মমিনুল ইসলাম, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ)
ময়মনসিংহের ত্রিশাল
বিষমুক্ত সবজি চাষে বীররামপুর গ্রামবাসীর সাফল্য

ভোরের আলো ফুটতেই ময়মনসিংহের ত্রিশালের বীররামপুর গ্রামের ফসলের মাঠজুড়ে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। কেউ সবজি তুলছেন, কেউ পরিচর্যায় ব্যস্ত, আবার কেউ বাজারে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চারদিকে চোখজুড়ানো সবুজের সমারোহ। তবে এ গ্রামের বিশেষত্ব শুধু সবজি উৎপাদনে নয়, বরং নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি চাষে।
গ্রামটিতে জৈব ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে কৃষকরা ব্যবহার করছেন সেক্স ফেরোমন ফাঁদ, হলুদ আঠালো ফাঁদসহ সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) প্রযুক্তি। ফলে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত হচ্ছে।
কৃষক ইউসুফ আলী তার প্রায় দুই একর জমিতে কচুর লতি, করলা, কাঁকরোল, বেগুন, ঢেঁড়স ও লাউসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপদ সবজি চাষ করছেন। তার মতো শতাধিক কৃষক বর্তমানে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। নিরাপদ পদ্ধতিতে উৎপাদিত হওয়ায় এসব সবজির বাজারমূল্যও তুলনামূলক বেশি পাচ্ছেন তারা।
বীররামপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। ভোর থেকে কৃষকরা ক্ষেত পরিচর্যা, ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে ব্যস্ত থাকেন। উৎপাদিত সবজি স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, রামপুরের কচুরলতি বিশেষভাবে পরিচিত। স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে এসব পণ্য সংগ্রহ করেন।
কৃষক ইউসুফ আলী বলেন, আগে বিভিন্ন রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করতাম। এতে উৎপাদন খরচ বেশি হতো এবং পরিবেশের ক্ষতি হতো। এখন কৃষি বিভাগের পরামর্শে আইপিএম ও জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছি। এতে উৎপাদন খরচ কমেছে, গুণগত মান বেড়েছে এবং বাজারে ভালো দামও পাচ্ছি।
ইউসুফের মা মালেকা বেগম বলেন, আমার পরিবারের সবাই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। ছেলের কৃষি কাজে আমরা মহিলারাও সহযোগিতা করি। নিরাপদ সবজি উৎপাদন করায় ক্রেতাদের আস্থা বেড়েছে, আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেগুন চাষি জহুর উদ্দিন বলেন, বিষমুক্ত বেগুন উৎপাদনে কিছুটা বেশি যত্ন লাগে। তবে বাজারে এর চাহিদা বেশি থাকায় আমরা লাভবান হচ্ছি। কৃষি কাজ করেই ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষিত করেছি।
কচুরলতি চাষি ইবরাহিম খলিল বলেন, রামপুরের কচুর লতির আলাদা সুনাম রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে ক্ষেত থেকেই লতি কিনে নিয়ে যান। নিরাপদ পদ্ধতিতে চাষ করায় ক্রেতাদের আস্থা ও চাহিদা দুটোই বেড়েছে।
ত্রিশাল উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা হাম্মিম জাহান বলেন, রামপুর ইউনিয়নের বীররামপুর গ্রামকে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের একটি মডেল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে গ্রামটি বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি গ্রাম হিসেবে বেশ পরিচিতি পেয়েছে। কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আইপিএম প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আশা করছেন, বীররামপুরের এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য এলাকাতেও নিরাপদ সবজি চাষ সম্প্রসারণে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। কৃষক, কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বীররামপুর ইতোমধ্যে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
"






































