দেন। যদিও আজ অবধি তার কোন বাস্তবায়ন হয়নি। অযত্নে আর অবহেলায় পড়ে আছে গুরুদাসী মাসির স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি। স্থানীয় কয়েকজন জানান, একটি কূচক্রীমহল গুরুদাসীর বাড়িটি দখলের পায়তারা চালাচ্ছে।

বাড়িটি সংরক্ষণের ব্যাপারে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট স.ম. বাবর আলী বলেন, গুরুদাসীর বাড়িটি লাইব্রেরী করার পরিকল্পনা ছিল।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ,বি,এম, খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, এ বিষয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি এখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মুক্তিযুদ্ধ চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করতে বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর বাড়িটি সংরক্ষণ ও যাদুঘর করার দাবি জানিয়েছেন পাইকগাছাবাসী।

পিডিএসও/এসএম শামীম

পাইকগাছা,খুলনা
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়