নুর নবী রবিন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

  ১২ আগস্ট, ২০২২

হালদায় মরছে ডলফিন

* সাড়ে চার বছরে ৩৮টি ডলফিনের মৃত্যু * ডলফিন কমে যাওয়া নদীর জন্য অশনিসংকেত * অতিরিক্ত জাল ও ইঞ্জিনচালিত নৌযান বন্ধের পরামর্শ

দিন দিন হালদা নদীতে পাওয়া যাচ্ছে মৃত ডলফিন। তাই হালদার বাস্তুতন্ত্র নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক পরিসংখানে দেখা যায়, গত সাড়ে চার বছরে হালদায় ৩৮টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে ১৮টি ডলফিন মৃত পাওয়া যায়। ২০১৮ সালের মার্চ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ১০টি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়। ২০২১ সালে পাঁচটি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়। চলতি বছরে পাঁচটি মৃত ডলফিন পাওয়া গেছে।

ডলফিন একটি নদীর জলজ বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সূচক। নদীতে ডলফিনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে নদীর বাস্তুতন্ত্রের সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে বিবেচনা করা হয়। তেমনি এটি কমে যাওয়া নদীর জন্য অশনিসংকেত। বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ নামে পরিচিত হালদা নদী বাংলাদেশের স্বাদুপানির মাছের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলজ বাস্তুতন্ত্র। এই বাস্তুতন্ত্রে রয়েছে ৮৩ প্রজাতির ফিনফিশ, ১০ প্রজাতির শেলফিশ, গাঙ্গেয় ডলফিন ও অন্যান্য জলজপ্রাণী।

হালদায় কেন মরছে ডলফিন- এ বিষয়ে প্রতিদিনের সংবাদের সঙ্গে কথা হয় চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ও হালদার গবেষক ড. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে।

তিনি বলেন, সারা বিশ্বে ডলফিন মৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে কারেন্ট জাল। ডলফিন চলাচলের সময় জালের অবস্থান প্রতিধ্বনির মাধ্যমে নির্ণয় করতে পারে না। যার কারণে সহজে জালে জড়িয়ে পড়ে। হালদায় ডলফিন মৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে অবৈধভাবে মাছ ধরার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের জাল। এ ছাড়াও দূষণ, পানির গুণাবলি পরিবর্তন, ডলফিনের বয়স বৃদ্ধি, খাদ্যের অভাব ও জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় ডলফিনের মৃত্যুর জন্য দায়ী। হালদা নদীর বাস্তুতন্ত্রকে ডলফিনের বসবাস উপযোগী করতে হলে কী পদক্ষেপ নিতে হবে- এমন প্রশ্নে ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, নদীতে অবৈধভাবে যেকোনো ধরনের জাল দিয়ে মাছ ধরা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। নদীতে অতিরিক্ত ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল বন্ধ করতে হবে। হালদা নদী ও এর শাখা খালসমূহকে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত রাখতে হবে। হালদা ও শাখা খালে বিষ দিয়ে মাছ মারা বন্ধ করতে হবে। হালদার যে স্থান ও শাখা খালে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে, সেখান থেকে পলি অপসারণ করে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত হালদা ও এর শাখা খালে পানির গুণাবলি পরীক্ষা করতে হবে।

এ ব্যাপারে তিনি আরো বলেন, কমিউনিটি বেইজড ডলফিন ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম গ্রহণ করতে হবে, যেখানে বনবিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ডলফিনের পরিবেশগত গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে স্থানীয় জেলে ও জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষিজমিতে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার নিরুৎসাহিত এবং জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। ডলফিন ডেটাবেইজ তৈরি করে নিয়মিত ডলফিনের সংখ্যা ও আবাসস্থল মনিটরিং করার পরামর্শও দেন তিনি।

ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ডলফিন সংরক্ষণে আলাদা বিশেষজ্ঞ মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে। সর্বোপরি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ -(ডলফিন ও তিমি আইন) -৩৭ তম ধারা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

প্রসঙ্গত, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনভারসেশন অব ন্যাচার (আইইউসিএন) এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে সাত প্রজাতির ডলফিন পাওয়া যায়। যার মধ্যে গাঙ্গেয় ডলফিন হলো মিঠাপানির নদীর প্রধান ডলফিন। এটি বর্তমানে দেশের একটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, সাঙ্গু, কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে পাওয়া যায়।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close