ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপে সবচেয়ে দামি কোচ যারা

আন্তর্জাতিক ফুটবলে সাফল্যের কোনো সুনির্দিষ্ট মূল্যতালিকা হয় না। দেশের জার্সিতে একটা ট্রফি এনে দেওয়ার গৌরব অমূল্য। কিন্তু সেই ‘অমূল্য’ গৌরব অর্জনের জন্য দলগুলোর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন যে পরিমাণ অর্থ খরচ করতে রাজি, তা শুনলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। মাঠে নামার অপেক্ষায় থাকা ২০২৬ বিশ্বকাপে ডাগআউটে দাঁড়ানো কোচদের পেছনে টাকার বস্তা ঢালছে দলগুলো।
সম্প্রতি ফুটবলার ও কোচদের বেতন সংক্রান্ত তথ্য ফাঁস করা প্রতিষ্ঠান ‘সিলারি লিকসের’ বরাতে প্ল্যানেট ফুটবল প্রকাশ করেছে এবারের বিশ্বকাপের শীর্ষ ১০ সর্বোচ্চ বেতনধারী কোচের তালিকা। যেখানে অবধারিতভাবেই রাজত্ব করছেন ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে রাজত্ব করে আসা হাইপ্রোফাইল মাস্টারমাইন্ডরা। তবে তালিকায় যেমন কিছু আকাশচুম্বী অঙ্কের চমক আছে, তেমনি আছে বড় বড় কিছু নামের অনুপস্থিতিও।
বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম ফেবারিট স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এই শীর্ষ দশের তালিকায় জায়গা পাননি। এমনকি স্বাগতিক মেক্সিকো বা কানাডার কোচদের নামও নেই এ তালিকায়। চলুন দেখে নেওয়া যাক বিশ্বকাপের সবচেয়ে দামি ১০ কোচকে, যাদের ওপর ভরসা করে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে তাদের দেশ।
১. কার্লো আনচেলত্তি (ব্রাজিল)
বার্ষিক বেতন : ৮২ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড
সবাইকে ছাড়িয়ে তালিকার শীর্ষে ‘ডন কার্লো’। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ও বর্ণাঢ্য কোচিং ক্যারিয়ারের শেষবেলায় এসে ব্রাজিলের মতো দলের দায়িত্ব নেওয়া এবং সঙ্গে এই আকাশচুম্বী বেতন- আনচেলত্তির জন্য এর চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে! ফুটবল ইতিহাসের কোনো বিদেশি কোচ আজ পর্যন্ত কোনো দেশকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারেননি। কিন্তু রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী এবং ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগেরই শিরোপাজয়ী একমাত্র কোচ আনচেলত্তির হাত ধরে সেই ইতিহাস এবার বদলাবে বলেই বিশ্বাস সেলেসাওদের। দল নির্বাচন নিয়ে ব্রাজিলে কিছুটা বিতর্ক হলেও, হেক্সা মিশনের জন্য আনচেলত্তির ওপর অন্ধ বিশ্বাস রেখে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তার চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সিবিএফ)। আর সেই বিশ্বাসের মূল্য হিসেবেই তাকে দেওয়া হচ্ছে এই রেকর্ড পরিমাণ অর্থ।
২. টমাস টুখেল (ইংল্যান্ড)
বার্ষিক বেতন : ৫০ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড
গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনে বারবার জয়ের খুব কাছে গিয়েও ট্রফি ছোঁয়া হয়নি থ্রি লায়ন্সদের। সাউথগেটের বিদায়ের পর ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ঋঅ) তাই কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যায়নি; সরাসরি বাজারের অন্যতম সেরা ও ট্যাকটিক্যালি নিখুঁত কোচ টমাস টুখেলকে দলে ভিড়িয়েছে। নকআউট বা অল-অর নাথিং ম্যাচে টুখেলের রেকর্ড দুর্দান্ত- পিএসজি ও চেলসিকে নিয়ে খেলেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল, চেলসির হয়ে জিতেছেনও। পিএসজি, চেলসি ও বায়ার্ন মিউনিখের ডাগআউট সামলানো টুখেলকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে টানতে এমন ‘দানবীয়’ অঙ্কের প্রস্তাবই দিতে হতো ইংলিশ বোর্ডকে।
৩. মাউরিসিও পচেত্তিনো (যুক্তরাষ্ট্র)
বার্ষিক বেতন : ৪৫ লাখ ৩০ হাজার পাউন্ড
তালিকার শীর্ষ তিনের দিকে তাকালে একটা মিল স্পষ্ট- এরা সবাই ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের এলিট পর্যায় মাতিয়ে এসেছেন। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ, তাই এবার কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একের পর এক ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বের হতে তারা পচেত্তিনোর মতো বড় নামকে ডাগআউটে নিয়ে এসেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে পচেত্তিনো বনে গেছেন মার্কিন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি কোচ। বিশ্বকাপের টিকিটের চড়া দামের মতো পচেত্তিনোর এই চড়া দামের সুবিচার এই আর্জেন্টাইন মাস্টারমাইন্ড মাঠে করতে পারেন কি না, তার উত্তর দেবে সময়।
৪. জুলিয়ান নাগেলসম্যান (জার্মানি)
বার্ষিক বেতন : ৪২ লাখ পাউন্ড
বয়স এখনো চল্লিশের কোঠায় পৌঁছায়নি, কিন্তু এই বয়সেই নিজের প্রজন্মের অন্যতম সেরা কৌশলবিদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নাগেলসম্যান। হফেনহেইম, লিপজিগ ও বায়ার্ন মিউনিখের মতো ক্লাবে আধুনিক ট্যাকটিকস দেখিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়া এই কোচকে নিজেদের ডাগআউটে ধরে রাখতে কোনো কার্পণ্য করেনি জার্মানি। ২০২৮ ইউরো পর্যন্ত ডাই মানশাফটদের সঙ্গে চুক্তি থাকা নাগেলসম্যানের হাত ধরে জার্মানি তাদের হারানো গৌরব ফিরে পায় কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
৫. ফ্যাবিও ক্যানাভারো (উজবেকিস্তান) তালিকার সবচেয়ে বড় চমক
বার্ষিক বেতন : ৩৫ লাখ পাউন্ড
২০০৬ সালে ইতালির রক্ষণভাগ আগলে রেখে বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন ক্যানাভারো। ঠিক ২০ বছর পর তিনি আবারও বিশ্বকাপে ফিরছেন, তবে ইতালির হয়ে নয়, সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তানের কোচ হিসেবে! আল নাসর, চীন, দিনামো জাগ্রেব, উদিনেস ঘুরে ক্যানাভারো এখন উজবেকিস্তানে। মজার ব্যাপার হলো, উজবেকিস্তানকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে তোলার পেছনে ক্যানাভারোর কোনো ভূমিকা ছিল না। বাছাইপর্ব পার করেছিলেন স্থানীয় কোচ তিমুর কাপাদজে। কিন্তু চূড়ান্ত মঞ্চের জন্য উজবেক বোর্ড একজন হাইপ্রোফাইল ও অভিজ্ঞ কোচের খোঁজে ক্যানাভারোকে ডাগআউটে বসিয়েছে। গ্রুপ পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ পর্তুগাল, কলম্বিয়া ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো। নকআউটে যেতে পারলে ক্যানাভারোর পেছনে করা এই বিশাল বিনিয়োগ সার্থক হবে তাদের।
৬. রবার্তো মার্তিনেজ (পর্তুগাল)
বার্ষিক বেতন : ৩৫ লাখ পাউন্ড
বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মকে সোনালি ট্রফি এনে দিতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে পর্তুগালের দায়িত্ব নিয়েছিলেন রবার্তো মার্তিনেস। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দেশে এসে অবশ্য দ্রুতই সাফল্যের মুখ দেখেছেন, জিতেছেন ২০২৫ সালের নেশনস লিগ। প্রতিভায় ঠাসা এই পর্তুগাল দলকে এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে বহুদূর নিয়ে যাওয়ার চাপ রয়েছে তার ওপর। পর্তুগিজ বোর্ডও তাদের প্রত্যাশার সমান ওজনেই বেতন দিচ্ছে সাবেক এই এভারটন ও উইগান ম্যানেজারকে।
৭. দিদিয়ের দেশম (ফ্রান্স)
বার্ষিক বেতন : ৩৩ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড
দেশমের মতো বিশ্বকাপজয়ী কোচকে এই তালিকায় আরো ওপরের দিকে আশা করেছিলেন অনেকেই। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের অধিনায়ক এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কোচের ডাগআউট সামলাচ্ছেন। ফুটবলাঙ্গনের গুঞ্জন, এই বিশ্বকাপই হতে যাচ্ছে ফরাসি ডাগআউটে দেশমের শেষ মিশন। তার জায়গায় রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক সফল কোচ জিনেদিন জিদানের দায়িত্ব নেওয়াটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিন তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী ‘জিজু’ দায়িত্ব নিলে ফরাসি বোর্ডকে যে বেতনের অঙ্কটা আরো বাড়াতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।
৮. লিওনেল স্কালোনি (আর্জেন্টিনা)
বার্ষিক বেতন : ২৮ লাখ পাউন্ড
আর্জেন্টিনাকে কাতার বিশ্বকাপে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানানোর পরও স্কালোনি এই তালিকার ৮ নম্বরে- শুনতে কিছুটা অবিশ্বাস্য লাগাই স্বাভাবিক। আসলে স্কালোনি যখন দায়িত্ব নেন, তখন একের পর এক ভুল ও ব্যয়বহুল কোচ নিয়োগের কারণে আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) আর্থিকভাবে বেশ চাপে ছিল। তুলনামূলক কম খরচে ঘরের ছেলেকে দায়িত্ব দেওয়ার সেই ফাটকা যে এভাবে সোনা ফলাবে, তা কে জানত! ‘প্রয়োজনই আবিষ্কারের প্রসূতি’- উক্তিটি স্কালোনি ও আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে একদম শতভাগ সত্যি।
৯. মার্সেলো বিয়েলসা (উরুগুয়ে)
বার্ষিক বেতন : ২৬ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড
ফুটবলবিশ্বে ‘এল লোকো’ বা পাগল নামে পরিচিত মার্সেলো বিয়েলসা তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপ অভিযানে নামছেন। এর আগে ২০০২ সালে নিজের দেশ আর্জেন্টিনা এবং ২০১০ সালে চিলির ডাগআউটে ছিলেন তিনি। উরুগুয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে হারিয়ে দারুণ শুরু করেছিলেন। তবে বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচের আগে কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছুটা রহস্যের জন্ম দিয়েছেন তিনি। এবার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ের ভূত তাড়াতে চাইবেন বিয়েলসা।
১০. রোনাল্ড কোম্যান (নেদারল্যান্ডস)
বার্ষিক বেতন : ২৬ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড
২০১০ সালে বার্ট ভ্যান মারউইক ডাচদের বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছিলেন, কিন্তু টোটাল ফুটবলের ঐতিহ্য ধরে রাখতে না পারায় সমালোচকদের তীরে বিদ্ধ হতে হয়েছিল তাকে। তবে বার্সেলোনার মতো ক্লাবে দায়িত্ব পালন করা কোম্যানের জন্য ডাচ ফুটবল সংস্কৃতির এই চাপ নতুন কিছু নয়। নেদারল্যান্ডসের ডাগআউটে কোম্যানের দ্বিতীয় অধ্যায়টা সবসময় মসৃণ না হলেও, দেশের এই কিংবদন্তির ওপর ডাচ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন পূর্ণ আস্থা রেখেছে। শীর্ষ ধনীদের তালিকায় সবার শেষে থাকলেও তার পকেটে যাওয়া অঙ্কটা নেহায়েত ছোট নয়।
"









































