reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ববিতার ছাদবাগান

লেকের এক পাড়ে গুলশান আর অন্য পাড়ে বারিধারা। পড়ন্ত বেলায় সেই লেকে ঝাঁক বেঁধে উড়ে বেড়ায় নানা রঙের পাখি। নিজের বাড়ির ছাদ থেকে পাখিদের ছুটে চলা দেখেন ফরিদা আক্তার পপি। যার পোশাকি নাম ববিতা। শৈশব থেকেই এই অভিনেত্রী পাখি আর প্রকৃতিপ্রেমী। বাগান করা তার বাবারও শখ ছিল। ছয় দশকের অভিনয় জীবনে প্রায় ৩০০ সিনেমায় কাজ করেছেন। সিনেমার রুপালি পর্দা রাঙানো ববিতাকে অভিনেত্রী হিসেবে সবাই চেনেন। চলুন জেনে নিই প্রকৃতি ও পাখিপ্রেমী ববিতাকে।

গুলশান-২-এর লেকের ধারে একটি ভবনের ১১ ও ১২ তলায় ববিতার ফ্ল্যাট। এ বাড়ির নকশায় যেটি ছিল প্রধান শোয়ার ঘর, সেটিই এখন যেন সবুজের নগরী। বসার ঘরে ঢুকেই ডানদিকে ছোট্ট বারান্দা। সেখানে রয়েছে দুটি খাঁচা। একটিতে টিয়া, অন্যটিতে ময়না। বাড়িতে কোনো অতিথি এলেই সশব্দে কেউ একজন ববিতার মতোই হেসে উঠল! ববিতা জানালেন, ‘ওই যে ময়নাটা হাসছে, ও আমার হাসি নকল করে।’ বলে নিজেও হাসেন। ময়নাও হাসছে আর অনর্গল কথা বলছে। একসময় ময়না বলে ওঠে, ‘ওকে পানি খেতে দাও।’ শুনে ববিতা বলেন, ‘তোমাকে পানি খেতে দিতে বলেছে।’ ববিতার বাসায় প্রবেশ করতেই প্রথমে দেখা মিলবে একটি বাঁশঝাড়ের।

শুধু তাই নয়, রয়েছে বিভিন্ন রকম গাছ আর পাতায় সবুজের অরণ্য। ডান দিকের পুরো দেয়াল বেয়ে নেমে গেছে নানা প্রজাতির সবুজ গাছ। তার বাগানে রয়েছে গাঁদা, ডালিয়া, জবা, চন্দ্রমল্লিকা, ক্রিসেনথিমাম, কলাবতী, ক্যাকটাস, তিবুচিনিয়া, কানকা, হাইডেনজিয়া, শকিং পিঙ্ক, ডেন্টাস, কসমস, বার্বিয়া, সালভিয়া ও ইমপ্রেশন। ফোয়ারার পানিতে শাপলা, আছে নাইটকুইন। এ ছাড়া রয়েছে আরো অনেক প্রজাতির ফুল, যা ফুটে আছে অতি যত্নে। ববিতা জানালেন, ‘এই নাইটকুইনগুলোয় একসঙ্গে ২০ থেকে ৩০টি ফোটে।’ ববিতার ছাদবাগানে গোলাপি, হলুদ, সাদা, মেজেন্ডা রঙের বাগানবিলাস; বাহারি কুঞ্জলতা, মাধবীলতার চোখ জুড়ানো দৃশ্য মন কাড়বে যে কারো। এই বাগানের শোভা আরো বাড়িয়েছে ময়না, লাভবার্ড, অস্ট্রেলিয়ান ঘুঘু আর ফিঙে। সারা দিন কলকাকলি ও আনন্দে ভরিয়ে তোলে পাখিরা।

ববিতা বলেন, ‘শীতের সময় পাশের লেকে দলবেঁধে বাগানে অতিথি পাখি আসে। লেকের পানিতে গা ভিজিয়ে তারা হাপুসহুপুস গোসল করে। তাদের দাপাদাপির দৃশ্যও অসাধারণ। এসব দেখতে দেখতে রোদে বসে চা খেতে ভালো লাগে। বাগানের রাতের সৌন্দর্য অন্য রকম। রাতে বাঁশবাগানের মাথার ওপর দিয়ে যখন চাঁদ ওঠে, তখন দূর অজানায় হারিয়ে যেতে মন চায়। মনে পড়ে যায় শৈশবের সোনালি দিনগুলোর কথা।’

এ কথা বলতে বলতে ববিতা যেন হারিয়ে গেলেন সেই দিনগুলোতে। কিছুটা সময় চুপ থেকে ববিতা আবারও বলতে শুরু করলেন, শৈশব থেকেই আমার বাগানের প্রতি গভীর ভালোবাসা। গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় কৃষকদের কাজ দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম, কত শ্রম-ঘামে আমাদের জন্য ফসল ফলান তারা। সেই থেকেই কৃষির প্রতি আগ্রহ জন্মে। যখন গুলশানের এই বাড়িতে থাকতে শুরু করি। তখন থেকেই ছাদ বাগান শুরু করেছি। করোনাকালে বাগানের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছে। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে এ বাগান ঘিরেই- নিজের ব্যস্ততা প্রসঙ্গে এভাবেই বলেন নন্দিত অভিনেত্রী ববিতা।

তার কথায় বোঝা গেল নাগরিক জীবনে উঁচু উঁচু দালানের মধ্যে এই এক টুকরো ছাদবাগান যেন ববিতার স্বস্তির আশ্রয়। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বাড়ির ছাদে একটু একটু করে বাগান গড়েছি। আমি যখন যেখানে বেড়াতে গিয়েছি, সেখান থেকেই বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিয়ে এসেছি।’ বাগানের প্রতি এই বরেণ্য অভিনেত্রীর ভালোবাসার কারণে প্রতিদিন অন্য যেকোনো কাজের ফাঁকে নিয়ম করে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় গাছগাছালির পরিচর্যা করেন তিনি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান এই অভিনেত্রী আরো বললেন, ‘গাছের প্রতি আমার ভালোবাসা বংশগত। বাবারও শখ ছিল বাগান করা। তার হাতে যেকোনো গাছ খুব ভালো হতো। আর আমার নিজেরও বাগান করার শখ সেই অভিনয় জীবন থেকেই। শুটিংয়ে বা যেকোনো কাজে আমি বিদেশে গেলে প্রথমে খবর নিই কোথায় নার্সারি আছে। ফুল-ফলের গাছ সংগ্রহ করি। এগুলো আমার কাছে শাড়ি-চুড়ি-গহনার চেয়েও দামি। এই বাগানকে শতভাগ পূর্ণতা দিতে এনেছি নানা প্রজাতির পাখি। পাখির ডাকে প্রতিদিনই অন্য করম সময় কাটে। এখন বাগান করা আমার নেশায় পরিণত হয়েছে।’

ববিতার ছাদবাগানে রয়েছে মাটির চুলাও। ববিতা বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ শেষে যখন ছাদে নরম রোদ এসে পড়ে, তখন হাঁটাহাঁটি করি। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে দাওয়াত দিই। অতিথিদের জন্য মাঝে মধ্যে মাটির চুলায় রান্না করি। রান্নার মেনুতে থাকে সাদা ভাত, মটরশুঁটি দিয়ে কই মাছ, দেশি মুরগি, পোড়া বেগুনের ভর্তা, গরু, মুরগি আর কলাপাতায় ভাপে করা ছোট মাছ। চুলার পাশে বসেই খাওয়া হয়। পুরোটা যেন চড়ুইভাতির আমেজ।’

ববিতার ছাদবাগানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির গাছও। আবাদ করেছেন বেগুন, আপেল টমেটো, চেরি টমেটো, কয়েক রঙের ক্যাপসিকাম, মরিচ, ঢ্যাঁড়শ ও লালশাক। বাগানের সবজি নিজে যেমন খান, তেমনি দুই বোন সুচন্দা (কোহিনূর আকতার সুচন্দা), চম্পাসহ (গুলশান আরা চম্পা) অন্যদেরও উপহার হিসেবে পাঠান ববিতা। এ বছর সবচেয়ে বেশি ধরেছিল আম। অভিনেত্রী ববিতা যেমন ভালো অভিনেত্রী, ঠিক তেমনি একজন বাগান পরিচালকও বটে। চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারেন কোনো গাছে কখন কী লাগবে, কত দিনের মধ্যে ফল দেবে। ববিতা বলেন, ‘সবুজের মাঝে থাকতে ভালো লাগে। গাছ কিনি, গাছ উপহার পেতেও আমার ভালো লাগে। বাগানের অনেক গাছ দেশ-বিদেশের অনেক জায়গা থেকে সংগ্রহ করা।’

ববিতা মনে করেন, প্রকৃতি শুধু মানুষকেই নয়, পুরো বিশ্বকে বাঁচিয়ে রাখছে প্রতিনিয়ত। তিনি বলেন, ‘নিজের এবং অন্যের জন্য হলেও গাছ লাগানো জরুরি। একটা সময় আমরা কেউ-ই থাকব না, কিন্তু গাছগুলো থেকে যাবে। আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে ছায়া দেবে, ফল দেবে।’

 

তথ্যসূত্র : সংগৃহীত

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close