তানিয়া আক্তার

  ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

দৃষ্টিপাত

সংখ্যার উন্নয়ন নয়, চাই মানুষের উন্নয়ন

নির্বাচনের পূর্বে আমরা প্রার্থীদের কাছে শুনে থাকি কতশত প্রতিশ্রুতি। নির্বাচন শেষ হলেই দেশে এক ধরনের হিসাবনিকাশ শুরু হয়ে যায়। কত শতাংশ ভোট পড়ল, কোন দল কত আসন পেল, জিডিপি কত বাড়ল, বৈদেশিক রিজার্ভ কত দাঁড়াল-সংখ্যার এই ব্যস্ততায় যেন রাজনীতি ও অর্থনীতির সাফল্য নির্ধারিত হয়ে যায়। রাজনৈতিক সেমিনার-সভাতে আমরা প্রায়ই বড় বড় সংখ্যা শুনি-জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ বা ৮ শতাংশ মাথাপিছু আয় কয়েক হাজার ডলার বৃদ্ধি, কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ঝকঝকে পরিসংখ্যান। কিন্তু নির্বাচনের পর ধুলাবালি থিতিয়ে এলে সাধারণ মানুষের মনে একটিই প্রশ্ন জাগে: এই সংখ্যাগুলো কি আমার জীবনের মান পরিবর্তন করেছে?

আজকের বিশ্বে উন্নয়নের মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের চোখ যায় United Nations Development Programme এর দিকে। তারা যে ধারণাটি সামনে এনেছে ‘Human development index(HDI)’ তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নতি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; এটি মানুষের সামগ্রিক বিকাশের প্রশ্ন। HDI তিনটি মূল সূচকের উপর দাঁড়িয়ে: গড় আয়ু, শিক্ষা ও মাথাপিছু আয়। অর্থাৎ মানুষ কতদিন বাঁচছে, কতটা শিক্ষিত হচ্ছে এবং তার জীবনযাত্রার মান কেমন-এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র। উন্নয়ন যখন কেবল কলমে কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তাকে ‘কর্মহীন প্রবৃদ্ধি’ বা ‘বৈষম্যমূলক উন্নয়ন’ বলা হয়। আধুনিক অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের সক্ষমতার বিকাশ। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের প্রধান সূচক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে জিডিপি। অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বক্তৃতা পর্যন্ত, জিডিপি যেন উন্নয়নের সমার্থক শব্দ। একটি দেশের জিডিপি বাড়ছে মানেই দেশ এগোচ্ছে-এমন ধারণাই বহুদিন ধরে আমাদের মানসে প্রতিষ্ঠিত। উৎপাদন বেড়েছে মানেই অর্থনীতি এগিয়েছে -এমন ধারণা নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, জিডিপি বাড়লেই সবার জীবন ভালো হয় না। আয় বাড়তে পারে কিন্তু সেই আয় কার কাছে যাচ্ছে? কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি? শিক্ষার মান উন্নত হচ্ছে কি? স্বাস্থ্যসেবা কি হাতের নাগালের মধ্যে আসছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেক সময় সংখ্যার ঝলকানির আড়ালে চাপা পড়ে যায়। ফলে নির্বাচনের পর যখন সরকার উন্নয়নের রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ করে, সেখানে সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, রপ্তানি-এসবের সাফল্য উঠে আসে। কিন্তু মানুষের সুখ, নিরাপত্তা, মানসম্মত শিক্ষা কিংবা ন্যায্য আয়ের প্রসঙ্গ ততটা গুরুত্ব পায়না।

সংখ্যা নিরপেক্ষ মনে হলেও, তাদের ব্যবহার সবসময় নিরপেক্ষ নয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রায়ই পরিসংখ্যানকে একটি বর্ণনার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। সরকার পক্ষ সংখ্যার মাধ্যমে তুলে ধরে তার উন্নয়নের গল্প। আবার একই সময় বিরোধী পক্ষ একই পরিসংখ্যানের ভিন্নদিক তুলে ধরে সমালোচনা করে। এইখানেই জন্ম নেয় পরিসংখ্যানের রাজনীতি। সংখ্যা কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, কোন সময়কাল বেছে নেওয়া হচ্ছে, কোন সূচক গুরুত্ব পাচ্ছে আর কোনটি উপেক্ষিত-এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক। উদাহরণস্বরূপ, সাময়িকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেও যদি কর্মসংস্থান না বাড়ে, তবে ‘jobless growth’ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কেবল জিডিপি তুলে ধরলে এই অসামঞ্জস্য আড়াল হয়ে যেতে পারে।

পরিসংখ্যানের ভাষা সাধারণ মানুষের জন্য প্রায়ই দুর্বোধ্য। ফলে তখন রাজনৈতিক ভাষ্যই অনেক সময় চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ গণতান্ত্রিক সমাজে সংখ্যার স্বচ্ছতা ও স্বাধীন পর্যালোচনা অন্তত জরুরি। অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো-উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। শহরের ঝলমলে অট্টালিকার পাশে বস্তির শিশু অপুষ্টিতে ভোগে। একদিকে বিলাসবহুল হাসপাতাল অন্যদিকে গ্রামীণ ক্লিনিকে চিকিৎসার অভাব। আয় বৈষম্য বাড়লে সমাজে অসন্তোষ, নিরাপত্তা ও অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমলে অভ্যন্তরীণ বাজার সঙ্কুচিত হয়। শিক্ষায় বিনিয়োগ না করতে পারলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয় না। প্রজন্মগত দারিদ্র্য স্থায়ী হয়ে যায়। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়। নির্বাচনের পর তাই সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিস্তার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, প্রবৃদ্ধির বণ্টন-এই দৃষ্টিভঙ্গিই মানুষের উন্নয়নের মূল কথা।

বাংলাদেশের একটা বড় অংশই তরুণ। এই জনমিতিক সুবিধা সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে তা দেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা যদি যুগোপযুগী না হয়, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত থাকে, আর কর্মসংস্থান পর্যাপ্ত না হয় তবে এই সম্ভাবনা বোঝায় পরিণত হতে পারে।

নির্বাচনের সময় তরুণদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে- স্টার্টআপ সহায়তা, প্রযুক্তি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবনের সুযোগ। কিন্তু নির্বাচনের পর প্রশ্ন হলো, এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা রূপ পায়? তরুণদের কেবল কর্মী হিসাবে নয়, চিন্তাশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। তাদের অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, নীতি প্রণয়নে মতামত দেওয়ার সুযোগ এবং মুক্ত চিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মানুষের উন্নয়ন মানে ভবিষ্যত প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সুরক্ষিত করা।

একটি জাতির শক্তি নির্ভর করে তার মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর। উন্নত অবকাঠামো অর্থহীন, যদি অসুস্থ মানুষ ও মানুষ অশিক্ষিত থাকে। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমানো- এসবই মানব উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান। একইভাবে শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণায় উৎসাহ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা জরুরি। নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই দুই খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

প্রতিটি নির্বাচনের পর ব্যক্তিকেন্দ্রিক আলোচনা প্রাধান্য পায়; কে মন্ত্রী হলেন, কে পদ পেলেন। কিন্তু মানুষের উন্নয়নের প্রশ্নে ব্যক্তি নয়, নীতিই মুখ্য। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। দুর্নীতি কমানো, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এসবই মানুষের আস্থা তৈরি করে। আর আস্থা ছাড়া উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির নামে যদি পরিবেশ ধ্বংস হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন বিপন্ন হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এরই মধ্যেই দৃশ্যমান বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা। এসব দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রান্তিক মানুষ। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশকে উপেক্ষা করলে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না। সবুজ জ্বালানি, টেকসই কৃষি, নগর পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি এসব পদক্ষেপ মানুষের জীবনমান রক্ষা করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করবে। কারণ মানুষের উন্নয়ন মানে শুধু বর্তমানের সাফল্য নয়; ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও।

নারী যদি পিছিয়ে থাকে, সমাজ এগোতে পারে না। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ, নিরাপত্তা, সমান মজুরি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা এসব নিশ্চিত করা উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বাচনের পর সরকারের উচিত নারীবান্ধব নীতি বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া। মানুষের উন্নয়ন মানে কেবল গড় মান উন্নত করা নয়; বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দরিদ্র, প্রতিবন্ধী, সংখ্যালঘু সবার অধিকার নিশ্চিত করা। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নীতি প্রয়োজন। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করে।

নির্বাচনের পরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো রাজনীতি কি ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিক থাকবে, নাকি নীতিনির্ভর হবে? ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণই দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন এই তিনটি ভিত্তি ছাড়া মানুষের উন্নয়ন সম্ভব নয়। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে সরকারকে কেবল প্রকল্প ঘোষণা করলেই হবে না; সেই প্রকল্পের সুফল কতটা মানুষের জীবনে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। পরিসংখ্যানের পাশাপাশি নাগরিকদের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি ধাপ মাত্র। নির্বাচনের পর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করা জরুরি। কারণ স্বাধীন পরিবেশেই মানুষ তার পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে। মানুষের উন্নয়ন তাই রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নির্বাচনের পরে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে উন্নয়ন মানে কী? কেবল উচ্চ ভবন, দ্রুতগামী সড়ক, বড় বাজেট নাকি এমন একটি সমাজ যেখানে প্রতিটি মানুষ সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারে? যেখানে একটি শিশুর স্বপ্ন তার আর্থিক অবস্থার কারণে থেমে যায় না? যেখানে একজন তরুণ তার প্রতিভা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে পারে? মানুষের উন্নয়ন মানে সুযোগের সমতা। মানে নিরাপত্তা। মানে সামাজিক ন্যায়বিচার। মানে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে এবং তাদের সম্ভাবনা বিকাশের পথ খুলে দেয়।

নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, কিন্তু এটি শেষ নয়; বরং শুরু। ভোটের ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পরই আসল কাজ শুরু হয়। তখন প্রশ্ন ওঠে এই সরকার কি মানুষের জন্য কাজ করবে? উন্নয়নের সুফল কি সবার ঘরে পৌঁছাবে? তরুণদের স্বপ্ন কি বাস্তবে রূপ নেবে? সংখ্যা প্রয়োজন কারণ তা অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু সংখ্যাই শেষ কথা নয়। উন্নয়নের আসল মানদণ্ড হলো মানুষের হাসি, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সম্ভাবনার বিকাশ। নির্বাচনের পর নতুন সরকার যদি উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে স্থাপন করতে পারে ঐউও-র মতো সূচককে গুরুত্ব দেয়, আয়-বৈষম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তরুণদের জন্য ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে তবেই প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন সম্ভব। অতএব, সময় এসেছে উন্নয়নের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবার। সংখ্যার উন্নয়ন নয়, চাই মানুষের উন্নয়ন এই দর্শনই হোক আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যাত্রার মূলমন্ত্র।

লেখক : শিক্ষার্থী. গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়