জাহিদ হাসান রানা

  ০৭ নভেম্বর, ২০২০

রাইসা ও খরগোশ-ছানা

হালকা হালকা ঠা-ার মধ্য দিয়ে শীতকাল যেন জানান দিচ্ছে আমি আসছি। শীতের কিছুটা দিন গ্রামের বাড়িতে কাটানোর জন্য রাইসা বাবা-মায়ের সাথে রাতের ট্রেনে রওনা দিয়েছে। রাইসা শহরের একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। শীতের ছুটি পেয়েই বায়না করে আমি দাদুবাড়ি যাব। তার বাবা-মা রাজি হয়ে গেলেন।

রাত ১০টায় ট্রেন ছাড়ল। রাইসা জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ায় তেমন কিছুই চোখে পড়ল না। শুধু মাঝেমধ্যে কয়েকটা ছোট ছোট চা দোকানের চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে রাইসা অজানা রাজ্যে চলে গেল। যে রাজ্যে কল্পনা করা যায় অনেক কিছু। কিন্তু একা। ঘুমের মধ্যে রাইসা দেখছে সে এক অচেনা রাজ্যে চলে গেছে। ঠিক যেন রূপকথার রাজ্য। সে একা একা হেঁটে চলেছে। তার আশপাশে শুধু হরেক রকম ফুলের গাছ। যে ফুল সে বাস্তবে কিংবা বইয়ের পাতায় কোথাও কখনোই দেখেনি। রাইসা ধীরে ধীরে একটা ফুলগাছের কাছে গেল। গাছ থেকে একটা ফুল ছিঁড়তেই শুনতে পেল, মামুণি ওঠো এবং কে যেন তার মাথায় হাত বোলাচ্ছে। ওমনি তার ঘুমটা ভেঙে গেল। ফুলটা আর নিয়ে আসা হলো না।

------
বাইরে তাকিয়ে আছে রাইসা। ভোরবেলা চারদিকে অনেক কুয়াশা জমে আছে। ট্রেনের ভেতর একটা লোক কিছু পানির বোতল আর কিছু কেক হাতে নিয়ে অন্যরকম সুরে পানি পানি করে হাঁক দিচ্ছে। ট্রেন থেমে গেল। সবাই চোখ কচলাতে-কচলাতে ট্রেন থেকে নেমে যাচ্ছে। রাইসা তার বাবা-মাসহ ব্যাগ নিয়ে নেমে গেল। ট্রেন থেকে নেমে তারা একটা হোটেলে গিয়ে মুখ-হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাশতা করে একটা অটো রিকশায় উঠল।

রাইসার বাবা অটোচালকের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছে যেন তারা আগে থেকেই পরিচিত। রাইসা তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, বাবা, তুমি এনাকে চেন? তার বাবা বলল, হ্যাঁ মামণি। তোমার আংকেল হন। তোমার দাদুর বাড়ির পাশেই থাকেন। মিনিট দশেক পর রাইসা পৌঁছে গেল তার দাদুবাড়ি। অটোচালককে ভাড়ার টাকা দিতে চাইলে সে নিতে নারাজ। রাইসার বাবা এক প্রকার জোর করেই টাকা দিলেন।

বাড়ির ভেতর থেকে রাইসার দাদু-দাদি, চাচা-চাচি আর চাচাতো ভাই অমি বেরিয়ে এলো। সবার মুখ খুশিতে অন্যরকম হয়ে গেছে। রাইসার বাবা-মা, দাদা-দাদিকে সালাম করে চাচা-চাচির সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। রাইসা বারান্দায় দেখল একটা সুন্দর খরগোশ খাঁচার মধ্যে বসে আছে। খরগোশটির কাছে গিয়ে সে একা একা কথা বলতে লাগল খরগোশটির সঙ্গে।

তার চাচাতো ভাই এগিয়ে গিয়ে বলল, বোনু, অনেকটা পথ গাড়িতে করে এলি। এখন ফ্রেশ হয়ে নাশতা করে বিশ্রাম নে। পরে দেখবি খরগোশ। রাইসা বলল, ভাইয়া, আমরা তো নাশতা করে এসেছি একটা হোটেলে। আচ্ছা ভাইয়া, খরগোশটির নাম কী? অমি বলল, এখনো তো নাম রাখা হয়নি রে পাগলি। রাইসা খরগোশটির নাম দিল পিকু। রাইসা দাদুবাড়ি এসে পিকুর সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। রাইসা তার বাবাকে বাজার থেকে একটা আপেল আনতে বলল। তার চাচি বলল, আপেল তো ফ্রিজেই আছে দাঁড়াও আমি এনে দিচ্ছি। সে আপেলটা খাঁচার ভেতর রেখে দিল। কিন্তু পিকু খাচ্ছে না। তাই সেই আপেলটি চার টুকরো করে দিল। কিন্তু এবারো পিকু আপেল খেল না। তার চাচাতো ভাই কিছু কচি ঘাস-পাতা এনে দিল। আর পিকু এখন খাচ্ছে। পিকুর ঘাস খাওয়া দেখে রাইসা ভীষণ খুশি হলো।

তিন দিন কেটে গেল।

রাইসা পিকুকে নিয়েই ব্যস্ত। পিকুর যেন ঠা-া না লাগে তাই সে ছোট কাঁথা তার গায়ে দিয়ে দিল। পিকুও এখন রাইসাকে ভালোবেসে ফেলেছে। পিকু একদৃষ্টিতে রাইসার দিকে তাকিয়ে থাকে।

রাইসা পিকুকে খাঁচার বাইরে বের করার কথা বললে অমি আর বাকি সবাই বলে, তাহলে তো তোমার পিকু দৌড় দিয়ে পালিয়ে যাবে।

কিন্তু কে শোনে কার কথা। রাইসার জিদের কাছে হার মানতে হয় সবাইকে। সবাই ভাবছে খাঁচা খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খরগোশটি পালিয়ে যাবে। কিন্তু নাহ। পিকু খাঁচার বাইরে এসে সোজা রাইসার কাছে গিয়ে তার জামা কামড়াচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে রাইসা তাকে কোলে তুলে নিল। সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে। সাত দিন পার হয়ে গেল। গ্রাম থেকে চলে যেতে হবে আবার শহরে। রাইসা ও তার বাবা-মা প্রস্তুত হয়ে চলে যাবে।

রাইসা পিকুকে কোলে তুলে নিয়ে খুব আদর করছে আর মুখটা ভার করে করে বলছে, পিকু, তুই ভালো থাকিস। আমি আবার আসব তোকে দেখতে। আমার সঙ্গে তো আর তোকে নিয়ে যেতে পারব না। সেখানে তো আর তোর খাওয়ার জন্য ঘাস পাব না। না খেয়ে তোর শরীরটা খারাপ করবে। আমিও তো তোকে নিয়ে যেতে চাই। কিন্তু উপায় তো নেই। ভালো থাকিস তুই। রাইসা কেঁদেই ফেলল। সবাই অবাক হয়ে শুধু তাদের আবেগময় ভালোবাসা দেখছে।

তার চাচা বলল, আম্মু, তুমি তোমার পিকুকে নিয়ে যেতে পারো। সেখানেও তো অনেক জায়গায় ঘাসপাতা আছে। আর না হয় অন্যকিছু খাওয়াবে। রাইসা তার বাবার দিকে তাকাচ্ছে। তার বাবা বলল, ঠিক আছে নিয়েই চলো তোমার পিকুকে। এই কথা শুনে রাইসা খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল।

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়