চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

  ১৮ আগস্ট, ২০২২

চাঁপাইনবাবগঞ্জে চাঁদাবাজ সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য

ছিনতাই ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতরাও সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকা থেকে এস এম রুবেল নামের এক ভুয়া সাংবাদিককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতেন। একাধিক পত্রিকার জাল পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে রাখতেন। এ ছাড়া তার মোটরসাইকেলেও লাগানো ছিল প্রেস স্টিকার। তিনি বাল্যবিয়ে দেওয়া ছেলের বাবার কাছ থেকে চাঁদা দাবির অভিযোগে ধরা পড়েন। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় চাঁদাবাজি মামলায় তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর আগে ফেনসিডিল সেবনের সময় শিবগঞ্জ উপজেলার রাণীহাটি এলাকা থেকে ফাহিম নামের এক ভুয়া সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তার কাছে একটি পত্রিকার কার্ড পাওয়া যায়। মোটরসাইকেলও ছিল প্রেস লেখা স্টিকার। সেখানে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রুহুল আমিন শরিফ উপস্থিত হয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।

এ সময় তাকে ছয় মাসের সাজা দেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। এর আগে পাশের জেলা রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গণধোলাইয়ের শিকার হন চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক কথিত সাংবাদিক। এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের নারী দিয়ে ফাঁদ পেতে ব্ল্যাকমেইলের সময় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন এক ভুয়া সাংবাদিক এবং দুই নারীসহ পাঁচজন। দেড় মাস আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ র‌্যাব ক্যাম্প সদস্যরা পৌর এলাকার পল্লীবিদ্যুৎ মোড়ে নূরনবী নামে কথিত সাংবাদিককে মদসহ গ্রেপ্তার করে। কথিত ওই সাংবাদিক গ্রেপ্তারে এলাকাবাসীর মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

এভাবে সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য। তথাকথিত আইপিটিভি (ইউটিউব), অনলাইন নিউজপোর্টাল ও যত্রতত্র ফেসবুক লাইভ, প্রেস লেখা স্টিকার, আইডি কার্ড ঝুলিয়ে অবাধে চলাচল করছেন সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তিরা।

নারী নির্যাতন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সঙ্গে জড়িতরাও সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন সর্বত্র। এ ছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা সংবাদ লিখতে না জানলেও নামসর্বস্ব কিছু পত্রিকার কার্ড কিনে রাতারাতি হয়ে যাচ্ছেন সাংবাদিক। লাখ টাকা দিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলের আইডি কার্ড কিনে সাংবাদিক হয়েছেন এমন খবরও শোনা যায়। যোগ্যতা যাচাই নয়, টাকা দিলেই কার্ড মিলছে। চাঁপাইনবাগঞ্জে এক টেলিভিশন চ্যানেলেরই রয়েছেন তিনজন প্রতিনিধি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংবাদিক নেতারা বলছেন- যেখানে-সেখানে অবাধে বিচরণ করছেন এ রকম অর্ধশত ভুয়া সাংবাদিক। চালাচ্ছেন নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড। এসব নীতিহীন কর্মে বাড়ছে গুজব, অপপ্রচার। বিভ্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমন বাস্তবতায় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি। ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে ভুয়া সাংবাদিকদের এখনই নিয়ন্ত্রণ করার দাবি জানান তারা।

পেশাদার সাংবাদিকরা বলছেন, প্রতিদিনই এ রকম ভুয়া সাংবাদিকদের নানা বেআইনি তৎপরতার খবর পান তারা। এই ভুয়া সাংবাদিকদের ঠাটবাট এমন যে, তাদের সাধারণ মানুষ সহজে ধরতে পারেন না। এমনকি পেশাদার সাংবাদিকরাও তাদের দেখে মাঝেমধ্যে বিভ্রান্ত হন। তারা অনেকেই দামি গাড়িতে চলাফেরা করেন। আর ক্যামেরায় জাল স্টিকার লাগিয়ে মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় করেন। বর্তমানে জেলাজুড়ে এ রকম অন্তত ৫০ জন ভুয়া সাংবাদিক আছেন, যারা দল বেঁধে চলাফেরা করেন। তারা থানা, বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিসে বিভিন্ন তদবিরে যান নিয়মিত। দল বেঁধে বিয়ের অনুষ্ঠানেও চাঁদা দাবি করেন। ঝামেলা এড়াতে বাধ্য হয়ে চাঁদা দেন সাধারণ মানুষ।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখার সিনিয়র সদস্য অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম রেজা জানান, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে ভুয়া সাংবাদিক চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং প্রেস ক্লাবগুলোকে এ কাজে সহযোগিতা করতে হবে। নয় তো সাংবাদিকদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে। পেশাদার সাংবাদিকদের আরো বেশি বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. কামাল উদ্দীন বলেন, জেলার বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি ও নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন কার্ডধারীরা। এ ধরনের কথিত সাংবাদিকরা বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি, মিল-কারখানা, বেকারিসহ নানা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচার কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করছেন। তারা নিজেরাই বিভিন্ন স্থানে গড়েছেন প্রেস ক্লাবসহ নামে-বেনামে সংগঠন। অনেক সময় দেখা যায়, মূলধারার কিছু সাংবাদিক, প্রশাসন, থানা-পুলিশ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে সখ্য রয়েছে স্বঘোষিত সাংবাদিকদের। অপকর্মে জড়িতদের দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী- এমন প্রত্যাশা মূলধারার সাংবাদিকদের।

এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আতোয়ার রহমান বলেন, অপরাধ করলে যে কারো বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কারো পরিচয় বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। চাঁদাবাজি ও ব্লø্যাকমেইলের বিষয়ে অভিযোগের ক্ষেত্রে সরাসরি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোনো পেশার পরিচয়ে অপরাধ করে কেউ প্রশ্রয় পাবে না।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close