জুয়েল আশরাফ

  ২৬ নভেম্বর, ২০২১

সুগন্ধি রুমাল

রাশেদ গ্রামের বাড়িতে ফিরল প্রায় উনিশ বছর পর। বাড়িটা বয়সের ভারে ধুঁকছে। চামড়া, মাংস খসে পড়া কঙ্কালসার বাড়ির বাগানে এক হাঁটু কাঁটাঝোপের জঙ্গল গজিয়েছে। পশ্চিম কোনার সুপারিগাছ দুটি মাটি থেকে উপড়ে বাগানেই পড়ে শুকিয়ে গেছে। দাদার কেনা জমির ওপর রাশেদের বাবা কষ্টার্জিত সঞ্চয় দিয়ে বাড়িটা তৈরি করিয়েছিলেন। তখন গ্রামে পাকা বাড়ি খুব বেশি ছিল না। রাশেদদের পাড়ায় কয়েক ঘর গৃহস্থের বাস ছিল। ছিল কাঁচা রাস্তার দুই ধারে তাল, সুপারি, নারকেলগাছের সারি। এখন গ্রামের দৃশ্য পাল্টে গেছে। বাস থেকে নেমেই রাশেদ দেখল গ্রামে পিচের রাস্তা হয়েছে। ঈদগাহ মসজিদ পাকা হয়েছে। গ্রামের একমাত্র রজ্জবের ধানকল-ঘর কোনকালে বিক্রি হয়ে ছোট্ট শপিং মল হয়েছে। রাশেদদের পাড়ায় যাওয়ার রাস্তার দুই পাশে বড় বড় দুটি পুকুর ছিল। লোকে বলত জোড়া পুকুর। রাশেদ সেই জোড়া পুকুর খুঁজে পাচ্ছিল না। পথচলতি এক বৃদ্ধ রাশেদকে প্রশ্ন করলেন, কী খুঁজছো বাবা?

রাশেদ সপ্রতিভ হয়ে বলল, জোড়া পুকুর।

লোকটি মৃদু হেসে বলল, সে তো কবেই ড্রেজার মেশিনে বালিতে ভরাট হয়ে গেছে। সেখানে এখন দোকানপাট উঠেছে, ওই তো দেখো।

বলতে বলতেই লোকটি চলে গেল। লোকটির আঙুল অনুসরণ করল রাশেদ। সারি সারি দোকানঘর ছাড়া পুকুরের চিহ্নমাত্র নেই। অথচ এই পুকুরেই রিতা নূপুরের এক জোড়ার একটি হারিয়ে ফেলেছিল। কবেকার সেসব কথা। রিতার সেদিনের মুখটা মনে পড়তেই ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল।

রিতার সুন্দর ফ্রকের নিচে ফরসা নগ্ন পা দুটি বকের মতো লম্বা ছিল। আর ফ্রকের হাতা ঘটিহাতা। শেফালি চাচি সেলাই মেশিনে বানিয়ে দিত। তাই সে নিত্যনতুন ফ্রক পরে স্কুলে আসত। লম্বা লম্বা পা ফেলে হেঁটে যেত। সারা শরীর থেকে অদ্ভুত অচেনা মিষ্টি সুবাস বের হতো। অনেককেই রিতাকে কাছ দিয়ে চলে গেলে নাক টেনে গন্ধ নিতে দেখেছে রাশেদ। গন্ধটা কীসের, জানতে চাইলে রিতা মুচকি হেসে এড়িয়ে যেত। এক দিন একান্তে ফিসফিস করে বলল, বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রাখি। তাই অমন গন্ধ। তোকে এক দিন দেখাব।

সেদিন রিতার কথার গূঢ় অর্থ রাশেদের মোটা মাথায় ঢোকেনি। সে বুঝতে পারেনি, রুমাল আবার দেখানোর আছেটা কী! যদিও তখনো তার কোনো রুমাল ছিল না। বাবার শার্টের পকেটে একটা সাদা রুমাল থাকতে দেখেছে সে। কিন্তু তাতে সব সময় মসলার হলুদ দাগ লেগে থাকত। কোনো অনুষ্ঠানে খাবার শেষে চর্বি হাতটি বাবা সাবান-হাতে না ধুয়েই রুমালে মুছে ফেলতেন। তা নিয়ে মা কতবার যে রাগ করতেন!

একজন সদ্য নারী হয়ে ওঠা মেয়ের আঙুলের সঙ্গে নিজের আঙুলের প্রথম স্পর্শ হলে শরীরের ভেতরটা যেন কেমন করে ওঠে! বহুবার রিতার শুধু আঙুল নয়, তার করতলও তার করতলে আত্মগোপন করেছে। অথচ সেদিন সেসবের কোনো বিশেষ অনুভূতি ছিল না। তবে তত দিনে রাশেদের শরতের ‘দত্তা’ পড়া হয়ে গেছে। স্কুলে গিয়ে বই চাপা দিয়ে পড়ত। রিতাই তাকে পড়তে বলেছিল। তারা দুজনেই তখন ক্লাস টেনে। তাহমিনার থেকে নার্গিসকে তার বেশি মনে ধরেছিল। মনের মধ্যে অমন একটা তীক্ষ্ণ ডাগর চোখের চাউনি অনুভব করত। আর সেখানে বসিয়ে দিত রিতাকে। সারা শরীরে একটা শিহরণ খেলে যেত।

বহু বছর পর রাশেদ গ্রামে এসেছে। বাবার সঙ্গে নানা দেশ ঘুরে এখন কানাডাবাসী। আর সে চলে গেছে একেবারে দেশের বাইরে। বছরে একবারও দেশে আসা হয় না। এতগুলো বছর তবু সে রিতাকে ভোলেনি। রিতার সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না। শুনেছে রিতার বাবাও এখান থেকে চলে গিয়ে শহরে বাড়ি করেছে। কিন্তু রিতা যায়নি। অথচ কেন যায়নি, তার ইতিহাস জানে রাশেদ। আর একবার ফেলে আসা স্মৃতির ঝাঁপি থেকে তার রিতাকে খুঁজতেই চলে এসেছে রাশেদ সেই অখ্যাত গ্রামে।

জানত কোনো গ্রামই আগের মতো থাকে না। অফিস ঘরগুলো এগিয়ে এসেছে বড় রাস্তার কাছে। মাটির অনেক বাড়ি আজ পাকা। গ্রামের শেষ প্রান্তে বিশাল আমবাগান আর নেই, ধানি জমি হয়ে গেছে। যে গাবগাছটা তখনই ছিল একশো বছর, সেটাও পলকা ঝড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। হারিয়ে গিয়েছিল জলপাই-চালতাগাছগুলোও।

রাশেদকে তেমনভাবে কেউ চিনতে পারেনি। তবে গ্রামের মানুষের কৌতূহল বেশি বলেই তারা বাবুলের চায়ের দোকান থেকে বারবার উঁকি মেরে তাকে দেখছিল। রাশেদ একা একাই ঘুরছিল। অবাক হলো খেলার মাঠের কাছে এসে। না আছে খেলার মাঠ, না আছে বটগাছ! একটা হয়ে গেছে

ফ্রিজ-ফার্নিচারের শোরুম, আর একটা হেলথ সেন্টার। এভাবে ওদের অপভ্রংশ হয়ে যেতে দেখে তার বুকটা টনটন করে উঠল।

দু-একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বুঝতে পারল, রিতা কোনো বাড়ির বউ হয়েছে। তাই তার সেই বাড়িটা চিনে নিতে বিশেষ বেগ পেতে হলো না। শরিকি ভাগ হতে হতে এখন এক চিলতে হয়ে গেছে। বাঁশের বাতার বেড়া ঠেলে আঙিনায় পা দিতেই দেখল একজন চল্লিশোর্ধ্ব নারী ঘরের সামনের ফাঁকা জায়গায় পুঁইয়ের মাচা ঠিকঠাক করছে। তাকে জিজ্ঞেস করতে যাবে এমন সময় সে মাথা তুলে রাশেদকে দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি মাথায় ওড়নাটা টেনে উঠে দাঁড়াল।

রাশেদ অস্ফুট স্বরে জানতে চাইল, এখানে রিতা নামে কেউ থাকে কি না।

নারী কিছু না বলে দড়ি-ছুরি নিয়ে চলে গেল। চাপকলে হাত ধুয়ে আবার ফিরে এসে বলল, আপনি কার নাম বললেন?

তাহলে কি ভুল বাড়িতে এলাম! খানিক ভেবে পরে রাশেদ বলল, রিতা!

নারী এবারও কোনো কথা না বলে বারান্দায় রাখা চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে বলল, বসুন।

রাশেদ বসল, তবে তার অশান্ত চোখ দুটি বাড়ির আনাচে-কানাচে সেই পরিচিত মুখটাকে খুঁজে চলেছে। সারা বাড়িটাই বড় নিস্তব্ধ। যেন এ মুহূর্তে বাড়িতে আর কেউ নেই। নারী এসে আরেকটি চেয়ারে বসে বলল, আপনি কোথা থেকে এসেছেন? আর কেনই বা রিতার খোঁজ করছেন?

সব মানুষেরই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গলার স্বর

ভাঙে-গড়ে। কিন্তু এ স্বর রাশেদের পরিচিত! তবু সে বলল, আমি আপাতত ঢাকা থেকে আসছি। আমি রাশেদ।

হঠাৎ দমকা বাতাসে যেমন গাছের শুকনো পাতা খসে পড়ে, তেমন করেই সেই নারীর মাথার ওড়না খসে পড়ে গেল। উদ্ভাসিত হয়ে উঠল সেই দুটি ডাগর চোখ। রাশেদের কাছে এসে হাত জড়িয়ে ধরে বলল, আমি জানতাম, তুমি এক দিন আমার খোঁজে আসবে! সেই তো এলে, যখন আমি ফুরিয়ে গেছি।

একে একে সব শুনল রাশেদ। রাশেদরা চলে যাওয়ার পর রিতার বাবার অনেক বড় অঙ্কের টাকার দেনা হয়ে পড়ে। টাকা পরিশোধ করতে না পারায় ঋণদাতা তার নেশাখোর চরিত্রহীন ছেলের জন্য রিতাকে চেয়ে বসে। এক প্রকার জোর-জবরদস্তি করেই রিতার বিয়ে হয়। বিয়ের আগের দিন রাতেই রিতা পালিয়ে রাশেদের কাছে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তার কাছে রাশেদের কোনো ঠিকানাই নেই। লজ্জা-ঘৃণায় রিতার বাবা এখানে জমিবাড়ি বিক্রি করে চলে যান। কিন্তু ঋণদাতার সেই নেশাখোর ছেলের সঙ্গে রিতার বিয়েও সাত মাসের বেশি টিকেনি। অধিক মদ্যপানে এক দিন রাস্তায় মরে পড়ে ছিল।

রিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল, তুমি কিন্তু চিরকাল সেই ভালো ছেলেটিই রয়ে গেলে। কোনো দিন একটা বিড়ি-সিগারেট ছুঁলে না, কোনো মেয়ের রুমালের গন্ধও পেলে না। রাশেদ চমকে উঠল। তাদের দুজনের বয়স অনেক গড়িয়ে গেছে। তবু খুব কাছ থেকে রাশেদ যেন আজও রিতার বুকের ভাঁজে রাখা সুগন্ধি রুমালের গন্ধ পেল।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close