নিজস্ব প্রতিবেদক

  ৩ ঘণ্টা আগে

বিজিবির কঠোর অবস্থানে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ

শূন্যরেখা থেকে ৩৩ জনকে ফিরিয়ে নিল ভারত

দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা, পেশাদারত্ব ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক অবৈধ পুশইনের একাধিক চেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করেছে বিজিবি। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভারতীয় শূন্যরেখায় অবস্থান করা অন্তত ৩৩ জনকে রাতের আঁধারে নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। গতকাল শনিবার বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

বিজিবি জানিয়েছে, ঝিনাইদহের মহেশপুর ব্যাটালিয়নের (৫৮ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ যাদবপুর সীমান্তে তিনজন ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় বিজিবির টহল দল সীমান্তের শূন্য লাইনে অবস্থান নিয়ে াঁদের বাধা দেয়। বিজিবির দৃঢ় অবস্থানের মুখে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়ে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যান। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে হতে ভারতীয় শূন্যরেখায় অবস্থান করা ২৮ জনকে শুক্রবার রাতে ফিরেয়ে নিয়েছে বিএসএফ। শনিবার সকাল থেকে ২৮ জনকে ওই সীমান্তে চলাচল করতে দেখা যায়নি বলে এমন ধারণা করছে নওগাঁ ব্যাটালিয়নের ১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম। তবে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বিজিবি সদস্যরা সীমান্তে সর্তক অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি জানান। এদিকে ওই ব্যক্তিরা গত ৪ জুন ভোররাত থেকে ভারতীয় শূন্যরেখার রোদ ও ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অবস্থান করছিলেন।

১৬ বিজিবি অধিনায়ক আরো জানান, ওই ২৮ জন ব্যক্তি ভারতের অভ্যন্তরে শূন্যরেখা থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে অবস্থান করছিলেন। বর্তমানে সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে তাদের অবস্থান বা চলাচল আর পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

তিনি ধারণা করছেন, শুক্রবার গভীর রাতের কোনো একসময়ে বিএসএফ তাদেরকে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। এদিকি বিজিবি সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণসহ যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবস্থানে রয়েছে।

রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) : ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ধর্মগড় শাহানাবাদ পামোল সীমান্ত দিয়ে শনিবার মানসিক ভারসাম্যহীন ভারতীয় এক নাগরিককে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এসময় ধর্মগড় সীমান্তের বিজিবি সদস্যরা তাকে আটক করে, জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারে সে ভারতীয় নাগরিক বাংলায় কোনো কথা বলতে পারে না মাঝে মধ্যে হিন্দিতে কথা বলছে।

ধর্মগড় শাহানাবাদ সীমান্তের বিজিবি সদস্যরা বিএসএফকে কড়া বার্তা পাঠিয়ে ভারতীয় নাগরিককে ফেরত দিয়েছে।

এ ব্যাপারে ধর্মগড় এলাকার সহকারী শিক্ষক সেলিম জানান, বিজিবির পাশাপাশি আমরা স্থানীয়রা বিএসএফথর পুশইন ও শূন্যরেখায় জমি দখল বিষয়গুলিকে রুখে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিটিকে ছদ্দবেশে তারা আমাদের দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে নতুবা ইনজেকশন দিয়ে সীমান্ত পার করে দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঠাকুরগাঁও ৫০ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ান লে. কর্নেল তানজির আহম্মদ মুঠোফোনে জানান, মানসিক ভারসাম্যহীন ভারতীয় এক নাগরিককে বিজিবি সদস্যরা আটক করেছিল। পরবর্তীতে তাকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মেহেরপুর : দুই দেশের মাঝখানে সাত জীবন, মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তে অনিশ্চয়তার প্রহর। তারা কেউ শিশু, কেউ নারী, কেউ পুরুষ। কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়- তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে পড়া সাতজন মানুষ। একদিকে ভারত, অন্যদিকে বাংলাদেশ। দুই দেশের সীমান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা যেন খুঁজছেন আশ্রয়, পরিচয় আর একটি নিরাপদ ঠিকানা। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তে শনিবার ভোরে এমনই এক মানবিক সংকটের দৃশ্যের জন্ম হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) শিশু, নারী ও পুরুষসহ সাতজনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে। তবে বিষয়টি টের পেয়ে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিরোধ গড়ে তুললে তারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। পরে সীমান্তের কাঁটাতারের কাছে ফিরে গিয়ে অবস্থান নেন।

লালমনিরহাট : লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের (১৫ বিজিবি) দিঘলটারী সীমান্ত এলাকায় সাত ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশইনের অপচেষ্টা চালানো হলে বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং তাদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দেয়। একই ব্যাটালিয়নের দুর্গাপুর সীমান্ত এলাকায় আরো চার ব্যক্তিকে পুশইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বর্তমানে ওই ব্যক্তিরা ভারতীয় ভূখণ্ডের কাঁটাতারবিহীন চর এলাকায় অবস্থান করছেন। সেখানে বিজিবি নিবিড় নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। উত্তরের চার সীমান্তে এক দিনে আরো ৬০ জনকে পুশইনের চেষ্টা বিএসএফের উত্তরের চার সীমান্তে এক দিনে আরো ৬০ জনকে পুশইনের চেষ্টা বিএসএফের

নীলফামারী : নীলফামারী ব্যাটালিয়নের (৫৬ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ পঞ্চগড়ের বড়বাড়ী প্রধানপাড়া সীমান্ত এলাকায় ভারত থেকে ১০ ব্যক্তিকে সীমান্তের কাঁটাতারের বাইরে এনে অবস্থান করানো হয়। এই ঘটনায় বিজিবি ও বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশি বলে দাবি করলেও তাদের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। বিষয়টি বিজিবি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে।

সীমান্তে পুশইন ও মানবপাচার চক্রের সক্রিয়তা : কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও নওগাঁয় বিজিবির কঠোর প্রতিরোধসীমান্তে পুশইন ও মানবপাচার চক্রের সক্রিয়তা : কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও নওগাঁয় বিজিবির কঠোর প্রতিরোধ। এ ছাড়া নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের (৩১ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ কচুগড়া সীমান্তের বিপরীতে ভারতের আসাম রাজ্যের মহাদেব থানাধীন বলিশী গীতারাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জড়ো করে রাখা ১৬-১৭ জনকে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের লেংগুড়া সীমান্তের বিপরীতে বিএসএফের চিকনী ক্যাম্প-সংলগ্ন এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বিজিবি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করেছে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থি কোনো ধরনের পুশইনের প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। বাহিনীটি আরো জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

বিজিবি ও সীমান্তবাসী জানান, হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় ১১ জন, পাটগ্রাম উপজেলার পয়ষট্টিবাড়ী বিওপি এলাকায় ১০ জন এবং আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের দীঘলটারী সীমান্ত এলাকায় আরো ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ।

খবর পেয়ে বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সীমান্তে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। গ্রামবাসীর সহায়তায় বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেনি। পুশইনে ব্যর্থ হলে দিনভর এসব মানুষকে শূন্যরেখায় রোদে আটকিয়ে রাখে বিএসএফ সদস্যরা। শূন্যরেখা থেকে এসব মানুষকে সরিয়ে নিতে বিজিবি কঠোর বার্তা দিলেও প্রথম দিকে কর্ণপাত করেনি বিএসএফ। কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠকে উল্টো বিজিবির ওপর দায় চাপানোর অপচেষ্টা করে বিএসএফ। বৈঠকে পুশইনের শিকার লোকজন বিএসএফের উপস্থিতিতে জানান, তারা ভারতীয় এবং ভারত থেকেই এসেছেন। এমন বার্তার পড়েও দিনভর নানা নাটকীয়তা করে অবশেষে রাতের আঁধারে সীমান্তের লাইট নিভিয়ে তাদেরকে নিজ ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ। যেকোনো ধরনের পুশইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। সর্বদাই সীমান্তে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়