হাসান ইমন

  ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু মোকাবিলায় তৎপর দুই সিটি করপোরেশন

করোনা মহামারির মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় দুশ্চিন্তায় নগরবাসী। চলতি বছরে মৃত্যুর তালিকা ক্রমেই বাড়ছে। এডিস মশার বিস্তার রয়েছে সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে। মশার লার্ভা ধ্বংসে দুই সিটি করপোরেশনের নানা কার্যক্রম নেওয়া হলেও কোনো অবস্থাতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু। এরই মধ্যে গত দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান ও পার্শ্ববর্তী স্থানে বেড়েছে এডিসের বংশবিস্তার। দুই সিটিতে সহস্রাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ডেঙ্গুর এই সময়ে ওষুধ স্প্রে করতে পারেনি সিটি করপোরেশন। এমন অবস্থায় স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার আগেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মশার ওষুধ স্প্রে করছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

জানা যায়, করোনার কারণে দেড় বছরের বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ক্লাসরুম, টয়লেট, খেলার মাঠ ও ছাদসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চারপাশে জমে থাকা পানিতে বিস্তার ঘটেছে এডিস মশার। এসব স্থান থেকেও এডিস মশা নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়েছে। এরই মধ্যে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে খুলবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে শিক্ষার্থীরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে। এখনো অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থী বাসায় থাকার কারণে ডেঙ্গুতে তেমন একটা আক্রান্ত হননি। তবে স্কুল-কলেজ খুললে সেখানে শিক্ষার্থীরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রুম, ছাদ, টয়লেট ও আশপাশে পরিষ্কার করা হয়নি। এসব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মশার কীটনাশক প্রয়োগ না করে স্কুল খুললে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিতে থাকবে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত আগস্ট মাসে এই মৌসুমের সর্বোচ্চ সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। গত মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭ হাজার ৬৯৮ জন রোগী। মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের। তবে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরো বেড়েছে। চলতি মাসের এই ১০ দিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৮৯৯ জন। একই সময়ে ৮ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গুতে কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি। তবে জুলাই থেকে সোয়া দুই মাসেই ৫৪ জন মারা গেছেন ডেঙ্গুতে।

সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্ট্যাডিজের (সিজিএস) চেয়ারম্যান ও কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, এই মুহূর্তে রাজধানীর স্কুলগুলো হচ্ছে ডেঙ্গু সংক্রমণের স্থান। সেখানে মশা থাকলে বাচ্চারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে। বাচ্চারা এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে পারে না। ফলে ভাইরাসবাহিত কোনো মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হতে পারে। অনেক স্কুল-কলেজ ও পার্শ্ববর্তী স্থানে পানি জমে থাকে। এতে এডিসের বিস্তার রয়েছে। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকরা সচেতন হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে প্রথমত লার্ভিসাইডিং করতে হবে। অ্যাডাল্টিসাইটিং করতে হবে। দেখতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মশা আছে কিনা। স্কুলের যেসব ছাত্রছাত্রী হাফ প্যান্ট ও হাফ শার্ট পরে তাদের এই ডেঙ্গুর সময়ে ড্রেস কোট রিলাক্স করে দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন ফুলহাতা ড্রেস ও মোজা পরে সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। আর এই সময়ে কারো জ্বর হলে সঙ্গে সঙ্গে তা পরীক্ষা করাতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পাবে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন থেকে নেওয়া কোনো পদক্ষেপই কার্যকরী নয়। তারা যে উপায়ে মশা নিধন করতে যাচ্ছেন এটা অনেকটা হাস্যকর। তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। এতে রোগী আরো বাড়ছে। ঢাকার সরকারি-বেসরকারি ৪১টি হাসপাতালের তথ্য দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাস্তবে ঢাকায় ১ হাজারের বেশি হাসপাতাল ও ক্লিনিক আছে। ফলে ডেঙ্গু রোগীর সঠিক সংখ্যা প্রকাশ পায় না। এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রোগীর যে তথ্য দিচ্ছে বাস্তবে রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগী অনেক বেশি। এবার ২৫ থেকে ৩০ হাজার রোগী হবে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। করোনাকালীনও আমরা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইটিং করেছি। এখন যেহেতু সব স্কুল-কলেজ খুলছে, এসব স্থানে নিয়মিত তদারকি করা হবে। যাতে শিক্ষার্থীদের কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হন। তিনি বলেন, ২০১৯ সালের আগস্টে ডেঙ্গু রোগী ছিল ৫২ হাজার। এ বছর ১০ হাজারের চাইতে কম। সিটি করপোরেশনের নিয়মিত অভিযানও কীটনাশক প্রয়োগের কারণে ডেঙ্গু কমেছে।

গতকাল এক অনুষ্ঠানে ডিএনসিসি মেয়র মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার আগেই ডিএনসিসি এলাকার প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটা শ্রেণিকক্ষে ফগিং ও স্প্রে করা এবং খেলার মাঠ ও ছাদসহ প্রতিষ্ঠানগুলোর চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি টয়লেট কিংবা অন্য কোথাও পানি জমে থাকলে সেখানে লার্ভিসাইডিং করা হবে।

তিনি বলেন, সরকারি, বেসরকারি ও আধাসরকারি মোট ৪৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের গতকাল শুক্রবার শেষ দিন হলেও যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণটিকার আওতায় ডোজ দেওয়া কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলোতে আগামীকাল শনিবার বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close