সুদীপ্ত শামীম

  ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

দৃষ্টিপাত

তিস্তার দিকে তাকিয়ে : সমস্যার গভীরে সমাধানের খোঁজে

তিস্তা নদী কেবল একটি ভূগোলের অংশ নয়, এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একসময় প্রাচুর্যে ভরা এ নদী ছিল কৃষি, মৎস্য ও পরিবহন ব্যবস্থার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু আজ এ নদী সংকটে- জলবণ্টন চুক্তির অভাব, নদীভাঙন, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায় নিয়ন্ত্রিত বন্যার কারণে। এ সংকটের পেছনে রয়েছে একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক জটিলতা এবং নদীর রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। নানা আলোচনার পরও কার্যকর সমাধান না হওয়ায় তিস্তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে, ফলে লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা অনিশ্চিত।

তিস্তা চুক্তি : দীর্ঘদিনের জটিলতা ও সংকটের সমাধানহীনতা

তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য জীবনরেখার মতো। কিন্তু ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে তিস্তার পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীটি রিক্ত ও বর্ষায় কৃত্রিম বন্যায় প্লাবিত হয়। এ দ্বৈত সমস্যায় তিস্তা অববাহিকার লাখ লাখ মানুষ প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১১ সালে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশ ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভারত ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ পানি পাবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে চুক্তিটি আর আলোর মুখ দেখেনি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও রাজ্য সরকারের সঙ্গে বিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিলতা পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে তুলেছে। এর ফলে তিস্তা নদীকেন্দ্রিক কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটের কারণে প্রায় ১০ লাখ হেক্টর কৃষি জমি সেচবঞ্চিত থাকে। এতে করে তিস্তা তীরবর্তী গ্রামগুলোতে খাদ্য উৎপাদন কমে যায়, জীবিকার সুযোগ সংকুচিত হয় এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসে। অন্যদিকে বর্ষার সময় গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ায় কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়, যা মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল এবং জীবিকা ধ্বংস করে। তিস্তা সমস্যার টেকসই সমাধান ছাড়া এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়। তবে চুক্তির অমীমাংসিত পরিস্থিতি দুদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আন্তঃরাজনৈতিক সমঝোতাই এ সংকট সমাধানের একমাত্র কার্যকর পথ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা : আশা নাকি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ?

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের উত্তরের মানুষের জন্য নতুন আশা নিয়ে এসেছে। নদীর গভীরতা বৃদ্ধি, জলাধার নির্মাণ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, ভাঙন রোধ, কৃষি শিল্পায়ন এবং পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট ও বর্ষায় বন্যার সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে এটি প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০২০ সালে চীনের পাওয়ার চায়না তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য একটি কারিগরি প্রস্তাব দেয়, যার মাধ্যমে নদীর পাড়ে নৌ ও সড়ক যোগাযোগ উন্নতি এবং কৃষি শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। তবে চীনের সম্পৃক্ততা ভারতকে উদ্বেগে ফেলেছে, কারণ ভারতের দৃষ্টিতে এটি কৌশলগতভাবে উত্তরের অববাহিকায় চীনের প্রভাব বিস্তার করবে। বাংলাদেশ সরকারের জন্য এ প্রকল্প বাস্তবায়ন এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি সংবেদনশীল ইস্যু। ভারত ও চীনের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ও ভারতের আপত্তি মেনে চলা বা না চলার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে প্রভাবিত করবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন এখন জরুরি।

রাজনৈতিক সমীকরণ ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

তিস্তা সমস্যার মূলে শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, চীনের সম্পৃক্ততাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীনের আগ্রহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এ প্রকল্পের মাধ্যমে আরো ঘনিষ্ঠ হতে পারে, যা কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর বিপরীতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারত তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে তাদের উত্তর-পূর্ব রাজ্যের জন্য নিরাপত্তাজনিত হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডর, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করে, তার ওপর চীনের সম্ভাব্য প্রভাব ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, বাংলাদেশে চীনের বর্ধিত ভূমিকা কৌশলগত ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে।

অন্যদিকে চীনের সঙ্গে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক ঝুঁকিও কম নয়। চীনের প্রস্তাবিত ঋণের উচ্চ সুদহার এবং স্বল্পমেয়াদি পরিশোধের শর্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর আগে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং পাকিস্তানের মতো দেশগুলো চীনের ঋণজালে আটকা পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের ঋণের শর্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকেও তেমন সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের উচিত একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করা। ভারত ও চীনের মধ্যকার প্রতিযোগিতামূলক ভূ-রাজনীতিকে মাথায় রেখে প্রকল্প বাস্তবায়নে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হওয়া এবং চীনের সহায়তায় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্যে একটি সুষম সমাধান খুঁজে পাওয়া বাংলাদেশের জন্য সময়ের দাবি। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি নিজেদের আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায় তিস্তা সমস্যার সমাধান শুধু একটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকে যাবে এবং তিস্তা অববাহিকার মানুষের জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

তিস্তা অববাহিকার মানুষের প্রত্যাশা

তিস্তা পাড়ের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা একটিই- তাদের নদী ফিরে পাক তার প্রাণ। তারা বিশ্বাস করে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কেবল পানির সমস্যা সমাধান নয়, বরং এর মাধ্যমে নদীভাঙন রোধ, কৃষিজমি উদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। এ অঞ্চলের মানুষ মনে করে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্রে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হয়ত শুষ্ক মৌসুমে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে, কিন্তু তা তিস্তার কান্নার স্থায়ী সমাধান নয়। বর্ষাকালে নিয়ন্ত্রিত বন্যার কারণে হাজারো পরিবার তাদের বসতভিটা ও জমি হারায়। ভাঙন ও বন্যার শিকার এসব মানুষ কেবল ত্রাণ নয়, টেকসই সমাধানের প্রত্যাশা করে।

পথ খোঁজার সময় এসেছে

তিস্তার দীর্ঘদিনের কান্না আর সহ্য করার মতো নয়। এ নদীকে রক্ষা করতে হলে পানির ন্যায্য বণ্টনের পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন অপরিহার্য। তবে এটি কোনো নির্ভরশীল পরিকল্পনা নয়- বাংলাদেশের উচিত নিজেদের অর্থায়ন ও কারিগরি সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া। আন্তর্জাতিক অর্থায়নে নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রচেষ্টায় টেকসই সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া সময়ের দাবি। তিস্তার অববাহিকার মানুষের দাবি স্পষ্ট : তারা চায় না আর ভাঙন, বন্যা বা পানির সংকট। তারা চায় উন্নয়নের স্রোতে নিজেদের অংশীদার করতে। তারা স্বপ্ন দেখে এমন একটি তিস্তার, যা তাদের জীবন ও জীবিকার কেন্দ্রবিন্দুতে আবারও ফিরে আসবে।

নদীর নতুন যাত্রা

তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবনের গল্প। একদিকে এটি কৃষি, পরিবহন এবং মৎস্যজীবীদের জন্য অমূল্য, অন্যদিকে এটি এখন এক গভীর সংকটের সম্মুখীন। তিস্তার কান্না থামিয়ে এবং এর সম্ভাবনাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের অপরিহার্য চাহিদা। নদীটির টেকসই রক্ষা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে, তিস্তা পুনরুজ্জীবিত হতে পারে এবং তার অববাহিকায় বসবাসকারী জনগণের জীবনমানের উন্নতি ঘটাতে পারে। তিস্তার পুনর্গঠনের মাধ্যমে শুধু নদীই নয়, বরং সেই নদীকে কেন্দ্র্র করে গড়ে ওঠা এক সমৃদ্ধ, স্বয়ংসম্পূর্ণ সমাজের নতুন সূচনা হতে পারে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী, কলাম লেখক ও সংগঠক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়