ক্রীড়া ডেস্ক

  ২৪ জুন, ২০২৬

ফুটবল যেন মেসির জন্যই

গ্যালারিভর্তি দর্শকের কানফাটানো চিৎকার; কিন্তু তা আচমকাই স্তব্ধ। টানটান উত্তেজনা, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। ঠিক তখনই সবুজ গালিচায় শুরু হলো সেই অতিমানবিক জাদু। প্রতিপক্ষের তিন-চারজন ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ের মায়াজালে বোকা বানিয়ে শরীরী মোচড়ে বলটাকে যেভাবে তিনি জালে জড়ালেন, তা শুধু গোল নয়- যেন ক্যানভাসে আঁকা কোনো নিখুঁত শিল্পকর্ম। ধারাভাষ্যকার মাইক্রোফোনে চিৎকার করে উঠলেন, আর ফুটবলপ্রেমীরা স্তব্ধ হয়ে ভাবলেন- এ মানুষটা কি আসলেই এই গ্রহের?

এমন ঘটনা হরহামেশাই লিওনেল আন্দ্রেস মেসি ঘটান। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গত সোমবার রাতে ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ৮ মিনিট। ডালাস স্টেডিয়ামের গ্যালারিজুড়ে একলহমায় নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। পেনাল্টি স্পট থেকে নেওয়া লিওনেল মেসির শটটি যখন পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে গেল, তখন অনেক আর্জেন্টাইন সমর্থকই হয়তো নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তবে ফুটবল ঈশ্বর যার জন্য রাজকীয় এক মঞ্চ আগে থেকেই সাজিয়ে রেখেছেন, তাকে কি আর একটা পেনাল্টি মিসের বৃত্তে আটকে রাখা যায়?

ম্যাচের ৩৮ মিনিটে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ফাকুন্দো মেদিনার বাড়ানো নিখুঁত পাস বাঁ-পায়ের এক জাদুকরী ভলিতে অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগারকে পরাস্ত করলেন। বল যখন জালের বাম কোণায় আশ্রয় নিল, তখন শুধু ডালাস স্টেডিয়ামই নয়, যেন কেঁপে উঠল গোটা ফুটবল বিশ্ব। সঙ্গে সঙ্গেই জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে পেছনে ফেলে ১৭ গোল নিয়ে এককভাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান মেসি।

শেষ বাঁশি বাজার আগ মুহূর্তে যা করলেন, এর আগে আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের দ্বিতীয় গোলের কথাই মনে পড়ে গেল। একাধিকবার বল ফিরে আসার পর বল জালে পাঠালেন লিওনেল মেসি, যেন তিনি জানতেন বল পজিশনে ফেরত আসবে, তার আগেই তিনি সেখানে হাজির। দুই ম্যাচে ৫ গোল। আলজেরিয়া ০, মেসি ৩। অস্ট্রিয়া ০, মেসি ২। এ অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দেখার পর আরো একবার ফুটবল বিশ্বের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি হচ্ছে, সেই পুরোনো সত্যটা। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসেও মাঠের দখলটা যেভাবে নিজের পায়ে রাখেন, তা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করা ছাড়া উপায় থাকে না।

আসলে শুধু এ ম্যাচটিই-বা কেন? যদি পুরো ক্যারিয়ারের টাইমলাইনটার দিকে তাকানো যায়, তবে দেখা যাবে ফুটবল খেলাটার সংজ্ঞাটাই তিনি বদলে দিয়েছেন গত দুটি দশকে। রোজারিওর সেই ছোট-খাটো ছেলেটি, যার হরমোনের সমস্যার কারণে ফুটবলার হওয়াই অনিশ্চিত ছিল, সে-ই এক দিন পায়ের জাদুতে পুরো পৃথিবীকে শাসন করবে, তা কোনো রূপকথার চেয়ে কম ছিল না। বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক রেকর্ড ভাঙা, লা লিগা বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফিগুলোকে হাতের খেলনা বানিয়ে ফেলা কিংবা রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি’অর জয়ের কীর্তি- সবকিছুই লিওনেল মেসিকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।

একটা সময় সমালোচকরা বলতেন, ‘মেসি ক্লাবের হয়ে যতটা উজ্জ্বল, দেশের জার্সিতে ততটা নন।’ কোপা আমেরিকা কিংবা বিশ্বকাপের ফাইনালে গিয়েও বারবার ট্রফি ছোঁয়ার দূরত্ব থেকে ফিরে আসা লিওনেলকে নিয়ে ট্রল করতে ছাড়েনি নিন্দুকরা। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল হারের পর যখন তিনি চোখের জলে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন, তখন মনে হয়েছিল- মহাকাব্যের শেষটা বুঝি ট্র্যাজেডিতেই হচ্ছে।

কিন্তু যার গল্প স্বয়ং নিয়তি লেখে, তার শেষটা কি এত সহজে হয়? ফুটবল দেবতা হয়তো মেসির হাতে একটা বিশ্বকাপ না দিয়ে খেলাটার প্রতি অবিচার করতে চাননি। তাই তো তিনি ফিরে এলেন। ২০২১ কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে যে মহাকাব্যের পুনরুত্থান শুরু হয়েছিল, ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর লুসাইল স্টেডিয়ামে তা পূর্ণতা পায়। সোনালি ট্রফিটা হাতে নিয়ে মেসির সেই স্বর্গীয় হাসি কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের চোখকে অশ্রুসিক্ত করেছিল। ফুটবল যেন সেদিন তার নিজের ঋণ শোধ করেছিল জাদুকরের কাছে।

এ অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর গ্যালারির গণ্ডি পেরিয়ে চায়ের কাপে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটাও আলোচনা- মেসি যা খেলছেন, তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিটি ম্যাচেই তিনি যেভাবে ফুটবলে বুঁদ করছেন, তাতে ফুটবল নামক খেলাটাই ধন্য হয়েছে। ফুটবল খেলাটা হয়তো যুগে যুগে অনেক কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছে, কিন্তু এ মানুষটার খেলা দেখার পর মনের গহিন থেকে ফুটবল রোমান্টিকরা হয়তো বলে উঠছেন- ‘মাঝে মাঝে মনে হয়, ফুটবলটা শুধু অবিশ্বাস্য মেসির জন্যই!’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়